বাংলা বর্ষপঞ্জির পঞ্চম মাস ‘ভাদ্র’। ভাদ্র মানে যিনি কল্যাণ দান করেন। ভাদ্র শব্দের আক্ষরিক অর্থ শুভ। তাই এটি বাংলা বছরের শুভ মাস। প্রকৃত অর্থে, ভাদ্র নাম এসেছে পূর্বভাদ্রপদ ও উত্তরভাদ্রপদ নামের দুই নক্ষত্র থেকে। এর মধ্যে বা কাছাকাছি চাঁদ যখন পূর্ণিমার রূপ ধারণ করে, সেই অনুযায়ী প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মাসের নাম রেখেছিলেন ‘ভাদ্রপদ’। পরবর্তীকালে সংক্ষিপ্ত হয়ে ভাদ্র রূপ ধারণ করেছে। এটি শরৎকালের আগমনী জানান দেয়। আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনা, কাশফুলের দোলা এবং গাছের ডালে কানের দুলের মতো হলদে বর্ণের ফুল ‘ভাদ্রা’ ঝুলে। ফুলগুলো টিয়া পাখির বাঁকানো ঠোঁটের মতো। গরমের শুরু থেকে শীতের আগ পর্যন্ত ভাদ্রা ফুল ফুটলেও ভাদ্র মাসে তার প্রাচুর্য বেশি।
সনাতন ধর্মে ভাদ্র মাসে জন্মাষ্টমী, গণেশ চতুর্থী ও রাধাঅষ্টমী উদযাপিত হয়। একইসঙ্গে গ্রামীণ বাংলায় ভাদ্র মাসে ‘ভাদু উৎসব’ সবার অংশগ্রহণে যেন জয়গান গায়। এই মাস অত্যন্ত পবিত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ। মাসটি আত্মশুদ্ধি, দানধ্যান ও আধ্যাত্মিক মাস হিসেবে সমাদৃত। প্রাচীন সভ্যতায় এসময়ে ধান কাটা হতো।
জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুযায়ী, ভাদ্র মাসে জন্ম হলে জাতক-জাতিকার চরিত্রে নেতৃত্বদানের ক্ষমতা এবং শিল্পপ্রীতি দেখা যায়। স্বভাবেও ভদ্র ও বিনয়ী হয়। যদিও জীবনের প্রথমভাগে তাদের বিভিন্ন ধরনের সংগ্রামের মুখোমুখি হতে হয়। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের মধ্যভাগে পরিস্থিতি অনুকূলে আসতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত তারা সফল হন।
স্কন্দ পুরাণে, শনি দেবতার জন্ম ভাদ্র মাসের অমাবস্যা তিথিতে। তার পছন্দের ফল তাল। নবগ্রহের রাজা শনি। অন্য গ্রহ হলো চন্দ্র, সূর্য, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, রাহু ও কেতু। ভাদ্র মাসের সুস্বাদু ও লোভনীয় ফল তাল। তামিল ভাষায় তাল গাছকে বলা হয় ‘কাঠপাহাতরু’।
ভাদ্রের শুরুতে পানি প্রধান এলাকায় মনসা বন্দনা হয়। মূলত পাহাড়ি জনপদ সিলেট, মৌলভীবাজার, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান বিশেষ করে চা বাগানে বিষহরি বন্দনা হয়। সমুদ্র ও নদী প্রধান অঞ্চলে সর্প বন্দনাকে বলা হয় মনসা বন্দনা। বরিশাল, কুয়াকাটা, খুলনা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে হয় এই বন্দনা। চট্টগ্রাম বন্দর এলাকার জেলে সম্প্রদায়ে মনসা বন্দনার দিন পাল্টামনসা বলে এক ধরনের কবিগানের প্রচলন আছে। টাঙ্গাইল ও জামালপুরে হয় ভাসান গান বা বেহুলার ভাসান। এই গান মুসলিম ওঝা শ্রেণি করেন। তবে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও দলে থাকেন।
ভাসান গান মূলত পদ্মপুরাণের সংক্ষিপ্ত রূপ। শ্রাবণ মাসের শেষ দিন বা ভাদ্র মাসের প্রথম দিন খুব সকালে দলের চরিত্রগুলোর সাজসজ্জা শেষে সাজানো নৌকায় উঠেন দলপতি। যমুনার বুকে নৌকা চলতে চলতে নৃত্যগীত হয়। পথে সাত ঘাটে ভিড়ে নৌকা। ঘাটের পাশের বাড়ির উঠানে হয় ধারাবাহিক পরিবেশনা। দিনশেষে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া দুধ, কলা, জবাফুলসহ যমুনার পানিতে ভেলা ভাসিয়ে দিয়ে সম্পন্ন হয় ভাসান গান যাকে বলে ‘ভেলা ভাসানি’।
ভাদ্র মাসের প্রতি বৃহস্পতিবার ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় হয় ভেলা ভাসানি। মূলত মুসলমান সম্প্রদায়ের পীর ভক্ত কুল খিজির পীরের উদ্দেশ্যে ভেলা ভাসান। কলাগাছ দিয়ে ভিটি করে, সেই ভিটিতে বাঁশ দিয়ে ঘর তৈরি করা হয়। সারাদিন চলে রঙিন কাগজ কেটে ভেলা সাজানোর কাজ। ভক্ত কূল মোরগ-খাসি-গরু-চাল-ডাল-টাকা-পয়সা নিয়ে হাজির হন। বড় বড় ডেকচিতে খিচুরি রান্না হয়, সারাদিন চলে সেই খিচুরি খাওয়া। এরপর শুরু হয় ভেলা ভাসানোর প্রস্তুতি। ফুল, ধান, দূর্বা দিয়ে ভেলা তৈরি শেষ হয়। ভেলায় রাখা হয়, মানতের টাকা-পয়সা, ফলমূল ও পায়েস। পুরো সময় ব্যান্ডপার্টি বাজে বাড়িতে। শেষে ভেলা নিয়ে যাওয়া হয় নদীতে। ভেলা ভাসানোর মধ্য দিয়ে শেষ হয় ভেলা ভাসানি উৎসব। ভাদ্রের শেষ বৃহস্পতিবার হয় বড় ভেলা ভাসানি। চাঁদপুরের বেলতলির লেংটার মাজারে হয় সর্ববৃহৎ ভেলা ভাসানি। মুন্সীগঞ্জের মনাই পাগলার মাজারে ভেলা ভাসানো হয়। এভাবে দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও গ্রাম ভাদ্র মাসে লোকজ উৎসবে, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই জেগে ওঠে।