ফেনীর দাগনভূঞা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ ফয়জুল আজীম নোমানকে মামলা নিতে অস্বীকৃতির অভিযোগে প্রত্যাহারের নির্দেশ ও তদন্ত এবং তার বিরুদ্ধে যথাযথ বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। সেই নির্দেশের পর তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
রবিবার (১৬ আগস্ট) রাতে ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।
কমিটিতে ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) মো. সাইফুল ইসলামকে প্রধান করে ডিআইও-১ মুহাম্মদ রশীদ ও পুলিশ সুপার কার্যালয়ের পরিদর্শক (ক্রাইম) হায়দারকে সদস্য করা হয়েছে।
তবে আদালতের নির্দেশনায় দাগনভূঞা থানার ওসিকে পত্যাহার করার জন্য বলা হলেও তিনি স্বপদে বহাল রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে যথাযথ বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হলেও অদ্যাবধি দৃশ্যমান কিছু দেখা যায়নি। আদালতের নির্দেশনায় না মানার বিষয়ে পুলিশ সুপার ডিপাটমেন্টের সব বিষয়ে সাংবাদিকদের জানানো যাবে না বলে জানান।
এর আগে, গত ৯ আগস্ট ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এ এন এম মোরশেদ খান দাগনভূঞা থানার ওসিকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে পৃথক দুটি ঘটনায় মামলা নিতে অস্বীকৃতির অভিযোগে তাকে প্রত্যাহার করে তদন্ত এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেন। এর প্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) তিন সদস্যের এ তদন্ত কমিটি গঠন করেন পুলিশ সুপার।
তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, গত বৃহস্পতিবার তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। রবিবার (১৬ আগস্ট) থেকে তদন্ত কাজ শুরু হয়েছে। তবে তদন্তের প্রয়োজনে সময় আরও বাড়তে পারে।
পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার বলেন, একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, তদন্ত চলছে। কিছু বিষয় একান্তই ডিপার্টমেন্টাল বিষয়, এগুলো মিডিয়ায় আসার মতো বিষয় নয়। কী তদন্ত হচ্ছে বা না হচ্ছে, সেটিও আমাদের ইন্টারনাল (অভ্যন্তরীণ) বিষয়। তদন্তে কোন বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আদালত যে বিষয়গুলো বলেছে, সেগুলোই তদন্ত হবে।
ওসিকে প্রত্যাহারে আদালতের নির্দেশের পর তদন্ত কমিটি গঠন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পুলিশ সুপার বলেন, আমরা যেটিই করি তা দাপ্তরিক বিধি অনুযায়ীই করা হয়। আদালতের আদেশ আমাদের ডিপার্টমেন্টের আলোকেই সম্পন্ন হবে। সব বিষয়ে সাংবাদিকদের বলা যাবে না।
এ প্রসঙ্গে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) সাহাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, গত ৯ আগস্ট আদালত দাগনভূঞা থানার ওসিকে প্রত্যাহার ও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পর ১২ আগস্ট ওই কর্মকর্তা আবার আদালতে হাজির হয়ে বিচারকের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। বিচারক তাকে বলেন, ‘আমার সঙ্গে আপনার কোনো কাজ নেই।’
পিপি আরও বলেন, আদালত মূলত এ কর্মকর্তার দায়িত্বহীনতার বিষয়টি তার দপ্তরকে জানিয়েছে। আদালতের নির্দেশের পর পুলিশ তদন্ত করবে। পুলিশ সুপার তদন্ত সাপেক্ষে কী ব্যবস্থা নিয়েছেন, সেই বিষয়টি আদালতকে অবহিত করবেন।
এদিকে আদালতের নির্দেশের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দীন খাঁন বলেন, আদালতের নির্দেশে যদি তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ থাকে, তাহলে তদন্ত কমিটি গঠন করা সঠিক। দাগনভূঞা থানার ওসিকে প্রত্যাহারের আদেশের বিষয়ে তিনি বলেন, আদালতের ‘ব্যবস্থা’ শব্দের অর্থ আইনি ব্যবস্থা। আইনি ব্যবস্থার পূর্বশর্ত অনুসন্ধান ও তদন্ত। অনুসন্ধান ও তদন্ত ছাড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়া আইনে নিষিদ্ধ।
এর আগে, গত ৯ আগস্ট দেওয়া আদালতের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, দাগনভূঞার মমারিজপুর এলাকার বিবি মারজাহান (২৪) তার স্বামী রাকিব হাসান হৃদয়সহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে যৌতুকের দাবিতে মারধর ও গুরুতর আঘাতের অভিযোগ করেন। এ নিয়ে থানায় মামলা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে তিনি আদালতে অভিযোগ করেন।
সেই অভিযোগকারীকে পরীক্ষা, তার জবানবন্দি এবং উপস্থাপন করা কাগজপত্র পর্যালোচনা করে আদালত অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করে তদন্তের প্রয়োজনীয়তা দেখতে পান। পরে অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে তদন্তের জন্য পিবিআইকে দায়িত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা করতে দাগনভূঞা থানার ওসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
ওই আদেশে আরও বলা হয়, গৃহবধূ‚ মারজাহানের চিকিৎসার কাগজপত্রে মাথায় আঘাতসহ শারীরিক আঘাতের কথা উল্লেখ রয়েছে। গুরুতর আহত একজন নারীকে পুলিশ উদ্ধারের পরও তার অভিযোগ কেন মামলা হিসেবে নেওয়া হয়নি, তা বোধগম্য নয় বলে আদালত উলেখ করেন।
ওইদিন শুনানির সময় আইনজীবীরা একই থানায় আরেক গৃহবধূ‚ তানিয়া আক্তারকে (২২) যৌতুকের দাবিতে হত্যার অভিযোগে করা একটি মামলাও গ্রহণ না করার বিষয় আদালতের নজরে আনেন। ওই মামলায় গৃহবধূ‚কে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগ করা হলেও থানায় মামলা নেওয়া হয়নি বলে তারা অভিযোগ করেন।
আদালত আদেশে উল্লেখ করেন, পৃথক দুটি ঘটনার অভিযোগ মামলা হিসেবে গ্রহণে অস্বীকৃতির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট অভিযোগ, আইনজীবীদের বক্তব্য ও সংযুক্ত কাগজপত্র পর্যালোচনায় গুরুতর বলে প্রতীয়মান হয়েছে। এতে ওই কর্মকর্তার থানায় দায়িত্ব পালনের অযোগ্যতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এ অবস্থায় দাগনভূঞা থানার ওসিকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে পৃথক দুটি ঘটনায় মামলা নিতে অস্বীকৃতির বিষয়টি তদন্ত এবং তার বিরুদ্ধে যথাযথ বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেয় আদালত।