পেনশন পেতে টেনশন

এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর এবং কল্যাণ সুবিধার টাকা ছাড় কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ। একই দিনে সবার ব্যাংক হিসাবে টাকা যাওয়ার কথা থাকলেও অনেক শিক্ষক-কর্মচারী এখনো কোনো টাকা পাননি। আবার কারও হিসাবে অবসর সুবিধার টাকা গেলেও কল্যাণের টাকা যায়নি, কারও ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টোটা। তবে অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের দাবি আবেদনকারীদের মধ্যে যাদের সব ধরনের কাগজপত্র ঠিক রয়েছে, তাদের অনুকূলে প্রাপ্য সুবিধার একাংশ অর্থ পাঠানো হচ্ছে। ধীরে ধীরে সব টাকাই যাবে এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রাথমিকভাবে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে অবসর ও কল্যাণ সুবিধার জন্য যে অর্থ কেটে রাখা হয়েছিল, মূলত সেই অর্থই ছাড় করা হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে অবসর ও কল্যাণ সুবিধার অপেক্ষায় থাকা অনেক শিক্ষক-কর্মচারী প্রত্যাশিত পুরো অর্থ না পাওয়ায় হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন।

বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণ সুবিধার টাকা বিতরণ কার্যক্রম গত শনিবার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই দিন আবেদনকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠানো হয়। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনিবারেও অনেকের নম্বরে টাকা পাঠানো হয়েছে। মোবাইল ফোনে ব্যাংকের মেসেজ দেখে অনেকে টাকা প্রাপ্তির বিষয়ে নিশ্চিত হন।

তবে শিক্ষক-কর্মচারীদের অভিযোগ, একই সময়ে অর্থ ছাড়ের কথা জানানো হলেও সবার হিসাবে একসঙ্গে টাকা না যাওয়ায় অনেকে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। বিশেষ করে যারা কোনো অর্থই পাননি, তাদের মধ্যে প্রচণ্ড উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকের অবসরপরবর্তী জীবনযাপন, চিকিৎসা, পারিবারিক ব্যয় কিংবা ঋণ পরিশোধের সঙ্গে এই অর্থ জড়িত থাকায় টাকা ছাড়ে ধীরগতির কারণে আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। আবার যাদের হিসাবে আংশিক অর্থ জমা হয়েছে, তারাও বিষয়টি নিয়ে পরিষ্কার ধারণা পাচ্ছেন না। কেউ শুধু অবসর সুবিধার টাকা পেয়েছেন, আবার কেউ শুধু কল্যাণ সুবিধার অর্থ পেয়েছেন। অবশিষ্ট টাকা কবে এবং কীভাবে পাওয়া যাবে, তা নিয়ে ঘোরপাক খাচ্ছে প্রশ্ন।

রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেনে প্রবাসীকল্যাণ ভবনের অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টে গতকাল সোমবার ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়। নারায়ণগঞ্জ আদর্শ কলেজের এক শিক্ষক জানান, সরকারের ঘোষণা শুনে তিনিও অবসর ও কল্যাণের টাকা পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। তবে শনিবার সারা দিনেও তার ব্যাংক হিসাবে কোনো টাকা আসেনি। সুনামগঞ্জের মাদ্রাসা শিক্ষক আসলাম আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার জানিয়েছিল অবসর ও কল্যাণের টাকা দেওয়া হবে। অথচ আমার অ্যাকাউন্টে কেবল একটির টাকা এসেছে। বাকি টাকার বিষয়ে জানতে এখানে এসেছি।’

অবসর ও কল্যাণ বোর্ডের তথ্যকেন্দ্রের সামনে গতকাল দিনভর অনেক শিক্ষককে ভিড় জমাতে দেখা গেছে। তারা ভিন্ন ভিন্ন সমস্যা নিয়ে আসার কথা জানান। কারও অ্যাকাউন্টে কোনো টাকাই আসেনি, কারও অবসর কিংবা কল্যাণের টাকা এসেছে। বিভ্রান্তিকর এ অবস্থার কারণ জানতে শিক্ষকদের অনেকে ঢাকায় এসেছেন।

