বগুড়াতেও চালু হলো ‘মহিলা বাস সার্ভিস’

রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের পর এবার বগুড়াতেও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বিশেষ ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ চালু হয়েছে।

বগুড়ায় চালু হওয়া এই বিশেষ বাস সার্ভিস জেলা শহরের গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি নারী ক্ষমতায়নের নতুন বার্তা দিচ্ছে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দুটি রুটে চলবে গোলাপি রঙের এই বাস। একটি বাস চলবে শেরপুর উপজেলা শহর থেকে সদরের মাটিডালি পর্যন্ত এবং অন্যটি মোকামতলা থেকে বনানী পর্যন্ত। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নন-এসি বাস দুটির ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ২৩ পয়সা।

এই বাস সার্ভিসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—বাসের চালক, কন্ডাক্টর, সহকারী ও যাত্রী সবাই নারী।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকালে বিআরটিসির ট্রেনিং গ্রাউন্ড চত্বরে বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা ও আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যুক্ত হয় বগুড়া। উদ্বোধন শেষে বাসটি ডিপো থেকে ছেড়ে তিনমাথা রেলগেট এলাকার সরকারি আজিজুল হক কলেজের সামনে পর্যন্ত যায়। সেখান থেকে ঘুরে আবার ডিপোতে ফিরে উদ্বোধনী কার্যক্রম শেষ হয়। এ সময় বাসটির চালকের আসনে ছিলেন খাদিজাতুল কোবরা।

বগুড়ার বাস দুটির যাত্রা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা বলেন, ‘এটি কেবল ঢাকা, চট্টগ্রাম বা বগুড়ার বিষয় নয়; পর্যায়ক্রমে পুরো বাংলাদেশেই এই সেবা চালু হবে। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। তাঁদের নিরাপদ যাতায়াত ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে প্রতিশ্রুতি প্রধানমন্ত্রী দিয়েছিলেন, এটি তারই বাস্তবায়ন। একটি দেশকে এগিয়ে নিতে হলে নারী-পুরুষ সবাইকে সমানভাবে কাজ করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে কর্মক্ষেত্র কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যে বের হয়ে গণপরিবহনে ওঠা মানেই নারীদের জন্য এক ধরনের যুদ্ধ। সেই ভোগান্তির দৃশ্যপট বদলাতেই নতুন এই উদ্যোগ।’

বাসে ওঠার অনুভূতি জানাতে গিয়ে বগুড়ার নারী যাত্রী ও শিক্ষিকা মমতাজ বলেন, ‘আমরা গণপরিবহনে যখন পুরুষদের সঙ্গে যাতায়াত করি, তখন নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ এই বাস সার্ভিস চালুর ফলে আমরা কোনো রকম ভোগান্তি ছাড়াই নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারব। তবে বগুড়ার বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য দুটি বাস হয়তো কম হয়ে যাবে। আশা করি, সরকার ধীরে ধীরে বাসের সংখ্যা আরও বাড়াবে।’

আরেক শিক্ষার্থী তিথি সরকার বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই বাস মেয়েদের নিরাপত্তার জন্য অনেক বড় অবদান রাখবে। শিক্ষার্থীরা খুব কম খরচে যাতায়াত করতে পারবে।’

এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বগুড়া জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক নাজমা আক্তার কবি কাজী নজরুল ইসলামের পঙক্তি উদ্ধৃত করে বলেন, ‘কোনো কালে একা হয়নি কো জয়ী পুরুষের তরবারি, প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়েছে বিজয় লক্ষ্মী নারী।’

তিনি বলেন, ‘সকালে কর্মজীবী নারীদের কর্মস্থলে পৌঁছানোর জন্য যে যুদ্ধ করতে হতো, তা সত্যিই অনুধাবন করা হয়েছে। বগুড়ার অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীদের পক্ষ থেকে সরকারের এই মহতী উদ্যোগকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।’

নারী বাসচালক খাদিজাতুল কোবরা বলেন, ‘একটি বাসে মোট তিনজন নারী থাকবেন—ড্রাইভার, কন্ডাক্টর ও হেলপার। মহিলা বাস সার্ভিসের চালক হতে পেরে সত্যিই গর্বিত অনুভব করছি। অন্য নারীরাও যদি এই পেশায় আসতে চান, তাঁদের আসা উচিত।’

আরেক চালক তাসলিমা পারভীন সাথী বলেন, ‘মূলত নারীদের নিরাপত্তার জন্যই এই ব্যবস্থা। কারণ সাধারণ বাসে নারীদের যে হয়রানির শিকার হতে হয়, তা আমরাও অনুভব করেছি। এখানে নারী চালক ও স্টাফ থাকায় কোনো অসুবিধা হবে না।’

প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতার বিষয়ে বিআরটিসির মহিলা প্রশিক্ষক সুবর্ণা খাতুন জানান, বিআরএসপি প্রকল্পের মাধ্যমে সার্কুলার দিয়ে প্রায় ৫০০ জনের মধ্য থেকে বাছাই করে দক্ষ প্রশিক্ষক ও চালক তৈরি করা হয়েছে। বগুড়াতেও বাসের সংখ্যা বাড়ানো হলে সার্ভিস দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ও দক্ষ নারী চালক প্রস্তুত রয়েছে।

বাসগুলোর পরিচালনা পদ্ধতি ও স্থায়িত্ব নিয়ে বিআরটিসি বগুড়া বাস ডিপোর ম্যানেজার শাহিনুল ইসলাম বলেন, ‘আপাতত মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে শেরপুর-মাটিডালি এবং মোকামতলা-বনানী রুটে দুটি বাস দিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করেছি। চালক, কন্ডাক্টর ও হেলপার সবাই আমাদের স্থায়ী নারী কর্মী। পর্যায়ক্রমে চাহিদার ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় থেকে আরও বাস সরবরাহ করা হলে অন্যান্য রুটেও এই সার্ভিস চালু করা হবে।’

এদিকে সড়কে নামা এই গোলাপি বাস কেবল দুটি গাড়ি চলাচলের গল্প নয়; এটি বগুড়ার নারীদের নিরাপদ পথচলা, আত্মনির্ভরশীলতা ও সমঅধিকারের এক নতুন দিগন্ত—এমনটাই মনে করছেন জেলার সচেতন নাগরিকরা।