নাফ নদের ওপারে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের জের ধরে কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূলে সৃষ্টি হয়েছে এক নজিরবিহীন ‘জিম্মি’ বাণিজ্যের। বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদে মাছ ধরতে যাওয়া বাংলাদেশি ট্রলার ও জেলেদের অস্ত্রের মুখে ধরে নিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ)। তাদের যোগসাজশে টেকনাফে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী মধ্যস্থতাকারী সিন্ডিকেট। এরা ট্রলার ও জেলেদের সুরক্ষার নামে ‘চুক্তি’ বা চাঁদা হিসেবে ট্রলার মালিকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, চক্রের নেতৃত্বে রয়েছে সালেহ আহমদ ও আলীর জোহার নামের দুই ব্যক্তি। সালেহ আহমদ টেকনাফ পৌরসভা খায়ুকখালী খাল ঘাটের বোট মালিক সমবায় সমিতির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। তার বাড়ি হ্নীলা ইউনিয়নের আলীখালী এলাকায়। আলীর জোহার টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ জালিয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই ‘সালেহ আহমদ ও আলীর জোহার’ চক্র চুক্তির নামে জেলে ও বোট মালিকদের কাছ থেকে আদায় করা বিপুল অঙ্কের অর্থ সীমান্ত গলিয়ে সরাসরি পৌঁছে দিচ্ছে আরাকান আর্মির কাছে। কেবল তাই নয়, তারা নিরীহ বোট মালিকদের কাছে চাঁদা দাবি করছে। না পেলে আরাকান আর্মি দিয়ে বোট ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে।
স্থানীয় মৎস্যজীবী ও ট্রলার মালিকদের সূত্রে জানা গেছে, টেকনাফ উপকূলে এখন এক ভীতিরাজ্য কায়েম হয়েছে। সিন্ডিকেটের দাবি করা মোটা অঙ্কের টাকা দিতে রাজি হলে আরাকান আর্মির হেফাজত থেকে ট্রলারসহ মাঝিমাল্লা ও অপহৃত রোহিঙ্গা জেলেদের ছাড়িয়ে আনা হচ্ছে। কিন্তু যেসব সাধারণ ট্রলার মালিক এই কথিত ‘চুক্তিতে’ রাজি হয় না, তাদের ওপর নেমে আসছে চরম বিপত্তি। অভিযোগ রয়েছে, চাঁদা না দেওয়া ট্রলারগুলোকে টার্গেট করে আরাকান আর্মির কাছে ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে এই সিন্ডিকেট।
উপকূলের সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা জানান, যারা মিয়ানমার থেকে অবৈধ উপায়ে চিংড়িসহ বিভিন্ন মূল্যবান প্রজাতির মাছ নিয়ে আসেন, তাদের সঙ্গে ওপারের একটা সুনির্দিষ্ট যোগাযোগ বা ‘লাইন’ রয়েছে। এই বড় ব্যবসায়ীদের পক্ষে লাখ লাখ টাকার চাঁদা দেওয়া সম্ভব হলেও, কপাল পুড়েছে সাধারণ মৎস্যজীবীদের। যেসব ট্রলার মালিকের ওপারে কোনো যোগাযোগ নেই এবং যারা সম্পূর্ণ দেশীয় জলসীমায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন, তারা এখন চরম অসহায়।
স্থানীয় একাধিক সূত্রমতে, বর্তমানে টেকনাফ উপকূলে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০টি ট্রলারের মালিক এই চক্রের কারণে ব্যবসা বন্ধ করে বা ট্রলার হারিয়ে নীরবে কাঁদছেন। সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের প্রতিবাদ করলেই উল্টো বিভিন্ন দিক থেকে বড় ধরনের আর্থিক ও শারীরিক ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ফলে জানমালের ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বোট মালিক বলেন, ‘আমরা সাগরে স্বাধীনভাবে মাছ ধরতে পারছি না। ওপারে আরাকান আর্মি যেমন আমাদের ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য ওঁৎপেতে থাকে, এপারে স্থানীয় দালালরা তেমনি আমাদের রক্ত চুষে খাচ্ছে। চুক্তির নামে যে টাকা চাওয়া হচ্ছে, তা দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের মতো ছোট নৌকার মালিকদের নেই। প্রশাসন যদি এখনই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়, তবে আমাদের পরিবার নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে।’
অভিযুক্ত সালে আহমদ বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। সাগরে বা নাফ নদে জেলেদের নিরাপত্তার বিষয়ে আমাদের কোনো চুক্তি বা অর্থ লেনদেনের সম্পর্ক নেই। স্থানীয় একটি মহল ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে আমাদের সুনাম ক্ষুণœ করতে এই অপপ্রচার চালাচ্ছে।’
টেকনাফ উপজেলা জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি তৈয়ুব বলেন, ‘আমরা প্রতিনিয়ত জেলে অপহরণের খবর পাচ্ছি। তবে এর পেছনে যদি স্থানীয় কোনো সিন্ডিকেট কাজ করে এবং আরাকান আর্মিকে টাকা পাচার করে, তবে তা দেশের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। এ বিষয়ে কোস্ট গার্ড ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নজরদারির অনুরোধ জানিয়েছি।’
এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, ‘সীমান্তে জেলে আটক বা অপহরণের বিষয়ে বিজিবি ও কোস্ট গার্ড তৎপর রয়েছে। তবে এপারে কোনো চক্র যদি জেলেদের জিম্মি করে অর্থ আদায় বা ওপারে টাকা পাঠানোর মতো রাষ্ট্রবিরোধী কাজে লিপ্ত থাকে, তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
নাফ নদীকেন্দ্রিক টেকনাফের জেলেঘাটসহ উপকূলীয় এলাকার সাধারণ জেলেরা এই চাঁদাবাজি, জিম্মি দশা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের হাত থেকে মুক্তি পেতে কোস্ট গার্ড, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জরুরি ও কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।