আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া পাহারার কারণে ১৫ আগস্ট দিনভর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর কার্যত ছিল জনশূন্য। এর মাঝেই জুলাই যোদ্ধা পরিচয়ে একদল ব্যক্তি চড়াও হয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে সন্দেহ করা কয়েকজনের ওপর। অন্তত তিনজনকে বেদম মারধর করা হয়েছে, এ সময় পুলিশ ছিল দর্শকের ভূমিকায়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে পুলিশের উপস্থিতিতে মবের দৃশ্য। তবে বিষয়টিকে ‘মব’ বলতে রাজি নন হামলাকারীরা। তাদের দাবি, কাউকে দলবদ্ধভাবে মারধর করলে বিষয়টিকে ‘মব’ বলার সুযোগ নেই, মারধরের পর আক্রান্ত ব্যক্তির টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেওয়া হলেই কেবল ঘটনাটিকে মব বলা যাবে। হামলার শিকার ব্যক্তিদের ‘পকেট অক্ষত থাকায়’ বিষয়টিকে মব বলার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে পরিষ্কার কোনো বক্তব্য আসেনি। কর্মকর্তারা বলছেন, এ ব্যাপারে কেউ অভিযোগ করলে খতিয়ে দেখা হবে এবং তারপরে নেওয়া হবে ব্যবস্থা। ধানম-ি ৩২ নম্বরে যাওয়া একজনকে আটক করার তথ্যও জানিয়েছে পুলিশ।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী কেন্দ্র করে ধানমন্ডি ৩২ ঘিরে গতকাল সকাল থেকে মোতায়েন ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সদস্য। তবে এর মধ্যেই গুঁড়িয়ে দেওয়া বাড়ির সামনে সকালের দিকে ফুল দিতে আসেন এক ব্যক্তি। এ সময় সাদা পোশাকের গোয়েন্দা পুলিশ সদস্যরা তাকে আটক করে পরিচয় ও আসার কারণ জানতে চান। তিনি নিজের নাম অর্ণব দাস এবং নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন যুবলীগের কর্মী বলে পরিচয় দেন। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ তাকে গাড়িতে তুলে ধানম-ি থানায় নিয়ে যায়।
আইনশৃঙ্খলার বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম (এসডিএফ) নামের একটি সংগঠনের সদস্যসচিব আ ন ম আয়াসের নেতৃত্বে সকাল থেকে একদল যুবক অবস্থান নেন ৩২ নম্বরের প্রবেশ সড়কে। তারা সবাই নিজেদের জুলাই যোদ্ধা পরিচয় দেন। ‘সন্দেহভাজন’ দেখলেই তার ওপরে চড়াও হতে দেখা যায় এই দলটিকে।
দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ৩২ নম্বরের প্রবেশ সড়কের মুখে একজন রিকশাচালক নিজের মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করছিলেন। এ সময় আয়াস তার কাছে গিয়ে ফোন চেক করেন। রিকশাচালক ভিডিওটি যুবলীগের একজনকে পাঠিয়েছেন এমন অভিযোগ তুলে সঙ্গীদের নিয়ে আয়াস তাকে বেধড়ক মারধর করেন। এতে তিনি গুরুতর জখম হন। শরীরের বিভিন্ন স্থান ফুলে যায়। ঘটনাস্থলে পুলিশ, এপিবিএন ও গোয়েন্দা পুলিশের অনেক সদস্য থাকলেও তাদের কেউ হামলাকারীদের নিবৃত্ত করেননি। মারধরের শেষ পর্যায়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্য এগিয়ে গিয়ে ওই রিকশাচালককে আটক করে ধানম-ি থানায় নিয়ে যান।
দুপুর ১২টার দিকে দরিদ্রদের মধ্যে শিঙাড়া বিলি করছেন এমন অভিযোগ তুলে আরেক ব্যক্তিকে মারধর করেন আয়াস ও তার সঙ্গীরা। ওই ব্যক্তির হাতে একটি বস্তা দেখা যায়, যার ভেতরে শিঙাড়া ছিল বলে অভিযোগ করেন মবকারীরা। একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি দৌড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
কিছুক্ষণ পর আরেক ব্যক্তিকে দেখে তার পরিচয় জানতে চায় ওই গ্রুপটি। তারা নিপু মিয়া নামের ব্যক্তিকে জেরা করতে থাকেন। তিনি একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের সাংবাদিক বলে পরিচয় দেন। তবে পোর্টালের নিবন্ধন নম্বরসহ বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চান ঘিরে ধরা ব্যক্তিরা। একপর্যায়ে তিনি ঘাবড়ে গেলে আয়াস ও তার লোকজন বেধড়ক মারধর করেন। আহত অবস্থায় পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে যায়।
মব করে যাকে-তাকে মারধরের বিষয়ে জানতে চাইলে আয়াস সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা যাতে কোনো অপতৎপরতা চালাতে না পারেন সেজন্য তারা অবস্থান নিয়েছেন। কাউকে পেলে পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছেন। তার দাবি, তিনি যেটা করেছেন, সেটা মব নয়। কাউকে মারধর করে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিলে মব হতো। তিনি টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিচ্ছেন না, আর তাই লোকজনকে নিয়ে মারধর করলেও সেটা মবের সংজ্ঞায় পড়বে না।
এ সময় আয়াসের পক্ষ নিয়ে একই ধরনের বক্তব্য দেন ড. কাজী মনিরুজ্জামান মনির নামে এক ব্যক্তি। তিনি নিজেকে তাঁতী দলের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘কাউকে দলবদ্ধভাবে মারধর করে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নিলে সেটা মব। তবে আয়াস যেটা করছে, সেটা কোনোভাবেই মব নয়।’
এসব বিষয়ে সন্ধ্যায় ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অর্ণব দাস নামে একজনকে আটক করা হয়েছে। তার বাড়ি টাঙ্গাইলে। তিনি নিজেকে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন যুবলীগের কর্মী বলে জানিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আরও দুজনকে থানায় আনা হয়েছিল। তাদের একজন সাংবাদিক, আরেকজন রিকশাচালক। তবে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের নিরাপত্তা দিতে মূলত থানায় আনা হয়েছিল।’
৩২ নম্বর এলাকায় কোনো ধরনের মব সহিংসতা হয়নি দাবি করে ওসি বলেন, ‘কেউ অভিযোগ করলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’