স্থিতিশীলতা ফেরাতে বহুমুখী প্রচেষ্টা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে নির্বাচনী অঙ্গীকার ও অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। প্রশাসনিক কাঠামো সাজানো এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। তবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জনআকাক্সক্ষা পূরণের গতি নিয়ে নানা মহলে বিতর্ক ও সমালোচনা রয়েছে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২১২ আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। নির্বাচনের পাঁচ দিন পর ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়। এ হিসাবে আজ ১৭ আগস্ট পূর্ণ হচ্ছে সরকারের ছয় মাস। ৪৭ সদস্যের মন্ত্রিসভায় ২৪ মন্ত্রী ও ২৩ প্রতিমন্ত্রী আছেন।

দায়িত্বগ্রহণের প্রথম ১৮০ দিনে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক সংস্কার, স্বাস্থ্য-শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন খাতে একাধিক উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলছে সরকার। সরকার তার প্রথম ছয় মাস নিয়ে একটি মূল্যায়ন তৈরি করেছে। তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আজ সোমবার সংবাদ সম্মেলন করে এটি জাতির সামনে তুলে ধরবে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

এর আগে গত শুক্রবার নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘সরকার গঠনের পর প্রথম ছয় মাসে বিএনপি সরকারের অধিকাংশ নির্বাচনী অঙ্গীকার ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কোথাও ১০০ শতাংশ, আবার কোথাও ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। এ সময়ে কর্মসূচিগুলো চালু করার জন্য সরকারকে অনেক প্রস্তুতিমূলক কাজ করতে হয়েছে। আগামী ছয় মাস আরও বেশি ফলপ্রসূ হবে।’

জানা গেছে, সরকারের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দায়িত্বের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, জনকল্যাণ, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, প্রশাসনিক সংস্কার ও পররাষ্ট্রনীতিতে একাধিক উদ্যোগ নেওয়ার দাবি করা হয়েছে। এসবের মধ্যে আছে নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড বিতরণ, কৃষকদের কৃষিঋণ মওকুফসহ বেশ কয়েকটি কর্মসূচি, যা সরকারের অন্যতম সাফল্য। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ছয় মাসে মূল লক্ষ্য ছিল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন শুরু করা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন ধারা প্রতিষ্ঠা করা। এ সময়ে সরকার বিভিন্ন খাতে কর্মসূচি গ্রহণের পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যক্তিনির্ভরতার পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিকতা, মিতব্যয়িতা ও জবাবদিহির রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। সরকারি অফিস, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থানে নেতাদের ছবি টাঙানোর প্রচলন বন্ধ, সরকারি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার না করা, ভিআইপি সংস্কৃতি কমানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী সরকারি গাড়ির পরিবর্তে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করছেন। তার বহরে গাড়ির সংখ্যা কমানো হয়েছে এবং বিদেশ সফর ও সরকারি আপ্যায়ন ব্যয়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাটছাঁটের কথাও তুলে ধরা হয়েছে সরকারের মূল্যায়ন রিপোর্টে। এতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীও মাসিক মূল বেতনের ১০ শতাংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিচ্ছেন। এ ছাড়া জাতীয় সংসদের ৫২ কার্যদিবসে ১০৫টি বিল পাসের বিষয়টি এসেছে মূল্যায়ন রিপোর্টে।

এক কোটি কর্মসংস্থানের রোডম্যাপ : নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ২০২৬-৩১ মেয়াদে প্রায় এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) প্রস্তাব অনুযায়ী দেশ ও বিদেশ মিলিয়ে ৯৩ লাখ ২৭ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রীয় এজেন্ডা হিসেবে দেখছে। শিল্পায়ন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, অনানুষ্ঠানিক খাত, স্টার্টআপ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে কর্মসংস্থানের চালিকাশক্তি করার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।

খাদ্যনিরাপত্তায় বড় মজুদ : খাদ্য মজুদের ক্ষেত্রে সরকার তুলনামূলকভাবে পরিমাপযোগ্য অগ্রগতির কথা জানিয়েছে। সরকারি গুদামে ২৮ জুন পর্যন্ত ২২ লাখ ১০ হাজার ৯৪৫ টন খাদ্যশস্য মজুদ ছিল, যা নির্ধারিত নিরাপদ মজুদের চেয়ে প্রায় ৮ লাখ ৬০ হাজার ৯৪৫ টন বেশি। একই সময়ে বোরো সংগ্রহ অভিযানে ২ লাখ ৭১ হাজার ৩১২ টন ধান এবং ৭ লাখ ৯৮ হাজার ৯১২ টন চাল সংগ্রহের তথ্য দেওয়া হয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই মজুদ বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার সক্ষমতা বাড়িয়েছে।

অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা : অর্থনীতিকে সরকারের ছয় মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডাগুলোর একটি হিসেবে দেখানো হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেওয়া হয়েছে। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ‘রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন’, ‘রেস্টোরেশন’ এবং ‘রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসেলারেশন’–এই তিন ধাপের কৌশল ঘোষণা করা হয়েছে।

ব্যবসার পরিবেশ সহজ করতে ব্যবসা শুরুর সময় প্রায় এক বছর থেকে কমিয়ে ১৪ দিনে নামানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক অনুমোদনগুলো একীভূত করে ১২ মাসের প্রভিশনাল লাইসেন্স এবং ১৫তম দিনে যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকদের অর্থায়ন সহজ করা এবং সবুজ বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ১৯ হাজার কোটি টাকার চারটি পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি চালু করেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রথম ছয় মাসে সরকারের অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু ছিল স্থিতিশীলতা ফেরানো, বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর ভিত্তি তৈরি করা। তবে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামানো বা এক কোটি কর্মসংস্থানের মতো বড় লক্ষ্যগুলোর প্রকৃত সাফল্য বিচার করতে আরও সময় প্রয়োজন। সরকারের ছয় মাসের সফলতা ও ব্যর্থতার বিষয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এই ছয় মাস অর্থনীতির জন্য একটি রূপান্তর ও প্রস্তুতি পর্ব। এ সময়ে অর্থনীতিকে চাঙা করা, পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবসা বন্ধ করা এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির পথ সুগম করার কাজ চলছে। অর্থনীতির পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগবে বলে সরকার ধাপে ধাপে সংস্কার চালিয়ে যাচ্ছে।’

খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ : ২০২৬ সালে সরকার ৫ কোটি ১৫ লাখ গাছের চারা রোপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে প্রথম ছয় মাসে অর্থাৎ ১৮০ দিনে ২ কোটি ২২ লাখ ৬৮ হাজার চারা রোপণ করা হয়েছে বলে মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এ ছাড়া আগামী ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনার মধ্যে ১ জুলাই থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত ২ হাজার ১৬৫ কিমি পুনঃখনন হয়েছে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ১৮০ দিনের টার্গেট কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পেরেছে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের দায়িত্ব দেওয়ার পর যে কাজ দিয়েছেন, সেটি আমরা পরিপূর্ণভাবে সফলতার সঙ্গে মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করেছি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে খাল খননের যে টার্গেট তার ১০২ শতাংশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বৃক্ষরোপণের যে টার্গেট ছিল, সেটিও আমরা টার্গেট তুলনায় বেশি লাগিয়েছি।’

কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষকে সরাসরি সহায়তা : জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সামনে আনা হয়েছে। ক্ষুদ্র কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। এতে প্রায় ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ কৃষক উপকৃত হয়েছেন বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।

বিএনপির অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল ফ্যামিলি কার্ড চালু করা। গত ছয় মাসে সরকার ৬৭ হাজার ২৭৮টি কার্ড বিতরণ করেছে। আগামী বছরের জুনের মধ্যে অন্তত ৪১ লাখ নারীকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। এ ছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ৪৩ লাখ কৃষকের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের কৌশলটি হচ্ছে প্রচলিত ভর্তুকি বা প্রশাসনিক সহায়তার পাশাপাশি সরাসরি সুবিধাভোগীর কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও স্বাস্থ্য কার্ড এই কাঠামোর অংশ।

আইন প্রয়োগে কঠোরতা, দ্রুত বিচারে সাফল্য : আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে সরকারের প্রথম ছয় মাসের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে দাবি করা হয়েছে। রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচারের রায় ১৯ দিনে এবং মেহেরপুরের শিশু ধর্ষণ মামলার রায় ২৯ কার্যদিবসে হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে মূল্যায়ন প্রতিবেদনে। এছাড়া চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর বড় অভিযানকে ‘রাষ্ট্রের কর্র্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা’র উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ৩ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার সদস্যের এ অভিযানে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও এপিবিএন অংশ নেয়। সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ বড় কয়েকটি হত্যা মামলার আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার এক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪৫ বছর বছর পর।

