শাবাশ বাংলাদেশ...

রিচি বেনো আর শেন ওয়ার্ন; অস্ট্রেলিয়ার দুই ভিন্ন প্রজন্মের দুই কিংবদন্তি। দুই দশক আগে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সমালোচনা করে রিচি বেনো বলেছিলেন বাংলাদেশকে টেস্ট থেকে ছেঁটে ফেলা উচিত। ওয়ার্ন আরও এক ধাপ এগিয়ে দাবি করেছিলেন, এমন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে সহজে সেঞ্চুরি আর উইকেটের পাহাড় গড়ে টেস্ট ক্রিকেটের মূল ইতিহাস ও পরিসংখ্যানকেই বিকৃত করা হচ্ছে।

বেনো ও ওয়ার্ন দুই জনই চির বিদায় নিয়েছেন। বেঁচে থাকলে ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে বসে মাইক্রোফোন হাতে তাদের প্রিয় অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের বর্ণনা দিতে হতো। মার্ক ওয়াহ কিংবা রিকি পন্টিংয়ের মতো তাদেরও বাংলাদেশের জয়কে বলতে হতো ‘টেস্ট ক্রিকেটের দেড়শ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অঘটন’।

ম্যাচের কয়েক দিন আগেই প্রস্তুতি ম্যাচে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের কাছে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হয়ে যে দলটি চরম ব্যঙ্গের শিকার হয়েছিল, এবং নতুন পেস সেনসেশন নাহিদ রানাকে ছাড়া প্যাট কামিন্স ও স্টিভ স্মিথদের ডেরায় খেলতে নেমে যাদের ঘিরে তৈরি হয়েছিল ঘোর শঙ্কা সেই বাংলাদেশই বিশ্ব টেস্টের এক নম্বর দলকে এভাবে দুমড়ে-মুচড়ে দেবে, তা কে ভেবেছিল! অথচ ২০০৩ সালের পর দীর্ঘ ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নিজের ৩য় প্রচেষ্টায় নেমেই প্রথম সেশন থেকে বদলে যাওয়া এক বাংলাদেশকে দেখা গেল।

টসে হেরে বোলিংয়ে নেমে ডারউইনের চেনা গতি ও বাউন্সকে প্রতিপক্ষের অস্ত্র না বানিয়ে নিজেদের শক্তিতে পরিণত করেন বাংলাদেশ পেসাররা। হাসান মাহমুদের নিখুঁত লেংথ আর সুইংয়ের তোপে পড়ে অসি টপ-অর্ডার। একাই ৫৫ রানে ৬ উইকেট শিকার করে অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানে (স্মিথ ৭১) ধসিয়ে দেন হাসান। বিশ্ব ক্রিকেট তাজ্জব বনে দেখে তাসকিন-হাসানদের বল অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কীভাবে আগুন ঝরায়!

ব্যাটিংয়ে নেমেও বাংলাদেশ দেখাল অভূতপূর্ব সংযম ও পরিণত মানসিকতা। দেশের মাঠে স্পিনবান্ধব ‘মিরপুরের সাপের গর্ত’ ছেড়ে পেস-সহায়ক উইকেটে অনুশীলনের দীর্ঘদিনের যে প্রচেষ্টা, তারই ফসল মিলল ব্যাটে। জশ হ্যাজলউডের বিষাক্ত বোলিংয়ের (৬/৮৯) মুখে দাঁড়িয়ে ওপেনার তানজিদ হাসানের নান্দনিক ও ক্যারিয়ারের প্রথম অনবদ্য সেঞ্চুরি (১০১), অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর দৃঢ়তাপূর্ণ ৮৪ রান এবং অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজের বুকচিতিয়ে লড়াই করা ৬৫ রানে ভর করে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রানের বিশাল পাহাড় গড়ে, যার ওপর ভর করে মেলে ২২৮ রানের পর্বতসম লিড।

