অন্তরালের বিষয়গুলো পর্যালোচনায় আসুক

এবার এসএসসি পরীক্ষার ফল ঘোষণার পর বহুল যে বাক্যটি উচ্চারিত হচ্ছে সেটি হলো ‘১৯ বছরে সর্বনিম্ন পাস’। বলাবাহুল্য শিক্ষার্থী বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানদণ্ড বিচারে এখন পর্যন্ত পাস-ফেলের সংখ্যাটিই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়ে  আসছে। বছর বছর দেখা যাচ্ছে এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষার ফল ঘোষণার পর গোলটেবিল বৈঠক বসে। সেখানে শিক্ষাবিদ, সরকারের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, বেসরকারি শিক্ষা পরিবারের কর্মকর্তা বা কর্ণধাররা, সাংবাদিকরা সাড়ম্বরে বৈঠক করেন। একগাদা সুপারিশপত্র জমা হয় এবং পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের ফল ঘোষণার আগে পর্যন্ত সেগুলো ফাইলবন্দি থাকে। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী যাদের তত্ত্বাবধানে দীর্ঘদিন শিক্ষা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকতে হয় সে সব শিক্ষকরা ঐসব বৈঠকে নগণ্য সংখ্যকই দৃশ্যমান থাকেন অথবা থাকেনই না। কিন্তু শিক্ষার্থীদের পাসের ক্ষেত্রে যতটা না তাদের প্রশংসনীয় ভূমিকার কথা ব্যক্ত করা হয়, ফেল করলে নিন্দা তো বটেই সঙ্গে তাদের রুটি-রুজির পথটি রুদ্ধ করার প্রতিই আঙুল তোলা হয়। অথচ পাস-ফেলের বিষয়টি বাৎসরিক কোনো ঘটনা নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি একটি পরিকল্পিত শিক্ষানীতির ধারাবাহিক ফল। আমাদের সে রকম শক্তপোক্ত কোনো নীতি ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করা হয় না। বরং ক্ষমতাসীন সরকারগুলোর ইচ্ছে অনুযায়ী প্রতিনিয়ত নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যম হিসেবে শিক্ষার্থীদের বিবেচনা করা হয়। তা কতটা ইতিবাচক এ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আর মোদ্দাকথায় তার সার্বিক ভার বইতে হয় শিক্ষার্থীদের।

এবার ফল বিপর্যয় হিসেবে যে কয়টি বিষয়কে চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো হলো, পাসের হার কম, জিপিএ ৫-এর সংখ্যা কম, ফেলকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি, ইংরেজি ও গণিতে ফেলের হার বৃদ্ধি ইত্যাদি। এবারকার ফলাফলে দেখা যায় ৩০৪০২টি স্কুলের মধ্যে ৩১২টি, ২৮৩৯টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৯টি এবং ৯১৪১টি মাদরাসার মধ্যে ২২৬টি থেকে কোনো শিক্ষার্থী কৃতকার্য হয়নি। প্রথমেই যদি পাসের হারের সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টির ওপর আলোকপাত করা যায় তবে দেখা যাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কম উপস্থিতিই প্রধান নিয়ামক। বিগত বছরগুলোতে সড়ক আন্দোলন, করোনা মহামারীর প্রাদুর্ভাব ও বছরাধিক সময়  বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শিক্ষার্থীদের ধরাবাঁধা রুটিনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবদ্ধ থাকার প্রতি বিমুখ করে তোলে। ২০২৬ সালে যারা পরীক্ষার্থী ছিল তারা যখন নার্সারি বা প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল ২০১৪, ২০১৫ বা ২০১৬ সালে। ২০১৪ সালের ৫ মার্চ প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের শিক্ষাবিষয়ক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের সঙ্গে তাল মেলাতে সক্ষম নয়। গণিত ও ইংরেজির অবস্থা আরও খারাপ। ঝরে পড়া সত্ত্বেও এসব শিক্ষার্থীর একটি বিশাল অংশকে যেনতেনভাবে পাস করিয়ে ওপরের ক্লাসে ওঠানো হয়। সেক্ষেত্রে যেমন অভিভাবকদের আর্থিক দুর্বলতা বিবেচনায় নেওয়া হয় তেমনি স্বজনপ্রীতি বা রাজনৈতিক বিষয়টিও বাতিল করে দেওয়া যায় না।

