ব্যবসার কাগজে তার পরিচয় : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান।
সংসদের নথিতে : সাবেক সংসদ সদস্য।
ব্যবসায়ী সংগঠনে : শিল্পোদ্যোক্তা ও নেতা।
কিন্তু পারিবারিক ছবিগুলোয় মানুষটি অন্যরকম।
কখনো নাতিকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে নিজেই তার পাশে ঘুমিয়ে পড়েছেন। কখনো পারিবারিক বনভোজনে স্ত্রী আমেনার সঙ্গে লুডু খেলছেন। আবার কখনো সন্তান ও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে একেবারে সাধারণ পরিবারের একজন সদস্য। তার দীর্ঘ কর্মজীবনের ছবির অ্যালবামে যেমন সংসদ, কারখানা, আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক সফর আছে, তেমনি আছে ছোট ছোট মুহূর্তও। সন্তানদের বাড়ি ফিরতে দেরি হলে উদ্বিগ্ন হতেন। ফোন করে খবর নিতেন। পরিবারের সবাই ঘরে ফিরেছে জানলে স্বস্তি পেতেন। ব্যবসার কারণে সন্তানদের সব সময় যতটা সময় দিতে চেয়েছেন, হয়তো পারেননি। কিন্তু ছুটির দিন, ঈদ কিংবা পারিবারিক আয়োজনগুলোকে সেই ঘাটতি পূরণের সুযোগ হিসেবে দেখতেন। এই মানুষটিকে না জানলে শিল্পপতি আনোয়ার হোসেনকেও পুরোপুরি জানা হয় না। তার জীবনজুড়ে ‘পরিবার’ শুধু ব্যক্তিগত আশ্রয় ছিল না তার ব্যবসা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ ভাবনার কেন্দ্রও ছিল পরিবার।
সাফল্যের সঙ্গে ব্যর্থতাকেও লুকাননি
সফল মানুষের জীবনীতে একটি প্রবণতা থাকে সাফল্য বড় করে দেখা হয়, ভুল ও ব্যর্থতাগুলো হারিয়ে যায়। আনোয়ার হোসেনের দীর্ঘ ব্যবসায়িক যাত্রায় তা সম্ভব ছিল না। কখনো ব্যবসায় লোকসান হয়েছে, কখনো রাজনৈতিক পরিবর্তনে সম্পদ হারাতে হয়েছে, যুদ্ধ তাকে প্রায় নতুন করে শুরু করতে বাধ্য করেছে। আবার কখনো নতুন কোনো উদ্যোগ প্রত্যাশামতো সফল হয়নি। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় সম্ভবত এই যে, কোনো একটি ব্যর্থতাকে তিনি শেষ সিদ্ধান্ত হতে দেননি। পুরান ঢাকার দোকান থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা, সেখান থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রতিটি পর্যায়েই একটি অভ্যাস দেখা যায় : এক জায়গায় থেমে না থাকা। হয়তো এটিই তার উদ্যোক্তা জীবনের কার্যকর পাঠ।
পুরস্কারপ্রাপ্তি
দীর্ঘ জীবনে অনেক স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি।
অতীশ দীপঙ্কর স্বর্ণপদক, মওলানা ভাসানী জাতীয় পুরস্কার, সাংবাদিক মওলানা আকরম খাঁ স্মৃতি সংসদ স্বর্ণপদক, শেরে বাংলা স্মৃতি পুরস্কার এবং সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন স্বর্ণপদকসহ বিভিন্ন সম্মাননা তার কর্মজীবনে যুক্ত হয়েছে।
কিন্তু ৮২ বছরের জীবনকে কয়েকটি পদক দিয়ে মাপা কঠিন। আরও কঠিন তার উত্তরাধিকারকে শুধু কতগুলো কারখানা, কোম্পানি বা স্থাপনার তালিকায় আটকে ফেলা। কারণ শেষ পর্যন্ত আনোয়ার হোসেনের জীবনটি তিনটি সময়কে একসঙ্গে ধরে রেখেছে। তিনি জন্মেছেন ব্রিটিশ ভারতে। কৈশোর ও যৌবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন পূর্ব পাকিস্তানে। তারপর দেখেছেন মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম এবং নতুন দেশের অর্থনীতির গড়ে ওঠা। একজন মানুষের কর্মজীবনের মধ্য দিয়ে তাই একই সঙ্গে দেখা যায় পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্য থেকে আধুনিক করপোরেট শিল্পের উত্তরণ।
এখন সেই পথে অন্য প্রজন্ম
১৭ আগস্ট ২০২১। আলহাজ আনোয়ার হোসেনের দীর্ঘ জীবনের সমাপ্তি ঘটে। তার মৃত্যুর সঙ্গে এক স্বর্ণালি সময়ের অবসান হয়েছে। কিন্তু তার শুরু করা পথ শেষ হয়নি। কারণ একজন উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত তখনই, যখন তার তৈরি প্রতিষ্ঠান তাকে ছাড়িয়ে বেঁচে থাকে। একজন পরিবারের কর্তার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার তখনই, যখন তার পরের প্রজন্ম শুধু তার সম্পদ নয়, তার কাজের দর্শনটিও বহন করতে শেখে। আনোয়ার হোসেন নিজে পূর্বপুরুষের কাছ থেকে পেয়েছিলেন ব্যবসার ভিত। মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলেন পরিশ্রম, শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার শিক্ষা। সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তিনি ব্যবসাকে নিয়ে গিয়েছিলেন শিল্পে, শিল্পকে নিয়ে গিয়েছিলেন বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে। পরের প্রজন্ম তার গড়ে দেওয়া প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়েছে।
এখন সেই যাত্রায় যুক্ত হয়েছে আরও একটি প্রজন্ম।
সময় বদলেছে। ব্যবসার ভাষা বদলেছে। প্রযুক্তি, বাজার, ব্যবস্থাপনা সবই বদলাচ্ছে। কিন্তু একটি পরিবারের শত বছরের পথচলায় মূল্যবোধ বদলায়নি। কাজ করতে হবে, সৎ থাকতে হবে, ঝুঁকি নিতে হবে, মানুষের প্রতি দায়িত্ব ভুলে যাওয়া যাবে না। ১৯৩৮ সালের আমলীগোলার সেই শিশুটি হয়তো ভাবেননি তার শুরু করা যাত্রা এত দূর যাবে। কিন্তু ইতিহাসে কিছু মানুষের কাজের বিশেষত্ব এখানেই তারা নিজের জীবনের জন্য শুধু একটি গন্তব্য তৈরি করেন না। তারা একটি পথ তৈরি করে যান।