‘আগামী সোমবার থেকে ডায়েট শুরু!’ এমন ঘোষণা আমরা নিজের কাছেই কতবার দিয়েছি, তার ইয়ত্তা নেই। ওজন কমানো, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, হার্ট সুস্থ রাখা অথবা শুধু ফিট থাকার জন্য প্রতিদিনই বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ নতুন কোনো ডায়েট বেছে নিচ্ছেন। কেউ ভাত ছেড়ে দিচ্ছেন, কেউ রাতে রুটি খাচ্ছেন, কেউ সপ্তাহে একদিন ভেজিটেরিয়ান হয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে কিটো বা ইন্টার্মিটেন্ট-এর মতো নানা ডায়েট। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত ডায়েটের ভিড়ে আসলেই কোনটি সবচেয়ে ভালো?
পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বলছেন, এর সহজ কোনো উত্তর নেই। সব মানুষের শরীর, জীবনযাপন ও প্রয়োজন এক নয়। আপনার শরীর, আপনার উদ্দেশ্য এবং আপনার সহ্য ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে আপনার ডায়েট প্ল্যান হবে। অন্যেরা কী করল সেটা প্রাধান্য পাবে না। তবু এমন কিছু খাদ্যাভ্যাস আছে যেগুলো বছরের পর বছর গবেষণার পর এর কার্যকারিতার প্রমাণ পাওয়ার গেছে এবং বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়েছে। তেমন ৯টি ডায়েট নিয়ে আজকের আয়োজন :
শুরুর কথা
ডায়েটের কথা শুরু করার আগে কয়েকটি অপ্রচলিত শব্দের মানে বলে দিচ্ছি তাহলে বুঝতে সুবিধা হবে। ক. হোল গ্রেইন : পূর্ণ শস্য খাদ্যের মধ্যে পড়ে লাল চাল, আটা রুটি, ওটস ইত্যাদি। খ. রেড মিট : মূলত গরু বা খাসির মাংস। গ. প্রসেসড ফুড বা প্রক্রিয়াজাত খাবার : সসেজ, সালামি, ক্যান ফুড, প্যাকেটজাত যত খাবার যেমন চিপস, বিস্কুট, চানাচুর, ইনস্ট্যান্ট নুডুলস ইত্যাদি। ঘ. চর্বিহীন প্রোটিন : চামড়া ছাড়া মুরগির বুকের মাংস, চিংড়ি মাছ, কুকিং পনির, টফু, ডাল, শিমের বীচি ইত্যাদি।
মেডিটেরেনিয়ান ডায়েট : সুস্থ জীবনের
সোনালি সিঁড়ি
বিশ্বের প্রায় সব বড় স্বাস্থ্য সংস্থাই মেডিটেরেনিয়ান ডায়েটকে সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করে। গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের ঐতিহ্যবাহী খাবার থেকে গড়ে ওঠা এই খাদ্যতালিকায় থাকে প্রচুর শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, অলিভ অয়েল, বাদাম, পূর্ণ শস্য (হোল গ্রেইন) এবং মাছ। অন্যদিকে রেড মিট বা চর্বিযুক্ত মাংস, সরাসরি চিনি ও প্রসেসড খাবার বলতে গেলে থাকেই না। হৃদরোগ, স্ট্রোক ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে এই খাদ্যাভ্যাসের ইতিবাচক ভূমিকার প্রমাণ মিলেছে বহু গবেষণায়।
ড্যাশ ডায়েট : যাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে
তাদের জন্য প্রযোজ্য
ডায়েটারি এপ্রোচেস টু স্টপ হাইপারটেনশন সংক্ষেপে ড্যাশ ডায়েট। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকরা যে খাদ্য পরিকল্পনাটি সবচেয়ে বেশি পরামর্শ দেন, সেটিই ড্যাশ ডায়েট। কম লবণ, বেশি ফলমূল, শাকসবজি, কম চর্বিযুক্ত দুধ (ফ্যাট ফ্রি), পূর্ণ শস্য (হোল গ্রেইন) ও চর্বিহীন প্রোটিন এই হলো এর মূল ভিত্তি। শুধু উচ্চরক্তচাপ নয়, সামগ্রিক সুস্থতার জন্যও এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস হিসেবে পরিচিত।
