সিজিএস গোলটেবিল সংলাপে বক্তারা

অন্তর্বর্তী সরকার কয়েকজন তরুণকে ক্ষমতায়ন করলেও বৃহত্তর অংশকে বাইরে রেখেছে

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) নেদারল্যান্ডস রাজ্যের দূতাবাসের সহযোগিতায় বৃহস্পতিবার (১৮ আগস্ট) সিরডাপ (সেন্টার অফ ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভেলপমেন্ট ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক) মিলনায়তন, ঢাকা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব: রাজনীতিতে নারী ও তরুণ’ শীর্ষক গোলটেবিল সংলাপের আয়োজন করে। এ সংলাপে জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষাবিদ, অধিকারকর্মী, আইনজীবী, বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণে বিদ্যমান বাধা-বিপত্তি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র গড়ে তোলার সম্ভাব্য পথ বিষয়ে আলোচনা করেন।

সংলাপটির সভাপতিত্ব করেন সিজিএস-এর প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেনঃ প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এবং গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি-এর প্রতিমন্ত্রী, নুরুল হক নুর; সেন্টার ফর গভারনেন্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর নির্বাহী পরিচালক, পারভেজ করিম আব্বাসী; গণফোরাম-এর সভাপতি, সুব্রত চৌধুরী; জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর সাধারণ সম্পাদক, নাজমুল হক প্রধান; জাতীয় পার্টি-এর মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী; বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-এর সাধারণ সম্পাদক, আব্দুল্লাহ আল কাফি রতন; বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর সহকারী সাধারণ সম্পাদক, রাজেকুজ্জামান রতন; জি-৯-এর সাধারণ সম্পাদক, ডা. সাখাওয়াত হোসাইন সায়ান্থ; গণসংহতি আন্দোলন-এর রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য ও বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি-এর সভাপ্রধান, তাসলিমা আখতার; এবি পার্টি-এর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রধান ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, নাসরীন সুলতানা (মিলি); জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সংগঠক, জুবাইরুল হাসান আরিফ; দ্য ইরাবতী-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি, মো. মুক্তাদির রশিদ রোমিও; ট্রান্স ফেমিনিস্ট ও জেন্ডার এবং সেক্সুয়াল রাইটস অ্যাকটিভিস্ট, হো চি মিন ইসলাম; বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রী সংস্থা-এর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাহিত্য সাংস্কৃতিক বিভাগের প্রধান, রাইসা রিফাত জুইন; বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন-এর সাংগঠনিক সম্পাদক, আরমানুল হক; বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন-এর সমাজকল্যাণ ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক, তিলোত্তমা ইতি; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর নির্বাহী সদস্য, হেমা চাকমা; ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর সভাপতি, সাইফ মোঃ আলাউদ্দিন; বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, মাস্টারদা সূর্য সেন হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর সদস্যসচিব, আবিদুর রহমান মিশু; বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা-এর সদস্য, ইসরাত জাহান ইমু। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিজিএস-এর প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান। 

অনুষ্ঠানের শুরুতে জিল্লুর রহমান বলেন, প্রকৃত অন্তর্ভুক্তির জন্য শুধু অংশগ্রহণ নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সম্পদ ব্যবহারে কার্যকর ক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনের সময় সামনে রাখা হলেও ক্ষমতার ক্ষেত্রে নারীদের যথাযথ জায়গা দেওয়া হয় না।

নুরুল হক নুর বলেন, জুলাই আন্দোলনে নারী ও তরুণদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও পরে তাদের যথাযথ স্বীকৃতি ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার কয়েকজন তরুণকে ক্ষমতায়ন করলেও বৃহত্তর অংশকে বাইরে রেখেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার মতে, ঐতিহাসিক পরিবর্তনের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল, কিন্তু তা যথাযথভাবে কাজে লাগানো যায়নি। তরুণরা ক্ষমতার অংশ না হয়ে শক্তিশালী চাপ-সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হিসেবে কাজ করলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ মানুষের অধিকার ও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ডকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রবাসী কর্মসংস্থানে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে নতুন দেশ ও খাত খোঁজা, শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান এবং জাপানসহ বিভিন্ন দেশে ঋণসহায়তা সম্প্রসারণে সরকার কাজ করছে বলেও তিনি জানান। একই সঙ্গে সাইবার আইন সংস্কার এবং নারীদের বিরুদ্ধে অবমাননাকর বক্তব্য ও উগ্র রাজনৈতিক আচরণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

নাজমুল হক প্রধান বলেন, তরুণদের ক্ষমতাকেন্দ্রিক করে তোলার পরিবর্তে তাদের দায়িত্বশীল নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নারীদের চরিত্রহনন ও বিদ্রূপের সংস্কৃতি বন্ধ করে ধর্মীয় ও সামাজিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তাদের মেধা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। 

সুব্রত চৌধুরী বলেন, রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের স্বার্থ রক্ষা। অতীতকে অস্বীকার না করে তরুণদের সামনে এগিয়ে নিতে হবে এবং প্রবীণদের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগাতে হবে।

ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, তরুণদের সংসদে পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব না থাকা রাজনৈতিক ব্যর্থতা। অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের সঙ্গে তাদের কাজের সুযোগ দিতে হবে। স্থানীয় সরকারে নারীর প্রতিনিধিত্ব থাকলেও কার্যকর ক্ষমতা ও বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।

ডা. সাখাওয়াত হোসাইন সায়ান্থ বলেন, ছাত্ররাজনীতির ঝুঁকি ও অর্থ-পেশিশক্তির প্রভাবে অনেক মেধাবী তরুণ রাজনীতি থেকে দূরে থাকছেন। নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়াতে রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন স্তরে তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি।

পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, দীর্ঘ সময় নারী নেতৃত্বে সরকার থাকলেও জাতীয় রাজনীতিতে নারীদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়নি। রুয়ান্ডার মতো দেশে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে সেই কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি ও তরুণদের কর্মসংস্থান এখনো দেখা যায়নি।

আব্দুল্লাহ আল কাফি রতন বলেন, বৈচিত্র্য ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অধিকার স্বীকার করে তরুণ ও নারীদের রাজনৈতিক নেতৃত্বে অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। জাতীয় সংসদে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের সুযোগ এবং রাজনৈতিক পদে বয়সসীমা নির্ধারণের বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। তরুণদের বাদ দিয়ে টেকসই রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব নয়।

রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, সমাজের বৈচিত্র্য স্বীকার করে সবার নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষা এবং তরুণ ও প্রবীণদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মানের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।

তাসলিমা আখতার বলেন, প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও তরুণদের সক্ষমতার সমন্বয়েই পরিবর্তন সম্ভব। তরুণদের সমাজ পরিবর্তনের শক্তি ধরে রাখতে হবে এবং দায়িত্ব পালনের জন্য অভিজ্ঞতাও প্রয়োজন।

নাসরীন সুলতানা (মিলি) বলেন, স্কুল কমিটি থেকে সংসদ পর্যন্ত নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ সীমিত। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণের পাশাপাশি পরিবেশ, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পরিকল্পিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

হো চি মিন ইসলাম বলেন, অন্তর্ভুক্তি মানে সবার সমান অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করা। অধিকার, পরিচয় ও পারস্পরিক সম্মানের স্বীকৃতি ছাড়া প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি সম্ভব নয়।

মো. মুক্তাদির রশিদ রোমিও বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আস্থার সংকট বড় সমস্যা। নারীদের সাইবার বুলিং প্রতিরোধ, তৃণমূলে নারী নেতৃত্ব বৃদ্ধি এবং তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তির সঙ্গে প্রবীণদের অভিজ্ঞতার সমন্বয় জরুরি।

হেমা চাকমা বলেন, আগস্ট-পরবর্তী সময়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা, পরিচয়ের স্বীকৃতিতে বৈষম্য ও সীমিত প্রতিনিধিত্বের কথা উল্লেখ করে তাঁদের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ দলের ভেতর থেকেই নিশ্চিত করতে হবে এবং নিরাপত্তার নামে স্বাধীনতা সংকুচিত করা যাবে না।

জুবাইরুল হাসান আরিফ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে নারী ও তরুণদের জন্য আরও জায়গা তৈরি করতে হবে। পেশিশক্তি ও পরিবারতন্ত্র কমিয়ে কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সাইফ মোঃ আলাউদ্দিন বলেন, তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্ল্যাটফর্মের ঘাটতি রয়েছে। নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে নিরাপদ পরিবেশ ও জবাবদিহিমূলক ডিজিটাল সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।

আবিদুর রহমান মিশু বলেন, রাজনৈতিক সংগঠনে নারীদের নেতৃত্বে আনার কাঠামো পরিবর্তন করতে হবে। সাইবার বুলিং ও হয়রানি তাদের অংশগ্রহণে বড় বাধা; সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

ইসরাত জাহান ইমু বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা থাকলেও কর্মক্ষেত্র ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়নি। পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো ও বুলিং এখনো বহাল, আর বিত্তশালী পরিবারের বাইরে তরুণদের সুযোগও সীমিত।

আরমানুল হক বলেন, আন্দোলনে নারীদের সামনে রাখা হলেও ক্ষমতার ক্ষেত্রে পিছিয়ে দেওয়া হয়। নারী, আদিবাসী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য দলীয় কাঠামোর মধ্যেই কার্যকর সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। 

রাইসা রিফাত জুইন বলেন, বয়সের কারণে তরুণদের অবমূল্যায়ন করা হয় এবং নারীদেরও তৃণমূল থেকে রাজনীতিতে উঠে আসার কার্যকর পথ নেই। অন্তর্ভুক্তি যেন শুধু সংখ্যায় সীমাবদ্ধ না থেকে অর্থবহ হয়।

তিলোত্তমা ইতি বলেন, নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে অনীহার কারণে তাদের মনোনয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বিশেষ করে প্রান্তিক নারী ও সংরক্ষিত আসনের প্রতিনিধিরা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারেন না।