অর্থাৎ ভিত্তিমূল থেকেই বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা নিয়েই তারা এসএসসির পরীক্ষার হলে প্রবেশ করে। চলতি বছরেই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাঠ পর্যায়ের জরিপ থেকে দেখা যায়, প্রাথমিকের ৩৪% শিক্ষার্থী বাংলা, ইংরেজি রিডিং পড়তে সক্ষম নয় এবং গণিতেও তারা দুর্বল। অর্থাৎ বিগত এক যুগেও প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতাগুলোর তেমন তারতম্য হয়নি। এর কারণ চিহ্নিত করলে দেখা যায়, দুর্বল পাঠদান, গণিত ও বিদেশি ভাষা ইংরেজির প্রতি শিক্ষার্থীদের ভীতি ও অভিভাবকদের অসচেতনতা প্রভৃতি। তাই রাজধানী ঢাকা ও জেলা শহরগুলোর নামকরা স্কুল ছাড়া ব্যতিক্রমতা বাদে সারা বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মান মোটামুটি এ রকম। এবার শিক্ষকদের মান ও পাঠদানের সক্ষমতা প্রসঙ্গটি দেখা যাক। ব্রিটিশ আমলে ১৮৫৪ সালে প্রণীত উডের ডেসপ্যাচ থেকে শুরু করে ১৯৪৭ সালে  দেশ বিভাগের পর ও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর পর্যন্ত যতগুলো শিক্ষা কমিশন ও নীতি গঠন করা হয়েছে তার প্রত্যেকটিতেই শিক্ষক প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও দেখা যায় সরকারি পর্যায়ের শিক্ষকরা যথাযথ প্রশিক্ষণ পেলেও বেসরকারি শিক্ষকদের বিপুল অংশের মধ্যে প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। আবার মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে সৃজনশীল প্রশ্নপত্র চালু করা হয়ে থাকলেও সৃজনশীল প্রশ্নপত্র কীভাবে প্রণয়ন করা হবে সে বিষয়ে অর্ধেক সংখ্যক শিক্ষকও প্রশিক্ষণের আওতায় আসেননি। অথচ পরীক্ষার জন্য সম্পূর্ণ একটি নতুন মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। এ ধারাটি প্রবর্তন করা হয়েছিল শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যে। অনেক সময় বোর্ডের পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের সঙ্গে গাইড বইয়ের প্রশ্নের ৮০ ভাগই মিলে যায়। মফস্বলের বেসরকারি শিক্ষকদের মতো শহরের অনেক শিক্ষকই যথেষ্ট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন। বেসরকারি  শিক্ষকদের বেতনভাতার পরিমাণ এতটাই কম যে, টিকে থাকার জন্য তাদের অন্য কোনো কাজে যুক্ত হতে হয় অর্থাৎ প্রাইভেট বা কোচিং করানো। সেখানেও তাদের সীমিত সময়ে ক্লাস নিতে হয়। তারা বইয়ের পরিবর্তে ক্লাসনোট বা শিট বিতরণে ব্যস্ত থাকেন। রিডিং পড়ানোর সময় কোথায়?