কিটো ডায়েট : দ্রুত ওজন কমায়
সামাজিক মাধ্যমে সবচেয়ে আলোচিত ডায়েটগুলোর একটি হলো কিটোজেনিক বা কিটো ডায়েট। এতে শর্করা বা কর্বোহাইড্রেট খুব কম খাওয়া হয়, আর ফ্যাট তুলনামূলক বেশি খাওয়া হয়। ফলে শরীরে শক্তির জন্য গ্লুকোজের বদলে চর্বি পোড়াতে শুরু করে। অনেকের ওজন দ্রুত কমলেও দীর্ঘদিন এই নিয়ম মেনে চলা সহজ নয়। কারণ ভাত, রুটি, আলু, পাস্তা এমনকি অনেক ফলও এতে সীমিত রাখতে হয়। আর খেতে বলা হয় মাছ, মাংস, ডিম, ফুল ক্রিম দুধ, আভাকাডো, বাদাম, অলিভ অয়েল, মাখন, কম কার্বের সবজি যেমন ব্রকলি, ফুলকপি ইত্যাদি। মৌসুম এবং ভৌগোলিক অবস্থা শরীর ও খাবারের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য খুব জরুরি। একই খাবার বাংলাদেশের মানুষের ওপর যে প্রভাব ফেলবে নরওয়ের মানুষের ওপর সেই প্রভাব নাও ফেলতে পারে। খাবার নির্বাচনে তৃপ্তি ব্যাপারটাকেও কিছুটা মাথায় রাখতে হবে।
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং : কী খাবেন নয়,
কখন খাবেন
এই খাদ্যপদ্ধতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি খাবারের ধরন নয়, সময়ের ওপর গুরুত্ব দেয়। কেউ দিনে আট ঘণ্টার মধ্যে সব খাবার খেয়ে নেন, আর বাকি ১৬ ঘণ্টা উপোস করেন। একদম যে উপোস করেন তা নয় এ সময় পানি খেতে পারেন, গ্রিন-টি বা সহজপাচ্য লো-ক্যালরির খাবার খেতে পারেন। আবার কেউ সপ্তাহে দুদিন খুব কম ক্যালোরি গ্রহণ করেন, বাকি ৫ দিন স্বাভাবিক। অনেকের ক্ষেত্রে এটি ওজন কমাতে সহায়ক হলেও সবার জন্য এটি উপযোগী নয়। যে ডায়েট আপনি দীর্ঘদিন রাখতে পারবেন না, সেটা হিতে বিপরীত হয়ে যেতে পারে হয়তো ক্ষণিকের উৎসাহে কষ্ট করে পাঁচ কেজি ওজন কমালেন কিন্তু ধরে রাখতে না পেরে যখন আবার আগের মতো খেতে শুরু করলেন তখন দশ কেজি ওজন বেড়ে গেল।
প্ল্যান্ট-বেইজড ও ভেগান ডায়েট : স্বাস্থ্য
আর পরিবেশ দুই কূলই রক্ষা করে
বিশ্বজুড়ে উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যাভ্যাসের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, বাদাম, বীজ ও হোল গ্রেইন এখানে প্রধান খাবার। ভেগানরা মাছ-মাংস জাতীয় সব প্রাণিজ খাবার এড়িয়ে চলেন, আর নিরামিষভোজীরা অনেক সময় দুধ বা ডিম গ্রহণ করেন। এই খাদ্যাভ্যাস শুধু শরীরের জন্য নয়, পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিখ্যাত আল্ট্রা ম্যারাথন রানার রিচ রোল, যাকে দুনিয়ার অন্যতম সেরা ফিট মানুষ বলে ধরা হয়, তার ‘ফাইন্ডিং আল্ট্রা’ বইয়ে তিনি কী করে নন-ভেজ খাবার ছেড়ে দিয়ে শুধু উদ্ভিদভিত্তিক খাবার খেয়ে সেরা শারীরিক সামর্থ্য অর্জন করেছেন সে বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন।
প্যালিও ডায়েট : হাজার বছর আগে ফিরে
যাওয়া
প্যালিও ডায়েটের ধারণা বেশ অভিনব। মানুষের প্রাগৈতিহাসিক পূর্বপুরুষরা যা খেতেন, সেই ধরনের খাবারই এখানে প্রাধান্য পায়। মাছ, মাংস, ডিম, ফল, শাকসবজি ও বাদাম খাওয়া যায়। তবে বাদ পড়ে যায় চাল, গম, দুগ্ধজাত খাবার এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য।
