শ্যামল মেয়েটির মুখে ভুবন ভোলানো হাসি। আর পরনে কালো পাড়ের সাদা শাড়ি। রুপার দানার মতো তার দাঁত। দাঁতগুলোর ফাঁকে ফাঁকে পানের কালো ছোপ। নাকের ছায়ায় নাকফুলটা যেন হাসি দিয়ে আছে বোতাম ফুলের মতো। হাসির ভাঁজে লেগে আছে রোদের নরম ছায়া। গলায় তিন লহরের রুপার শিকলি। গায়ের রঙের সঙ্গে শিকলিটার বেশ কন্ট্রাস্ট। ভেজা চুল। চুলের পানিতে ভিজে গেছে তার মলিন শাড়ি। ষাটের দশকের শুরুতে ব্লাউজবিহীন মেয়েটির শরীরের কর্মছাপ আর নির্মল হাসিটা ক্যামেরায় ধরলেন সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকার আলোকচিত্রশিল্পী সাইদা খানম। বেগম-এ ছাপা হলো ছবিটা। আর তাতেই চারদিকে হইচই বেঁধে গেল।
সাইদা খানমের বয়স তখন ২৫। তিনি তখন থাকতেন তার মেঝ বোন অধ্যাপিকা হামিদা খানমের বাসায়। বকশীবাজার এলাকার ১০ নম্বর জয়নাগ রোডে ছিল তাদের বাসা। মেয়েটি তাদের বাসায় গৃহসহায়ক হিসেবে কাজ করত। আর থাকত পাশের একটি বস্তিতে। বেগম পত্রিকায় মেয়েটির ছবি ছাপা হওয়ার খবর এ-বাড়ি, ও-বাড়ি হয়ে পুরো মহল্লায় ছড়িয়ে পড়ে। মহল্লার লোকজন এসে সাইদা খানমের বাড়ির সামনে এসে বিক্ষোভ শুরু করে। বিক্ষোভকারীদের কথা ‘ক্যামেরাওয়ালা মেয়েটির কত বড় সাহস! নিজে মেয়ে হয়ে কী করে আরেকটি মেয়েকে বে-আব্রু করে ছবি তুলে!’
সাইদা খানমের ভগ্নিপতি এএফ সালাহউদ্দীন আহমদ [পরবর্তী সময়ে জাতীয় অধ্যাপক] তখন জগন্নাথ কলেজে ইতিহাসের শিক্ষক। শিক্ষিত, মার্জিত ও বিনয়ী মানুষ হিসেবে মহল্লার লোকজন তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে। তিনি দেখলেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাসা থেকে বের হয়ে তিনি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু লোকজন খুবই ক্ষুব্ধ। তারা বলতে শুরু করল ‘এই অপরাধের একটা বিহিত হওয়া দরকার।’ সব শুনে তিনি শান্তভাবে বললেন, ‘যার ছবি ছাপা হয়েছে, সে আমাদের বাসারই মেয়ে এবং ছবিটি তার সম্মতিতেই পত্রিকা অফিসে পাঠানো হয়েছে।’ সালাহউদ্দীন আহমদের কথায় আশ^স্ত হয়ে সেদিন তারা ঘরে ফিরে যায়।
কেন তিনি ছবিটা তুলেছিলেন সেই গল্প কোনো এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন সাইদা খানম। একদিন সকালে তিনি দেখেন, তাদের বাসার মেয়েটি কাপড় শুকাতে ছাদে যাচ্ছে। একটু আগে সে গোসল সেরেছে। চুলে জমা পানির ফোঁটা লেগে আছে মুখে-শরীরে। তার গায়ে ব্লাউজ নেই। ওই সময় কেবল অবস্থাপন্ন পরিবারের মেয়েরাই শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজ পরত। দরিদ্র মেয়েদের পক্ষে ব্লাউজ পরা সম্ভব ছিল না। মেয়েটিকে দেখে তখন সাইদা খানমের মনে হয়, এটাই বাংলার নারীদের সংগ্রামের চিরন্তন রূপ। তিনি তার রোলিকর্ড ক্যামেরাটা নিয়ে ছাদে গেলেন। ততক্ষণে মেয়েটির ভেজা শরীর শুকিয়ে গেছে। তিনি মেয়েটিকে নিচ থেকে পানি আনতে বললেন। এক বালতি পানি নিয়ে মেয়েটি ছাদে এলো। গায়ে পানি ছিটিয়ে দিতেই মেয়েটি হাসতে শুরু করল। আর তখনই সাইদা খানমের ক্যামেরা চঞ্চল হয়ে উঠল। ছবিটা ছাপার কারণে যে এত বিড়ম্বনায় পড়তে হবে, তা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি তিনি।
এই গল্প শোনার পর মেয়েটির নাম জানতে ইচ্ছে হলো। সাইদা খানমের সেজ বোন মমতাজ হাসানের কন্যা ডা. সারা ফাতিমার কাছে মেয়েটির নাম জানতে চাইলাম। তিনি কিছু বলতে পারলেন না। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পাঠক সমাবেশ থেকে আমার লেখা একজন সাইদা খানম প্রকাশিত হয়। মার্চ মাসে বইটা দিতে গেলাম মমতাজ হাসানের বনানীর বাসায়। গিয়ে দেখি বড় ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটা তার বাসার দেয়ালে টাঙানো। ছবিটি দেখিয়ে তার কাছে মেয়েটির পরিচয় জানতে চাইলাম। বহু চেষ্টা করেও তিনি মেয়েটির নাম স্মরণ করতে পারলেন না।
সাক্ষাৎকারে সাইদা খানম বলেছিলেন ‘১৯৬০ সালে বেগম-এর প্রচ্ছদে ছবিটি ছাপা হয়।’ সেই প্রচ্ছদচিত্রটি নিজের চোখে দেখতে যাই বাংলা একাডেমিতে। একাডেমির পত্রিকা আর্কাইভে বসে ওই বছরের বেগম এর সব সংখ্যা দেখি। কিন্তু কোনো সংখ্যার প্রচ্ছদেই ছবিটি পাওয়া গেল না! কয়েক দিন পর বেগম-এর ঈদ সংখ্যা দেখছিলাম। ১৩৬৭ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাসে, বেগম-এর ঈদ সংখার ভেতরের পৃষ্ঠায় পাওয়া গেল ছবিটি। ইংরেজি বর্ষের হিসেবে হয় ১৯৬১ সালের মার্চ মাস। ছবিটির ক্যাপশনে লেখা ‘হৃদয় আজি মোর কেমনে গেল খুলি/জগৎ আসি সেথা করিছে কোলাকুলি রবীন্দ্রনাথ, ফটো : সাইদা খানম।’