কিছু  শিক্ষার্থীর কাছে পড়া মানেই হলো কোচিংয়ে  দৌড়ানো। টিনএজার শিক্ষার্থীদের   প্রায় সবার কাছেই রয়েছে স্মার্টফোন। তাদের অনেকেই গেম খেলে, চ্যাটিং করে, টিকটক বানায়। সারা দিন স্কুল, কোচিং, প্রাইভেট পড়ে  থাকে ক্লান্ত-শ্রান্ত। বাসায় ফিরে পড়ার টেবিলে বসার চেয়ে বিপুল সময় অপচয় করে অনলাইনে নিজেদের ব্যস্ত রাখে। অনেক অভিভাবক তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ। তারা রাত জাগে, সকালে স্কুল মিস করে। আবার যেসব শিক্ষার্থী স্কুলে উপস্থিত হয় তাদের একটি অংশ পিছিয়ে থাকে। তাদের অভিভাবকদের আর্থিক সামর্থ্য থাকে না গৃহশিক্ষক রাখার বা কোচিংয়ে পাঠানোর। তাই এবার ফলাফলে ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য হওয়াটা পূর্বের ধারাবাহিকতা মাত্র। আর জিপিএ ফাইভ কমে যাওয়ার বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে নেতিবাচক পরিলক্ষিত হলেও এটাকে সাফল্য হিসেবেই দেখা যেতে পারে। কেননা বিগত সময়ে উত্তরপত্রে শিক্ষার্থীদের এক লাইন হাতের লেখা থাকলেই নম্বর দেওয়াটা রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অথচ এরাই যখন একাদশে ভর্তি হয় তখন তাদের অনেকেই সৃজনশীল অংশের উদ্দীপকের উত্তর কীভাবে লিখতে হয় সেটাই বুঝতে পারে না। অথচ তারা কিন্তু সৃজনশীল প্রশ্নপত্রেই এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি হয়। জিপিএ ৫-এর সংখ্যার ঢালাও বৃদ্ধি তাদের ফাঁপা একটি আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছিল  যার ফল অবশ্যই তাদের ভোগ করতে হয়েছে উচ্চশিক্ষার ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সময়। কাজেই নির্মোহভাবে উত্তরপত্রের মূল্যায়ন জিপিএ ৫-এর সংখ্যা কমেছে এটা যেমন সত্য তেমনই ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক সংকেত। এবার ৯টি শিক্ষা বোর্ডের সমন্বিত এসসসি পরীক্ষার ফলে পিছিয়ে আছে ময়মনসিংহ ও সিলেট শিক্ষা বোর্ড। দুটোই হাওর অধ্যুষিত অঞ্চল। চলমান বর্ষাকালে দুদিন সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কয়েকটি স্কুলে ঘুরে দেখা গেছে বেশিভাগই জলমগ্ন। নগণ্য সংখ্যক শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, তাদের সবার হাঁটু পর্যন্ত ভেজা। অনেকে মুড়িচিঁড়া খেয়ে স্কুলে এসেছে। ফসল ডুবে যাওয়া, অভিভাবকদের কর্মহীনতা ও বাড়িতে খাদ্য মজুদ না থাকায় তাদের অনেকেই দিনে এক বারের বেশি খেতে সক্ষম নয়। বছরের প্রায় ৬ মাস যখন হাওরাঞ্চলে  প্রাকৃতিক বিপর্যয় বিপর্যস্ত থাকে সেখানে সবাই পাস করবে এটা ভাবা ন্যায্য নয়।

২০২১ সালের জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা প্রবর্তন প্রসঙ্গে বলি, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে তা চালু করা হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন, দক্ষতা অর্জন ও ধারাবাহিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা। বলা হয়, এই শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ওপর প্রথাগত পরীক্ষার চাপ কমবে, তারা আনন্দময় ও বাস্তবমুখী পরিবেশে হাতে-কলমে শিক্ষা অর্জন করবে। বলা যায়, বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার প্রায় শতভাগ বদলে এই শিক্ষাক্রম চালু করা হয় যেখানে নতুন শিক্ষাক্রম চালুকরণে পুরনো ৭৫% অংশই বিদ্যমান রাখা প্রয়োজন। নতুন এ শিক্ষাক্রম শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকদের সম্পূর্ণ একটি অচেনা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। ২০২৪ সালের শেষার্ধে এসে আগস্টে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এটি বাতিল করে। শিক্ষার্থীরা ২০১২ সালের প্রবর্তিত শিক্ষাক্রমে ফিরে যায়। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীরা ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের এক-তৃতীয়াংশ সময় পর্যন্ত অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত এক শিক্ষাক্রমে অভ্যস্ত ছিল এবং দশম শ্রেণিতে উঠে তারা ভিন্ন শিক্ষাক্রমের আওতায় আসে। প্রচলিত তাত্ত্বিক ও মুখস্থবিদ্যার সঙ্গে অপরিচিত থেকে চার বছরের পাঠ শেষে শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়ে এসএসসি পরীক্ষার জন্য সময় পেয়েছিল এক বছর দুই মাসের মতো। এমতাবস্থায় এ বছরের এসএসসির ফল বিপর্যয় বলার চেয়ে সাফল্যমণ্ডিত বলেই বিবেচনা করাটা যৌক্তিক হবে।

লেখক : অধ্যাপক ও শিক্ষা গবেষক