চাপে রাখার কৌশলে জামায়াত এনসিপি জোট

সরকারকে চাপে রেখে দাবি আদায়ের কৌশল বজায় রাখতে চায় জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট। এজন্য বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই বড় কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। চার বিভাগে লংমার্চসহ ঢাকায় মহাসমাবেশও করতে চায় বিরোধী জোট। তবে এখনই সরকার পতনের মতো কোনো কর্মসূচি তারা দেবে না। জোট নেতারা বলছেন, সরকার তাদের কর্মসূচিতে বাধা দিলে আরও বড় কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই বিএনপি সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করে বিক্ষোভ মিছিল, সভা-সেমিনার এবং বিবৃতি দিচ্ছে জামায়াত জোট। সম্প্রতি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ ইস্যুতে সচিবালয় ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচিও পালন করা হয়েছে। এর আগে মুক্তাঙ্গনে এক সমাবেশ থেকে চার বিভাগীয় শহরে লংমার্চ এবং ঢাকায় মহাসমাবেশের ঘোষণা দেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান।

গণভোটের রায় কার্যকর করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে কয়েক মাস ধরেই জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া, স্কুল কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া, জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং বিদ্যুতের ‘ভুতুড়ে বিল’ নিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। সম্প্রতি গ্যাসের দাম বাড়াতে সরকার কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে বলে অভিযোগ করছেন বিরোধী নেতারা।

গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে জুলাই-আগস্ট মাসে ঢাকাসহ সারা দেশে প্রায় প্রতিদিনই কর্মসূচি পালন করছে জামায়াতে ইসলামী। তা ছাড়া ছাত্র, যুব, মহিলা ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের ব্যানারেও কর্মসূচি দেওয়া হচ্ছে। এসব কর্মসূচিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, শহীদদের যথাযথ মর্যাদা ও জুলাই গণহত্যার বিচারের পাশাপাশি সরকারের নানা সমালোচনা করছেন নেতারা।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের রায় কার্যকর করার জন্য সরকার ইতিমধ্যে সংবিধান সংশোধন কমিটি করেছে। তবে সেই কমিটিতে প্রতিনিধি দেয়নি বিরোধী জোট। তারা সংবিধান সংস্কারের দাবি জানিয়ে কমিটি গঠনের দিনেই সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের দাবি খুবই স্পষ্ট। জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে আমরা সবাই একমত হলাম। বলা হলো একটি গণভোট হবে, সেই আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন হবে। এতে সরকারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আসবে। সেই আলোকে আমাদের এমপিরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন, কিন্তু তাদের (বিএনপি) সদস্যরা নিলেন না।’

তিনি বলেন, ‘সরকারের ক্ষমতায় ভারসাম্য জরুরি। সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীকে যে একক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তার ফলে কী হয় তার বাস্তব উদাহরণ শেখ হাসিনার শাসনামল। এ জাতির দুর্ভাগ্য বারবার স্বৈরাচার ঘাড়ে চেপে বসে, আর মানুষ জীবন দিয়ে তাদের ক্ষমতা থেকে নামায়। আমার চাই এবারই এটার অবসান হোক। আগামী ২৭ আগস্ট সংসদের যে অধিবেশন ডাকা হচ্ছে, সেখানেই সরকার এর সুরাহা করুক।’

এক প্রশ্নের জবাবে অ্যাডভোকেট জুবায়ের বলেন, ‘আমরা সংসদে প্রতিবাদ করেছি, দাবি জানিয়েছি। গত মার্চ থেকে তিন মাসের কর্মসূচি পালন করেছি। এখন আবার তিন মাসের কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে। এগুলোতে গণভোটের জনরায় বাস্তবায়নের পাশাপাশি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার দাবি তোলা হয়েছে। আমরা মানুষের জন্য রাজনীতি করি। দেশের মানুষের যেকোনো সংকটে জামায়াতে ইসলামী প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করবে।’

সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর, ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা, ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেট লংমার্চ (রেলপথে) কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। এ ছাড়া ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচি নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান জানান, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, সব ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর, তেল, গ্যাস বিদ্যুতের দাম কমিয়ে আনা, জনভোগান্তি নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, খুনিদের বিচার নিশ্চিত, সম্পদ লুণ্ঠনকারীদের বিচার দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্য আন্দোলনে নেমেছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

সরকারকে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে ১১ দল অনেকগুলো কর্মসূচি পালন করেছে। নতুন ঘোষিত লংমার্চ জনগণের দাবি আদায়ের জন্য। অতীতের মতো যেন বাধা দেওয়া না হয়। বাধা দিলে লংমার্চ দ্বিগুণ গতিতে গন্তব্যে পৌঁছবে।’

এমপিদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ : উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ নানা কাজে বিরোধী দলের এমপিদের ‘মূল্যায়ন’ না করার অভিযোগ করেছেন জোট নেতারা। সরকারি দল বিএনপির সাবেক মহাসচিব ও সাবেক এলজিআরডিমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি রংপুরে এক সমাবেশে ওই এলাকার উন্নয়ন না হওয়ার কারণ হিসেবে জামায়াত-জাতীয় পার্টিকে ভোট দেওয়াকে দায়ী করে বক্তব্য দেন। তার এই বক্তব্যকে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলে দাবি করছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। তাদের দাবি, বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত হওয়া এমপিদের নানাভাবে কোণঠাসা করে রাখা হচ্ছে। অনেক এলাকায় এমপিদের ওপর ‘মব’ সৃষ্টি করে হেনস্তা করা হচ্ছে। যশোরে এক এমপির বাড়িতে হামলার ঘটনাও ঘটেছে।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে তারা বাকশালের পথে হাঁটছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের খবর নেই, সব জায়গায় দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে বসাচ্ছে। বিরোধীদলীয় এমপিদের বঞ্চিত করা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সব সময় স্থানীয় এমপিকে সিন্ডিকেট মেম্বার করা হয়। অথচ আমাকে বাদ দিয়ে সরকারি দলের একজন সংরক্ষিত এমপি ও মাদারীপুরের একজন এমপিকে সিন্ডিকেটের মেম্বার করা হলো। বুটেক্স, পলিটেকনিকসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অনুষ্ঠানে স্থানীয় এমপিকে রাখা হয় না। এখানে শুধু আমাকে না, এই এলাকার মানুষ যে ভোট দিয়েছে, তাদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে।’

রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী : নিশ্চিত পরাজয় জেনেও রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দিয়েছে ১১ দলীয় ঐক্য। এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমকে এ পদে প্রার্থী দিয়ে জামায়াত মূলত কয়েকটি বার্তা দিতে চায়। সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা নানা সমালোচনা করলেও জামায়াতের এই কৌশল রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা তৈরি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বর্তমান ৩৪৯ সদস্যের সংসদে সরকারি দল বিএনপির এমপি ২৪৭ জন। জামায়াত জোটের সদস্য ৯০ জন। সংরক্ষিত নারী আসনসহ স্বতন্ত্র এমপি আটজন। ইসলামী আন্দোলন, বিজেপি, গণঅধিকার পরিষদ ও গণসংহতি আন্দোলনের একজন করে এমপি রয়েছেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ের জন্য প্রয়োজন ১৭৫ ভোট। ফলে বিএনপির প্রার্থীর জয় হওয়া নিশ্চিতই বলা যায়।

তবে বিরোধী জোটের নেতারা বলছেন, রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দেওয়ার মাধ্যমে সরকারকে একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে। কোনো কিছুই বিনা চ্যালেঞ্জে ছাড়বে না বিরোধী দল। সংবিধান সংস্কার হলে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল অলি আহমদই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতেন। বিএনপির অনেক এমপি তাকে পছন্দ ও যোগ্য মনে করেন বলেও দাবি করছেন তারা। তা ছাড়া জোটের বড় দল হিসেবে জামায়াতের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে থেকে এ পদে প্রার্থী দেওয়ার আলোচনা ছিল। তবে জোটের স্বার্থে এবং ‘অধিকতর যোগ্য’ বিবেচনায় এলডিপির চেয়ারম্যানকে প্রার্থী করা হয়েছে। এতে ১১ দলের ঐক্যের শরিক দলগুলোর মধ্যে বন্ধন আরও দৃঢ় হবে বলে মনে করছেন নেতারা।

এর আগে ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর বিরোধী দল আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপতি পদে বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে প্রার্থী করেছিল। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আব্দুর রহমান বিশ্বাসের কাছে ৮০ ভোটে পরাজিত হন তিনি। ইতিহাসে দ্বিতীয়বার এ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে যাচ্ছে।

সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ১১ দল ঐক্যবদ্ধভাবে এ নির্বাচনে অংশ নেবে এবং তাদের একজন অভিন্ন প্রার্থী দেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপি সংস্কারের পথে হাঁটলে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধভাবে একক প্রার্থী দিতে পারত, কিন্তু তারা তা করেনি। এ কারণে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে আলাদাভাবে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলে ব্যক্তির চেয়ে প্রক্রিয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতো। বিএনপি সেই প্রক্রিয়া পরিবর্তন না করে রাষ্ট্রপতি পদকে দলীয় ব্যাপার হিসেবে নিয়েছে।’