যার শিল্পিত উচ্চারণে কবিতায় প্রস্ফুটিত হয়েছে মানুষের মুক্তির দুনির্বার আকাক্সক্ষা, মূর্ত হয়েছে বাঙালির আন্দোলন-সংগ্রামের গৌরবগাথা, ‘স্বাধীনতার কবি’খ্যাত সেই কবি শামসুর রাহমানের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান এ কবি ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট অনন্তের পথে পাড়ি জমান।
সমকালীনতা ধারণকারী অনন্য প্রতিভায় উজ্জ্বল শামসুর রাহমান ছিলেন মূলত নাগরিক কবি। তার কবিতায় নগর ঢাকার আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা নান্দনিকতা পেয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনাচরণ ও লেখালেখির জগতে তিনি ছিলেন একজন শুভ্র পুরুষ। খ্যাতির অহংকার তাকে কখনো স্পর্শ করেনি।
প্রথম কাব্যগ্রস্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশের পরপরই শামসুর রাহমান সচেতন পাঠকমহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। প্রকাশিত হয়েছে ষাটের বেশি কবিতার বই। তার কাব্যগ্রন্থের নামের মধ্যেই যেন ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশের ইতিহাসের নানা বাঁক বদল। ‘বন্দী শিবির থেকে’ (১৯৭২), ‘দুঃসময়ে মুখোমুখি’ (১৯৭৩), ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাটা’ (১৯৭৪), ‘বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখে’ (১৯৭৭), ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে’ (১৯৮৩), ‘দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে’ (১৯৮৬), ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’ (১৯৮৮) প্রভৃতি তার উজ্জ্বল স্বাক্ষর।
আপন কাব্যশৈলীতে শামসুর রাহমান ধারণ করেছেন বাঙালির সুবর্ণ সময়। তার ‘আসাদের শার্ট’ কবিতায় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান যেন সচিত্র রূপ পায়। ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ কিংবা ‘স্বাধীনতা তুমি’র মতো অজস্র কালজয়ী কবিতার স্রষ্টা শামসুর রাহমান। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি সপরিবারে পৈতৃক বাড়ি নরসিংদীর পাড়াতলী গ্রামে চলে যান। এপ্রিলের প্রথম দিকে তিনি যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে বেদনামথিত হয়ে লেখেন ‘স্বাধীনতা তুমি’ ও ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’সহ বেশকিছু কবিতা।
স্বাধীনতার চেতনার পাশাপাশি নগরবাসীর বহুবিধ অনুভূতির চমৎকার সব বিবরণ ফুটে উঠেছে তার কবিতায়। ব্যক্তিমানুষের নিঃসঙ্গতা-একাকিত্ব-অসহায়ত্ব-গ্লানি-দুঃখ-বেদনা-আনন্দ এবং নস্টালজিয়া তার কবিতার বিষয় হিসেবে এসেছে। কবিতা ছাড়াও শিশুতোষ, অনুবাদ, ছোটগল্প, উপন্যাস, আত্মস্মৃতি, প্রবন্ধ-নিবন্ধের গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
গত জুনে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে আয়োজিত সেমিনারে এ বরেণ্য কবির মূল্যায়ন করতে গিয়ে আলোচকরা বলেন, “শামসুর রাহমান বাংলাদেশের কবিতার ‘শামস’ বা সূর্য। বিংশ শতাব্দীর উত্তরার্ধ্বজুড়ে এ দেশের কবিতায় তিনি সূর্যকিরণ ছড়িয়েছেন। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের আধুনিক কবিতার নন্দন-অভিজ্ঞতাকে দেশ-কাল-পরিপ্রেক্ষিতের সঙ্গে সমন্বিত করে তিনি কবিতায় এক নতুন নান্দনিকতা প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা একই সঙ্গে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক।”
স্বাধীনতার পর পঁচাত্তর-পরবর্তী পটপরিবর্তনে আশাহত কবি সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ ও স্বৈরশাসনের প্রতিবাদে তার কলম চালিয়েছেন। গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণের আকাক্সক্ষায় তিনি নিরন্তর লেখালেখি করেছেন। প্রগতিশীল আন্দোলন-সংগ্রামেও সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন। একবার নিজের বাড়িতে তিনি মৌলবাদীদের দ্বারা শারীরিক আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন।
পেশাজীবনে শামসুর রাহমান ছিলেন সাংবাদিক। ১৯৫৭ সালে কর্মজীবন শুরু করেন দৈনিক মর্নিং নিউজে। ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৮৭ সালে জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনামলে তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।
শামসুর রাহমানকে দেশে প্রায় সব মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। এর মধ্যে স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, আদমজি সাহিত্য পুরস্কার উল্লেখযোগ্য।
শামসুর রাহমানের জন্ম ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর পুরান ঢাকার ৪৬ মাহুতটুলীর বাড়িতে। ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট মৃত্যুর পর তার ইচ্ছা অনুযায়ী ঢাকার বনানী কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে সমাহিত করা হয়। আজীবন কবিতায় সমর্পিত এ কবি চির উজ্জ্বল হয়ে বেঁচে আছেন বাঙালির সত্তায়।