এই লিড দেখেই অনেকে বলছিলেন, অস্ট্রেলিয়া এ ম্যাচে হারতে যাচ্ছে। তৃতীয় দিনে ৪ উইকেট তুলে নিয়ে হাসান-মিরাজরা সেই ইঙ্গিত দিয়ে রাখেন। ৪ উইকেটে ১৫৪ রান নিয়ে গতকাল চতুর্থ দিনে খেলতে নামে অস্ট্রেলিয়া। সকালের সেশনে অফস্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজ দুর্দান্ত বোলিংয়ের পশরা সাজান। তিনি ডট বলে চেপে ধরে একে একে ফেরান অ্যালেক্স ক্যারি (৩০), বিউ ওয়েবস্টার ও অজি অধিনায়ক প্যাট কামিন্সকে। লাঞ্চের পর তাসকিন আহমেদ স্টার্ককে ফেরানোর পর অজিদের হয়ে একাই লড়াই চালিয়ে যান ক্যামেরন গ্রিন। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা উইকেটে টিকে থেকে ২০১ বলে মাত্র ৪টি চার ও ১টি ছক্কায় নিজের ৩য় টেস্ট সেঞ্চুরি (১০৪) পূর্ণ করেন তিনি।

ম্যাচে ৯ উইকেট নেওয়া হাসান মাহমুদ আক্রমণে ফিরেই গ্রিনের ভেতরের দিকে ঢোকা নিচু বলে আউটসাইড এজে তাকে বোল্ড করলে ভেঙে পড়ে স্বাগতিকদের প্রতিরোধ। শেষ উইকেট হিসেবে নাথান লায়নকে এলবিডব্লিউ করে ইনিংসে ৬৬ রানে ৫ উইকেট এবং ক্যারিয়ারের ১৫তম ৫ উইকেটের মাইলফলক পূর্ণ করেন মিরাজ। ২৮৪ রানে গুটিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংস।

জয়ের জন্য বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান। তানজিদ বিদায় নিলেও সাদমান ইসলাম (২৫*) ও মুমিনুল হকের (৩০*) দৃঢ়তায় স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ৩৬ মিনিটে ১ উইকেট হারিয়ে খুব সহজেই সেই ইতিহাস ছুঁয়ে ফেলে বাংলাদেশ। মুমিনুল হক কভার দিয়ে বাউন্ডারি মেরে যখন জয়সূচক রান নেন, বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমের সামনে শান্তদের বাধ ভাঙা উদযাপন। রবিবারের মারারা ওভালের প্রায় ফাঁকা গ্যালারিতে সামান্য সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশিদের জাতীয় পতাকা হাতে বুনো উদযাপন। মিরাজ, লিটনদের নিয়ে মোবাইলে সেলফি তুলছেন তারা।

মারারা স্টেডিয়ামের গোধূলির আলোয় দেশ থেকে আসা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভিডিও কল শেষ করে, প্লাস্টিকের চেয়ারগুলো পরম যত্নে ড্রেসিংরুমে গুছিয়ে রাখছিলেন শান্ত-মিরাজরা। অজিদের তাদেরই ঘরের মাঠে ৯ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে গুঁড়িয়ে দিয়ে এবং বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলে ভারতকে পেছনে ফেলে তাদের স্পষ্ট বার্তা বাংলাদেশ আর শুধু টেস্টের ‘অনুগ্রহপ্রাপ্ত’ সদস্য নয়, লাল বলের ক্রিকেট শাসন করার সামর্থ্য নিয়েই এখন তারা মাঠে নামে।

‘আমরা বিশ্ব ক্রিকেটকে একটি ভালো বার্তা দিতে পেরেছি। বাংলাদেশ যেকোনো কন্ডিশনে ভালো ক্রিকেট খেলতে পারে। যেকোনো ফরম্যাটে এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জয়। এমন জয় ভবিষ্যতে আমাদের আরও বেশি সুযোগ এনে দিতে পারে’, যেমনটা বলছিলেন গর্বিত অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত।

বাংলাদেশের অনেক গর্বিত জয়ের নায়ক তামিম ইকবাল এখন বাংলাদেশ ক্রিকেটের কর্ণধার। তিনি বলছেন, বড় দলগুলোর সঙ্গে আরও বেশি বেশি টেস্ট আয়োজনে দর কষাকষি করতে পারবেন তিনি আইসিসির বৈঠকে।

ওদিকে রিচি বেনো আর শেন ওয়ার্ন স্বর্গ থেকে হয়তো বলছেন ক্রিকেট সত্যিই এক অদ্ভুত খেলা!