রেসপন্স টিম গঠনের পরামর্শ সিপিডির

দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম’ গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, জরুরি ভিত্তিতে একটি গ্যাস উন্নয়ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কমিটি গঠন করতে হবে। এই কমিটিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিব, এনবিআর চেয়ারম্যান, বিইআরসি, ডিপিডিসি, বিপিডিবি, বিএসআরইএ, স্রেডা ও পেট্রোবাংলার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

গতকাল রবিবার সকালে রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ ‘পোশাক খাতে শিল্প কার্বন নিঃসরণ হ্রাস : কীভাবে একে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়?’ শীর্ষক সিপিডির সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির অনুষ্ঠান সহযোগী সামি মোহাম্মদ। সংলাপে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সহ-সভাপতি ব্যারিস্টার ভিদিয়া অমৃত খানসহ খাত সংশ্লিষ্টরা বক্তব্য রাখেন।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন পর্যায়ে যেসব সমস্যা তৈরি হচ্ছে, তার অন্যতম কারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা। এখন সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করার কোনো সুযোগ নেই। এসব সিদ্ধান্ত এখন টেবিলে বসেই নেওয়া সম্ভব। কারণ এগুলো মূলত অপারেশনাল সিদ্ধান্ত, এর জন্য নতুন কোনো নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন নেই। জরুরি ভিত্তিতে কমিটি গঠন করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে কার্যক্রমও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

সিপিডির গবেষণায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারকে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ৩৫০টি পোশাক কারখানার ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, কার্বন নিঃসরণ কমাতে শুধু প্রযুক্তি পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন।

সিপিডি জানায়, এসব কারখানার মোট মেশিনের প্রায় ৮৫ শতাংশ সুইং বিভাগে থাকলেও সবচেয়ে বেশি জ্বালানি-নিবিড় প্রক্রিয়া ওয়াশিং ও ডাইং। অন্যদিকে, মেশিন প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে কাটিং বিভাগে। দক্ষ মেশিন ব্যবহারের মাধ্যমে একটি কারখানায় গড়ে প্রায় ১০ দশমিক ১৭ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব। ছোট কারখানায় এই সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৫৭ শতাংশ পর্যন্ত। তবে উচ্চ-প্রাথমিক বিনিয়োগ ব্যয়, তথ্যের ঘাটতি, স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির পথে বড় বাধা।

বিএসআরইএ সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশে আগামী দিনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পের টিকে থাকা, রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের জন্য দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর জরুরি। বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতিই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি স্টোরেজে করমুক্তির সরকারি ঘোষণা বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগ তুলে বিএসআরইএ সভাপতি বলেন, ‘বাজেট বক্তৃতায় বলা হচ্ছে সোলার প্যানেল, সোলার সিস্টেম ও ব্যাটারি স্টোরেজের ওপর কোনো কর নেওয়া হবে না। অথচ এখনো প্রায় ১৭ শতাংশ কর-ভ্যাট রয়েছে। রেসকো মডেলেও ১৭ শতাংশ কর-ভ্যাট রয়েছে। তাহলে সরকারি ঘোষণা ও বাস্তবতার মধ্যে এত পার্থক্য কেন?’

বিজিএমইএ সহ-সভাপতি ভিদিয়া অমৃত খান বলেন, তৈরি পোশাক খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর এখন আর কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের পোশাক ও বস্ত্র খাতের টিকে থাকার জন্য বৈশ্বিক বাধ্যবাধকতা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন নির্দেশনা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতির কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে দ্রুত টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থায় যেতে হবে।

ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আসিফ শাহরিয়ার বলেন, দেশের ছোট পোশাক কারখানাগুলোকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির আওতায় আনতে ওপেক্স মডেলে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। নবায়নযোগ্য জ্বালানির আসলে কোনো বিকল্প নেই। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে। দেশে মাটিতে স্থাপন করা প্রকল্পের পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ দেশে জায়গা ও জমির স্বল্পতা রয়েছে। এ কারণে রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ একটি ভালো বিকল্প হতে পারে।