পুশইন ঠেকানো, সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো এবং নাগরিকত্ব যাচাইয়ে কঠোর অবস্থানকে সরকার নিরাপত্তানীতির অন্যতম দিক হিসেবে মনে করছে। কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন সীমান্তে গত ছয় মাসে অনেক পুশইনের চেষ্টা প্রতিহত করছে বিজিবি।

কারাগার ও আটককেন্দ্রে মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ‘ন্যাশনাল প্রিভেন্টিভ মেকানিজম’ বিভাগ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী এ বিভাগ আগাম ঘোষণা ছাড়াই কারাগার, পুলিশ হেফাজত ও অন্য আটককেন্দ্র পরিদর্শন করতে পারবে। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানান, দেশে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। বিচার বিভাগের আধুনিকায়ন ও বিচারপ্রার্থীর দুর্ভোগ লাঘবে গত ছয় মাসে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নতুন জেলাগুলোতে অনলাইন ই-বেইলবন্ড সিস্টেমের উদ্বোধন অন্যতম।

পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য, চীন-মালয়েশিয়া সফর : ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ এবং ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ এ নীতিকে সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে মূল্যায়ন প্রতিবেদনে। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াসহ বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখার কথাও বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জুনের চীন সফরকে ছয় মাসের অন্যতম বড় কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই সফরে ২০টির বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই এবং অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতার বিভিন্ন উদ্যোগের বিষয়ে অগ্রগতি হয়।

এর আগে মালয়েশিয়া সফরে শ্রমবাজার ফের চালু, কর্মী নিয়োগে স্বচ্ছতা এবং বাংলাদেশি শ্রমিকদের সুরক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার খোলার সিদ্ধান্ত এবং সিন্ডিকেট ব্যবস্থা বাতিলের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১ তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়াকেও কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখছে সরকার।

শিক্ষা খাতে বড় বরাদ্দ ও ডিজিটাল রূপান্তর : শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা করা হয়েছে। শিক্ষায় বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। পাশাপাশি ৪৩ দফা অগ্রাধিকার কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’, ফ্রি ওয়াই-ফাই, ডিজিটাল ক্লাসরুম, বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস ও ব্যাগ এবং শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি বাড়ানোর মতো কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। হিসাব অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচির ২০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার ডিজিটাল ক্লাসরুম চালু হয়েছে এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুরনো ৬৫ হাজার ল্যাপটপ ও ৬২ হাজার মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর সংস্কার করে ৮২ শতাংশ ক্লাসরুম সচল করার দাবি করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা : স্বাস্থ্য খাতে সরকার ঘোষিত লক্ষ্য হচ্ছে চিকিৎসাসেবায় মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। এ জন্য এক লাখ হেলথ কেয়ারার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যাদের ৮০ শতাংশ হবেন নারী। পাশাপাশি আরও পাঁচ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

হৃদরোগের স্টেন্ট, ভাল্ব, পেসমেকার, অক্সিজেনেটর ও ক্যানসার চিকিৎসার কিছু কাঁচামালের ওপর ভ্যাট ও কর কমানো বা প্রত্যাহারের কথাও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিটি নাগরিকের জন্য ইলেকট্রনিক হেলথ কার্ড চালুর লক্ষ্যে স্বাস্থ্য ডেটা আর্কিটেকচার তৈরির কাজ শুরু হয়েছে, উল্লেখ করা হয়েছে সরকারের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে।

মুক্তিযোদ্ধা, জুলাই যোদ্ধা, ধর্মীয় নেতাদের সুবিধা বৃদ্ধি : বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরশ্রেষ্ঠদের পরিবারের ভাতা বাড়ানো হয়েছে। ১৪ হাজার ৩৬৮ জন গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধার মধ্যে ১৩ হাজার ৪৭৯ জন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে মাসিক ভাতা পাচ্ছেন। ধর্মীয় নেতাদের জন্য পরীক্ষামূলক সম্মানী কর্মসূচির আওতায় ১৩ হাজার ৯৪৯ জনকে ভাতা দেওয়া হয়েছে।

আছে বহুমুখী সংকটও : গত ছয় মাসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। মার্চ ও এপ্রিলে জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির পর জুলাইয়ে গ্যাস সরবরাহে তীব্র ঘাটতি দেখা দেয়। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় শিল্পকারখানা, সার কারখানা ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে দেখা দেয় অচলাবস্থা। এমনকি কিছু শিল্পকারখানাকে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়।

এ সময়ে ১১ সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বিএনপির নেতাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং দলীয় ব্যক্তিদের ১১ সিটি করপোরেশন ও ৪২ জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনায় সমালোচনা দেখা দিয়েছে।