সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন প্রয়াত খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন উপলক্ষে গতকাল শনিবার রাজধানীসহ সারা দেশে দলীয় কার্যালয় এবং মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে ঢাকায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে বিশেষ দোয়া মাহফিল করা হয়। এ ছাড়া কেন্দ্রীয়ভাবে সকালে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ও বিকেলে রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। নয়াপল্টনে বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ও সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা অংশ নেন।
কড়াইল বস্তির দোয়া মাহফিলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নেন। অনুষ্ঠানে দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আশা করা যায় কয়েক দিনের মধ্যে গ্যাস সংকট কেটে যাবে। তখন বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিয়ে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ সমালোচনাকারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, পেছনে ফ্যানের বাতাস খাচ্ছে, হাতে হারিকেন নিয়ে বসে বলছে ‘গ্যাস দে, বিদ্যুৎ দে’ এগুলো হঠকারিতা। তাদের বন্ধুরাই ক্ষমতায় ছিল, অন্তর্বর্তী সরকার এলএনজি টার্মিনাল বসানো বন্ধ করে দিয়েছে। সরকার দেশে তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল বানানোর চেষ্টা করছে এ জন্য সময় লাগবে। সংকট সমাধানে সরকার চীন ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে কথা বলেছে।
বিরোধী দলকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে গ্যাস-বিদ্যুতের সমাধান যদি বিরোধী দল দিতে পারে, সেগুলো সরকার গ্রহণ করবে। যদি না পারে, তাহলে বিভ্রান্তির রাজনীতির জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে তাদের। বিভ্রান্তি, হঠকারী রাজনীতি বাদ দেন। জনগণের উপকার হবে সেই রকম পরিকল্পনা থাকলে উপস্থাপন করুন। রাস্তায় বসে ভাঙচুরের রাজনীতির দিন শেষ। সমালোচনা করা খুবই সহজ কাজ, মুরদ থাকলে কোদাল হাতে মাঠে নামুন, জনগণের জন্য কাজ করুন। এমন কথা বলবেন না, যাতে দেশে বিশৃঙ্খলা হয়। যারা আজ বড় বড় কথা বলছে, ১৭ বছর জনগণ আপনাদের রাজপথে দেখেনি। আর আমাদের দলের নেতাকর্মীরা কীভাবে ১৭ বছর নির্যাতন সহ্য করেছে দেখুন।
বিরোধী দলের আরও সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, ’৭১, ৮৬, ৯৬-এ ভুল করেছেন। ’২৪-এ টিকিট বিক্রি করে ভুল করেছেন। এখন উসকানি, বিভ্রান্তির রাজনীতি পরিহার করুন। মানুষ তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন দেখতে চায়। এগিয়ে যেতে হলে ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত শ্রমিকের হাতে রূপ দিতে হবে। আমি কী পেলাম সেটি বড় নয়, বরং জনগণের জন্য কী করতে পারলাম সেটাই বড়। দেশ গঠনে যেই পথ জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া দেখিয়ে গেছেন, তা অনুসরণ করতে হবে।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, একটি শিশু হাঁটতেও এক বছর সময় লাগে। বর্তমান সরকারের বয়স মাত্র ৬ মাস। ক্ষমতায় এসে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা শুরু করেছে সরকার। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকার মেগাপ্রকল্পের মাধ্যমে মেগাদুর্নীতি করেছে। দেশকে ফোকলা বানিয়ে গেছে। বিদ্যুৎ খাতে তিন লাখ দেনা করে গেছে। বিদ্যুতে কষ্ট পাচ্ছে মানুষ, গ্যাসের কষ্ট হচ্ছে। দেশের নিজস্ব গ্যাস ছিল, কিন্তু তারা নতুন কূপ খনন করেনি। বরং বিদেশিদের হাতে এই সেক্টর তুলে দিয়েছে। একটি দেশের জন্য স্বাস্থ্য খাতকে ধ্বংস করা হয়েছিল। যেসব কাজ করলে দেশ ও মানুষের উপকার হবে, বর্তমান সরকার তাই করবে ।
বিএনপির জনপ্রিয়তার মূল কারিগর খালেদা জিয়া মির্জা ফখরুল : গতকাল সকালে নয়াপল্টনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন উপলক্ষে দলের উদ্যোগে আয়োজিত মিলাদ মাহফিলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘বিএনপির জনপ্রিয়তার মূল কারিগর খালেদা জিয়া। গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূল কারিগর খালেদা জিয়া। তিনি বাংলাদেশের ভাগ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন। দীর্ঘ লড়াইয়ে বিএনপি যেভাবে একটি সম্পূর্ণ দল হয়ে উঠেছে, তার প্রধান কারিগর ছিলেন তিনি। তার আর্দশকে ধারণ করে, তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।’ তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা অপরিসীম। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তিনি কখনো নত হননি। নেত্রীর ত্যাগ ও আপসহীনতার কারণে বাংলাদেশ আজ এ পর্যায়ে এসেছে। খালেদা জিয়াকে আমাদের ধারণ করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে অর্জিত সম্পদের ভাগ আমরা অনেকে পেলেও লড়াইয়ের মাঠে তিনি সবাইকে পাননি। তাতে তিনি মনঃক্ষুণœ হননি। তিনি সবাইকে আপন করে নিয়েছেন, সবার অপরাধ ক্ষমা করেছেন। পাশাপাশি সবাইকে যথাযথ মর্যাদায় আসীন করেছেন।’
দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত মিলাদে অংশ নেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী,ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আজম খান, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক, আবদুস সালাম, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলসহ সংসদ সদস্যসহ বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা।
বায়তুল মোকাররমে দোয়া ও মোনাজাত : গতকাল বাদ জোহর খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বায়তুল মোকাররমে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন জাতীয় মসজিদের পেশ ইমাম মুফতি মহিউদ্দিন কাসেম। এ সময় বেগম খালেদা জিয়ার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং মহান আল্লাহ যেনো তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন সেই দোয়া করা হয়। একই সঙ্গে তার পরিবারের সদস্য, স্বজন, সহকর্মী ও শুভাকাক্সক্ষীদের জন্যও দোয়া করা হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করেও দোয়া করা হয়। এ ছাড়া দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি, সার্বভৌমত্ব ও কল্যাণ এবং নিরাপত্তার জন্য আল্লাহর রহমত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
দোয়া ও মোনাজাতে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের ইমাম, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, মুসল্লি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
প্রসঙ্গত, ১৯৪৫ সালের এই দিনে দিনাজপুরে খালেদা জিয়া জন্মগ্রহণ করেন। এস্কান্দার মজুমদার ও তৈয়বা মজুমদার দম্পতির তৃতীয় সন্তান খালেদা জিয়া। তার মৃত্যুর পর এটাই প্রথম জন্মদিন। বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও জন্মদিন ঘিরে বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন রাখা হয়নি।