দেশের অন্যতম পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে পরিচিত পাবনা। নিজ জেলার চাহিদা মিটানোর পাশাপাশি এ জেলার পেঁয়াজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবারহ হয়ে থাকে। তবে এবছর ভালো ফলন হলেও অসময়ে সংরক্ষিত পেঁয়াজ পচে যাওয়ায় কৃষকদের চোখে মুখে ফুটে উঠেছে দুঃশ্চিন্তার ভাজ।
চৈত্র-বৈশাখ মাসে সংরক্ষণ করে রাখা পেঁয়াজে অসময়ে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ পচন। সনাতন পদ্ধতির চাতাল কিংবা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তৈরি আধুনিক সংরক্ষণাগারেও ঠেকানো যাচ্ছে না ভয়াবহ এ পচন রোগ।
সম্প্রতি সংরক্ষিত দেশি ও হাইব্রিড পেঁয়াজের ২৫-৩০ শতাংশেই দেখা দিয়েছে পচন। অসময়ের পচন ও বাজার মন্দায় উৎপাদন খরচ তোলা নিয়ে শঙ্কায় পরেছেন পাবনার কৃষক। সাধারণত বাংলার কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসের দিকে পেঁয়াজে পচন বা অঙ্কুরোদ্গম দেখা দিলেও তা স্বাভাবিক ভাবে ধরে নেওয়া হয়। তবে এবছরে দেখা দিয়েছে ভিন্ন চিত্র। এবছর ভরা বর্ষাতেই পেঁয়াজে গজিয়ে উঠছে অঙ্কুর।
সুজানগর উপজেলার কামারদুলিয়া গ্রামের চাষি আসলাম উদ্দিন বলেন, আমি প্রায় প্রতিবছরই হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজ আবাদ করে থাকি। প্রতিবছরের মত এবছরেও সনাতন পদ্ধতিতে মাচায় আড়াইশ মণের মতো পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে রেখেছি। তবে মাচা থেকে ৮-১০ মণ পেঁয়াজ বের করে দেখি পৌনে দুই মণের মতো পেঁয়াজ পচা বের হয়েছে। কিন্তু এয়ার ফ্লো মেশিনে রাখা পেঁয়াজ নষ্ট কম হচ্ছে।
সুজানগরের মানিকহাট এলাকার পেঁয়াজ চাষি রাজু সরদার জানান, ভালো দামের আশায় এবছর ৩০০ মণ পেঁয়াজ সংরক্ষণ রাখলেও ১০০ মণের বেশি পেঁয়াজে পচন ধরেছে। তাই বাধ্য হয়েই কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন তিনি।
পচনের কারণ হিসেবে রাজু সরদার জানান, এবছর পেঁয়াজ উঠানোর সময় কয়েক দফা বৃষ্টি হয়। কোথাও কোথাও শিলা বৃষ্টিতেও আক্রান্ত হয়েছে। এ কারণে পেঁয়াজে পচন ধরেছে বলে জানান তিনি।
একই সংকটে পরেছে সাঁথিয়ার বনগ্রামের চাষি মানিক মিয়া। কৃষি বিপণন বিভাগ থেকে প্রাপ্ত সংরক্ষণাগারে ৪০০ মণ দেশি পেঁয়াজ নিয়ম মেনে সংরক্ষণ করেছিলেন তিনি। এরপরও পচন থেকে পেঁয়াজকে বাঁচাতে পারেননি এই কৃষক।
সদর উপজেলার দোগাছি এলাকার কৃষক রাহিম বিশ্বাস জানান, বাজারের ভালো পেঁয়াজ মণপ্রতি ১৫০০-১৬০০ টাকা দরে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। তবে পচন ধরা পেঁয়াজের দাম ৩০০-৪০০ টাকা, বড়জোর ৬০০-৭০০ টাকা বলছেন ক্রেতারা। ১৮০ মণ পেঁয়াজের অর্ধেক নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পরেছেন তিনি।
কোলাদি গ্রামের কৃষক আজাহার মন্ডল বলেন, ১৭-১৮ বিঘা জমি আবাদ করে ফলন পেয়েছেন ৮০-১০০ মণ। প্রতি মণে খরচ পড়েছিল ১০০০-১২০০ টাকা। শুরুতে বাজারদর ৪০০-৭০০ টাকা থাকলেও বিক্রি করেননি তিনি। সম্প্রতি পেঁয়াজে পচন ধরায় এখন সে দামেও পেঁয়াজ বিক্রি করতে পারছেন না।
পাবনা কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্যমতে, মূলত বেশকিছু কারণে এই অসময়ে পেঁয়াজে পচন ধরেছে। কৃষি বিভাগ জানায়, বেশি ফলনের আশায় কৃষকরা যেসকল হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজ আবাদ করেছেন, তা দীঘদির্ন সংরক্ষণের উপযোগী নয়। কিন্তু সেগুলো দেশি জাতের মতো সংরক্ষণ করতে যাওয়ায় এই হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজে পচন দেখা দিয়েছে। এছাড়া উত্তোলন মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টি, বাতাসে আর্দ্রতা ও বেশি তাপমাত্রার কারণে পেঁয়াজে আর্দ্রতা থেকে যায়। এ কারণেও পেঁয়াজে পচন ঝুঁকি বেশি দেখা দিয়েছে।
এ ছাড়াও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে আধুনিক সংরক্ষণাগারগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ব্যাহত হচ্ছে। যেটির ফলে অসময়ে এত বেশি পচন ধরছে। তবে এর বাইরেও পচনের ভিন্ন ভিন্ন কারণ রয়েছে বলেন সুজানগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন,
অভিজ্ঞতা না থাকা, বেশি ফলনের আশায় কৃষকরা জমিতে অতিরিক্ত মাত্রায় সার, ভিটামিনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করছেন। এর ফলে পেঁয়াজে পচন বেশি ধরছে। তবে যারা এয়ার ফ্লো মেশিন ব্যবহার করেছে সেসব কৃষকের পেঁয়াজে তুলনামূলক কম পচন ধরেছে।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ মৌসুমে ৫৪ হাজার ৩৩৫ হেক্টর জমিতে রেকর্ড ৯ লাখ ৯৫ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল আট লাখ ৪৫ হাজার ৪৭৩ টন। বর্তমানে জেলায় মজুত রয়েছে দুই লাখ ৭১ হাজার ৫৫ মেট্রিক টন পেঁয়াজ। পচন রোধে এ পর্যন্ত কৃষকদের মোট পাঁচ হাজার ৩৩০টি ‘এয়ার ফ্লো মেশিন’ (বায়ুপ্রবাহ যন্ত্র) দেওয়া হয়েছে। তবে এই সুবিধা পাচ্ছেন মাত্র ৫-৬ হাজার কৃষক।
পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক দেশ রুপান্তরকে বলেন, প্রাথমিক ক্ষতিটা হয়েছিল উত্তোলন মৌসুমের বৃষ্টিতে। এছাড়া স্বল্পমেয়াদি হাইব্রিড জাত নির্বাচন, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং ঠাসাঠাসি করে পেঁয়াজ মজুতের কারণে পচন বেড়েছে। সংকট তৈরি হতে পারে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এবার ফলনের পরিমাণ বেশি থাকায় কৃষকদের বড় ধরনের লোকসান হবে না। এছাড়াও তেমন কোনো সংকট সৃষ্টি হওয়ারও আশঙ্কা নেই বলে জানান তিনি।