দেশের সরকারি-বেসরকারি এমনকি স্বায়ত্তশাসিত কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে বহুমাত্রিক দুর্নীতি শুধু ব্যাধিই নয়, আমাদের কাঠামোগুলোয় ক্ষয় ধরিয়েছে। দুর্নীতির ক্ষত উপশমের লক্ষ্যে প্রতিটি সরকারের তরফেই দৃঢ় অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি উচ্চারণের পাশাপাশি দৃশ্যমান পদক্ষেপ সত্ত্বেও দুর্নীতির অপছায়া সরানো যে কতটা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে কৌশলে এরই কদর্য নজির স্থাপন করেছে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড। ১৫ আগস্ট দেশ রূপান্তরে ‘বেতন সাড়ে ৩৬ লাখ টাকা ওভারটাইমও ৩৬ লাখ’ শিরোনামের প্রতিবেদনের গর্ভে যে চিত্র উঠে এসেছে তা যেন আরেক রূপকথার প্রতিচিত্র। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই প্রতিষ্ঠানে গত মে মাসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে হয়েছে সাড়ে ৩৬ লাখ টাকা। ওভারটাইমও দিতে হয়েছে প্রায় ৩৬ লাখ টাকা। কেউ কেউ এক মাসে ২১৫ ঘণ্টাও ওভারটাইম পেয়েছেন! জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের অধীন পেট্রোবাংলার তেল, গ্যাস উৎপাদন কোম্পানি সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডে ওভারটাইমের নামে যা চলছে তা এক কথায় দুর্নীতির মহোৎসব। সিলেট গ্যাস ফিল্ডসে ২০২৪ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক সিলেট অফিসের একটি বিশেষ টিম অভিযান চালিয়ে অনাচার-কদাচার-দুরাচারের বিস্তর তথ্য পেলেও এখনো থামেনি ওভারটাইমের নামে দুর্নীতি!
আমরা জানি না, সিলেট গ্যাস ফিল্ডসে বিষবৃক্ষের শিকড় কতটা গভীরে প্রোথিত। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে মে মাসের বেতন শিট ও ওভারটাইমের যে তথ্য মিলেছে তা আজগুবি বললে অত্যুক্তি হবে না। নিয়মনীতি, শ্রম আইন সবই দুর্নীতিবাজদের কাছে তুচ্ছাতিতুচ্ছ। সিলেট গ্যাস ফিল্ডসে অনিয়মের খতিয়ান দীর্ঘ হয়েছে বছরের বছর ধরে দায়িত্বশীল অসাধুদের দুষ্কর্মে। এই প্রতিষ্ঠানটি তো অভিভাবকহীন নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেখানে দুর্নীতির অপছায়া কী করে এত বিস্তৃত হলো? কীভাবেইবা অনৈতিক কর্মকান্ড চলছে দুদকের তরফে দুর্নীতির অনুসন্ধান সত্ত্বেও? সেখানে নৈমিত্তিক শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রেও কী রকম তুঘলকীকান্ড ঘটে এও উঠে এসেছে ওই প্রতিবেদনে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের উদ্যোগ নিলেও দুর্নীতিবাজরা কীভাবে বানচাল করে দেয় তাও বিস্ময়কর। নৈরাজ্যের আখড়ায় পরিণত হওয়া সিলেট গ্যাস ফিল্ডসে যে ব্যাধি বাসা বেঁধেছে তা কোনো টুটকা দাওয়াইয়ে উপশম হওয়ার নয়। প্রতিষ্ঠানটির অভিভাবক জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ, পেট্রোবাংলা সবার ওপরেই কমবেশি এর দায় বর্তায়।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি-চুরি-অনিয়ম-অপচয়ের ঘটনা নতুন নয়। ‘নিরাপদ’ও বহুস্তরীয় নজরদারি-ব্যবস্থার মধ্যেও দুর্নীতিবাজরা কৌশলের নতুন নতুন পথ উন্মোচন করে তারা তাদের আখের গুছিয়ে চলেছে। সরকারি-বেসরকারি কিংবা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার তাগিদও পুরনো বিষয়। আমরা জানি, অতীতে দুদকের অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। প্রভাবশালীদের দুর্নীতির সঠিক তদন্ত দূরের কথা, সাধারণ দুর্নীতির ক্ষেত্রেও তারা যোগসাজশে দুর্নীতিবাজকে রেহাই দিয়েছেন তারা। প্রশ্ন উঠতেই পারে, সর্ষের ভেতরে ভূত জিইয়ে রেখে কি দুর্নীতির শিকড় উৎপাটন করা যাবে? দুর্নীতিপ্রবণ সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর করতে হলে নতুন করে ভাবতে হবে দুর্নীতি প্রতিরোধের পন্থা। মুখে নয়, সরকারকে কাজে প্রমাণ দিতে হবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতার। দুদককে প্রকৃত অর্থেই সেদিন ও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে এটি দুর্নীতি দমনে সাফল্য দেখাতে পারে। এ সংস্থাকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। দুর্নীতির প্রধান সমস্যা হলো ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠী স্বার্থ হাসিল করা। এই পথ রুদ্ধ করতে কঠোর ও নির্মোহ আইনানুগ ব্যবস্থার পাশাপাশি দরকার দৃঢ় রাজনৈতিক অবস্থান।
দুর্নীতি নির্মূলে সর্বপ্রথম দরকার দুর্নীতিপরায়ণদের আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তযোগ্য সাজা নিশ্চিত করা। আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য যূথবদ্ধ প্রয়াসের বিকল্প নেই। আমাদের আইনের অভাব নেই, যেমন অভাব নেই আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসার ফাঁকফোকরের। বিশ্বের অনেক দেশ আছে যেগুলো দুর্নীতির তালিকাভুক্ত ছিল, কিন্তু সেখান থেকে তারা উত্তরণ ঘটিয়েছে যূথবদ্ধ প্রয়াসে। আমরা মনে করি, দুর্নীতিবাজরা সুযোগ নেয় বিচারের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার। এর নিরসন ঘটানোর পাশাপাশি ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি। সংস্কারের বিরুদ্ধে কেউ যাতে জোট পাকিয়ে সরকারকে বিভ্রান্ত করতে না পারে সজাগ-সতর্ক থাকতে হবে এ ব্যাপারে। সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের ক্ষেত্রে এসবই জরুরি।