ফ্লেক্সিটারিয়ান : কঠিন ডায়েট নয়, ভারসাম্যই আসল
সবাই যে নিরামিষভোজী হতে পারবেন, তা নয়। সেই বাস্তবতা থেকেই এসেছে ফ্লেক্সিটারিয়ান ডায়েট। এতে বেশির ভাগ সময় উদ্ভিদভিত্তিক খাবার খাওয়া হয়, তবে ইচ্ছা করলে মাঝেমধ্যে মাছ বা মাংসও খাওয়া যায়। কঠোর নিয়ম না থাকায় অনেকের কাছেই এটি দীর্ঘমেয়াদে অনুসরণ করা সহজ।
জাপানি খাদ্যাভ্যাস : দীর্ঘায়ুর এক রহস্য
জাপান বিশ্বের দীর্ঘায়ু দেশগুলোর অন্যতম। তাদের ঐতিহ্যবাহী খাবারে থাকে মাছ, ভাত, সয়াবিনজাত খাবার, সামুদ্রিক শৈবাল, শাকসবজি এবং গ্রিন-টি। পরিমিত খাবার খাওয়ার সংস্কৃতিও তাদের সুস্বাস্থ্যের একটি বড় কারণ বলে মনে করা হয়।
নর্ডিক ডায়েট : উত্তরের দেশগুলোর স্বাস্থ্যচেতনা
সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক ও ফিনল্যান্ডের মানুষের খাদ্যাভ্যাস নিয়েও আগ্রহ বাড়ছে। এই ডায়েটে গুরুত্ব পায় হোল গ্রেইন বা পূর্ণ শস্য, বেরিজাতীয় ফল, মূলজাতীয় সবজি, ডাল, তৈলাক্ত মাছ এবং ক্যানোলা তেল। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।
খাদ্যাভ্যাস শুধু ক্ষুধা মেটায় না, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি দেশের সংস্কৃতি, জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যচর্চা। একেক দেশের মানুষের খাবারের টেবিল যেন তাদের জীবনযাপনেরই প্রতিচ্ছবি। কোথাও জলপাই তেল ও শস্য, কোথাও মাছ-ভাত, আবার কোথাও নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়াই ডায়েটের মূলকথা। ওজন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যবস্তু এক হলেও পথ আলাদা। এত ডায়েটের ভিড়ে কোনটি আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো জানাও জরুরি
ডায়েট নয়
অভ্যাসই আসল
অভ্যাস, অভ্যাস, অভ্যাস এর কোনো বিকল্প নেই। এক দিন, এক মাস বা এক বছর নয় সারা জীবন সঙ্গে রাখতে হবে, লাইফ স্টাইল বানিয়ে ফেলতে হবে। দুনিয়ায় ডায়েটের তালিকা হয়তো আরও দীর্ঘ হবে। প্রতি বছরই নতুন কোনো ডায়েট জনপ্রিয় হবে, আবার কিছু হারিয়েও যাবে। কিন্তু একটি বিষয় বদলাবে না সুস্থ থাকার জন্য দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাসের কোনো শর্টকাট নেই। যে খাদ্যাভ্যাসে প্রতিদিন পর্যাপ্ত শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, পূর্ণ শস্য, স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং পরিমিত পরিমাণে প্রোটিন থাকে, সেটিই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে উপকারী। সেই সঙ্গে প্রয়োজন নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ। মনে রাখতে হবে, ভালো ডায়েট মানে কয়েক সপ্তাহের কষ্ট নয়; বরং এমন একটি খাদ্যাভ্যাস, যা আনন্দের সঙ্গে বছরের পর বছর অনুসরণ করা যায়। কারণ সুস্থ জীবন শুরু হয় কোনো ‘ফ্যাশনেবল ডায়েট’ দিয়ে নয়, শুরু হয় প্রতিদিনের ছোট ছোট সচেতন সিদ্ধান্ত থেকে।