জামায়াতের মূল্যায়ন

আইনশৃঙ্খলা জ্বালানি ব্যাংকিংসহ ৮ খাতে সরকার ব্যর্থ

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাসে জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো সুস্পষ্ট সাফল্য দেখা যায়নি বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির অভিযোগ, জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে সরকারের ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

দলটির অভিযোগ, গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনীহা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ ও ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরাতে না পারা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে না পারাসহ গুরুত্বপূর্ণ আট ক্ষেত্রে সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।  তা ছাড়া গুম প্রতিরোধ আইনে উদ্বেগজনক ফাঁক রাখা, স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দূরে রাখা, পররাষ্ট্রনীতিতে কৌশলগত দুর্বলতা এবং সংস্কারসহ মানুষের জন্য কল্যাণকর খাতে সরকার কাক্সিক্ষত অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর মগবাজারে আল-ফালাহ মিলনায়তনে ‘বিএনপি সরকারের ৬ মাসের মূল্যায়ন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব কথা বলেন। এ সময় জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, রফিকুল ইসলাম খান এমপি, হামিদুর রহমান আজাদসহ শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ, নীতিগত দ্বিধা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং বাস্তব ফলের ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে জুলাই জাতীয় সনদভিত্তিক সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে জনগণ স্পষ্ট রায় দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত গেজেট অনুযায়ী, ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৭২ লাখ ২৫ হাজার ৯৮০টি এবং ‘না’ ভোট পড়েছে দুই কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার ২৩১টি। অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোটের ব্যবধান আড়াই কোটিরও বেশি।

তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা ছিল এবং পরিষদকে প্রথম অধিবেশন থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সাংবিধানিক সংস্কার সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সংসদ সদস্যরা শপথ নিলেও সংস্কার পরিষদের কাঠামো কার্যকর হয়নি। সরকারপরবর্তী সময়ে সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের বিকল্প পদ্ধতির দিকে এগিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

জুলাই সনদের ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াতের এ নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির নেতৃত্ব, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার এবং শক্তিশালী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলো থাকলেও গত ছয় মাসে এগুলোর কোনো একটিরও বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।

জ্বালানি সংকট নিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ করা যাচ্ছে ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের কাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে। এর প্রভাব শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজি স্টেশনসহ বিভিন্ন খাতে পড়ছে।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিল্পকারখানায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম উৎপাদন হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, প্রায় ২০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং ২০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি নির্ভরতার দুর্বলতাও সামনে এনেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, মেধা, দক্ষতা ও পেশাদারত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও প্রথম ছয় মাসেই প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের অভিযোগ জোরালো হয়েছে। পদোন্নতি, পদায়ন, ওএসডি ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে দলঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।

তার দাবি, ১১টি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার শীর্ষ পদে বিএনপি নেতাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনসহ ১২টি প্রতিষ্ঠানে বিএনপি নেতাকর্মীদের নিয়োগের তথ্যও এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

 আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের সমালোচনা করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার আইনশৃঙ্খলাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বললেও সরকারি ও স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের তথ্য উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ তৈরি করছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, মার্চ-এপ্রিল সময়ে ৬০৫টি হত্যা, ২৯৪টি ছিনতাই, ১৯৬টি অপহরণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩ হাজার ৪৯৬টি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে দেশজুড়ে ৬৯ থেকে ৮০টি মব সহিংসতার ঘটনায় ৩১ থেকে ৪২ জন নিহত হওয়ার তথ্যও তুলে ধরেন তিনি।

পুলিশ সদর দপ্তরের আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, মার্চ থেকে মে এই তিন মাসে ৯১৫টি হত্যা মামলা, ৪৬১টি ডাকাতি, ২৮৬টি অপহরণ, ৩ হাজার ২৭৭টি চুরি এবং ৫ হাজার ৪৪৮টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। তার দাবি, শুধু মার্চ-মে ২০২৬ সময়ে ৯১৫টি হত্যা মামলা নিবন্ধিত হয়েছে, যেখানে পুরো ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭৬৭ এবং ২০২৪ সালে ৭৯৪টি।

দ্রব্যমূল্য নিয়ে দলটির মূল্যায়নে বলা হয়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে জুন ২০২৬-এ সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। আগের বছরের জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও সামগ্রিক মূল্যস্তর এখনো বেশি। ফলে খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহনসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের চাপ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর বাড়ছে এবং মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে।

ব্যাংকিং খাত নিয়েও সরকারকে ব্যর্থ বলে মন্তব্য করেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের বরাত দিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা।

তার অভিযোগ, সরকারের প্রথম ছয় মাসেও খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকের তারল্য সংকট, আমানতকারীদের আস্থাহীনতা এবং উচ্চ সুদের চাপ থেকে বের হওয়ার দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দুর্বল এবং মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি খোলা আগের বছরের তুলনায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে। এটি নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য উদ্বেগজনক।

পররাষ্ট্রনীতিতেও কৌশলগত দুর্বলতা রয়েছে বলে দাবি করেন জামায়াতের এ নেতা। তিনি বলেন, সরকার দায়িত্বগ্রহণের পর ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’কে পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন হিসেবে ঘোষণা করলেও ছয় মাসে এটিকে সুস্পষ্ট ও সমন্বিত পররাষ্ট্রনীতি কাঠামোতে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়নি। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ অমীমাংসিত বিভিন্ন বিষয়েও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার রোহিঙ্গাকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করা হলেও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অজুহাতে প্রত্যাবাসন এখনো শুরু হয়নি। একই সময়ে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ঘাটতি বাংলাদেশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

গুম প্রতিরোধ আইন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গুমের মতো ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি যেন আর না ঘটে, এটি জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম মৌলিক প্রত্যাশা। সরকার ‘প্রিভেনশন অ্যান্ড রেমেডি অব এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স অ্যাক্ট, ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিলেও খসড়ার কয়েকটি বিধান নিয়ে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা আনুষ্ঠানিক উদ্বেগ জানিয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে সরকারের প্রতি আট দফা আহ্বান জানায় জামায়াতে ইসলামী। এর মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সময়বদ্ধ রোডম্যাপ প্রকাশ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি নিশ্চিত করা।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপি সরকার প্রথম ছয় মাসে জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো শক্তিশালী অর্জন জাতির সামনে তুলে ধরতে পারেনি। জনগণ সরকারকে সমস্যার ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য নয়, সমাধান দেওয়ার জন্য দায়িত্ব দিয়েছে। আগামী সময়ে সরকার যদি প্রথম ছয় মাসের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখাতে না পারে, তাহলে জনগণের হতাশা ও আস্থার সংকট আরও গভীর হবে।