তথ্যকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা জানান, রবি ও সোমবার অনেক শিক্ষক-কর্মচারী তথ্যকেন্দ্রে ভিড় জমান। এই চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। শিক্ষক-কর্মচারীদের আশ্বস্ত করে কর্মকর্তারা বলেন, টাকা না পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। আবেদনকারীদের কাগজপত্র ও প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। যাচাই শেষে যাদের কাগজপত্র সঠিক পাওয়া যাবে, পর্যায়ক্রমে তাদের টাকা পাঠানো হবে।

অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্ট সূত্রে জানা যায়, প্রাথমিকভাবে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে অবসর ৬ শতাংশ ও কল্যাণের ৪ শতাংশ মোট ১০ শতাংশ কেটে রাখা টাকা দেওয়া হচ্ছে। অনেক শিক্ষক এলাকার দোকান থেকে আবেদন করেছেন। আবার অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, একই মোবাইল নম্বর দিয়ে একাধিক ব্যক্তি আবেদন করেছেন। ফলে তাদের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো যাচ্ছে না। তাদের তথ্য সংগ্রহ করে সংশোধনের পর টাকা পাঠানো হবে। অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্ট কর্মকর্তারা জানান, একবার যার অ্যাকাউন্টে টাকা গেছে তার সব তথ্য সঠিক আছে এবং তিনি এ প্রক্রিয়ার ভেতরে ঢুকে গেছেন। পর্যায়ক্রমে যখনই বাকি টাকা দেওয়া হবে, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার অ্যাকাউন্টে চলে যাবে।

জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলার থুপসাড়া সেলিমিয়া দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক নাজমুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেসরকারি শিক্ষকের বেতন-ভাতা থেকে অবসর বোর্ডের অনুকূলে ৬ শতাংশ এবং কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য ৪ শতাংশ কেটে রাখা হয়। তবে এই টাকা থেকে ঠিক কত টাকা জমা হয়েছে তা জানতে সুনির্দিষ্ট ডেটাবেজ নেই। ফলে একজন শিক্ষক জানতে পারছেন না তার প্রতিটি খাতে মোট কত টাকা জমা আছে।’

ভুক্তভোগী শিক্ষক-কর্মচারীরা বলছেন, কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের কারণে সবার টাকা একসঙ্গে দেওয়া সম্ভব না হলে আগে থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট করে জানানো উচিত ছিল। তা না করায় অনেকেই ব্যাংক হিসাবে টাকা না আসায় বিষয়টিকে নতুন কোনো জটিলতা হিসেবে দেখছেন। কার কত টাকা পাওনা, কত টাকা ইতিমধ্যে দেওয়া হয়েছে এবং কত বাকি রয়েছে এসব তথ্য পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার দাবিও জানান তারা। একই সঙ্গে তারা বলছেন, যাদের কাগজপত্রে কোনো সমস্যা নেই, তাদের দ্রুত অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা করলে দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তা দূর হবে।

চলতি সপ্তাহে যাচাই-বাছাই শেষে অবশিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীদের অর্থ পাঠানো হলে সমস্যার অনেকটা সমাধান হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। অবসর সুবিধা বোর্ডের সচিব মো. মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সব শিক্ষক-কর্মচারী যাতে নিজেদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পেতে পারেন আমরা সে চেষ্টা করছি। যাদের সব কাগজপত্র ঠিক আছে, তাদের টাকা পাঠানো হচ্ছে। আবার কাগজপত্র সংশোধন করে আনা হলে আমরা তাৎক্ষণিক সমাধান করে দিচ্ছি। আমাদের অনেক অবসর ও কল্যাণভোগী সচেতনতার অভাবে আবেদনের সময় মোবাইল নম্বর কিংবা অ্যাকাউন্ট নম্বর ভুল দিয়েছেন। অনেকের নামের সঙ্গে এনআইডি মিলছে না। একবার ভুল নম্বরে টাকা চলে গেলে ঝামেলা হতে পারে বলে আমরা বেশি সচেতনতার সঙ্গে কাজ করছি।’