রাজস্ব সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী

নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়নের পথে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে

রাজস্ব খাতে সংস্কারের মাধ্যমে দেশ এখন আর ঋণনির্ভর নয়, নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল মঙ্গলবার রাজস্ব সম্মেলন ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন। বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) যৌথ উদ্যোগে রাজস্ব সম্মেলন হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ সম্মেলনের উদ্বোধন করেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আপনার নেতৃত্বেই আমরা সাহসী সংস্কার বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নিয়েছি। এটা আপনার কমিটমেন্টের কারণে সম্ভব হয়েছে। আপনি যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছেন তার অন্যতম স্তম্ভ হবে একটি আধুনিক রাজস্বব্যবস্থা।’

মন্ত্রী বলেন, সম্মেলন থেকে আমরা এ বার্তা নিয়ে যেতে চাই যে, বাংলাদেশ এখন আর ঋণের ওপর নির্ভরশীল দেশ থাকবে না। এটি এখন তার নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে ইনশাআল্লাহ।

রাজস্ব আহরণ সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের ৬ লাখ ৪ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই লক্ষ্য অর্জনের মধ্য দিয়ে আমরা প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব ইনশাআল্লাহ। ২০২৯ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশের সারিতে যাওয়ার যে চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে রয়েছে সেটা অতিক্রম করতে পারব এবং ২০৩৪ সালে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি গঠনে সফলতা লাভ করব।’

ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আপনারা দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। আপনাদের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, সরকার সবসময় আপনাদের পাশেই থাকবে। তবে আমি আশা করব আপনারা সরকারের এই রাজস্ব লক্ষ্য অর্জনে সহযোগিতা করবেন। এটা কর কর্মকর্তাদের একার দায়িত্ব না। এখানে ব্যবসায়ীদেরও দায়িত্ব আছে। সময়মতো কর ও ভ্যাট পরিশোধ করতে হবে। আমরা জানি, কখনো কখনো প্রশাসনিক জটিলতা ও কর্মকর্তাদের আচরণে আপনারা অস্বস্তিবোধ করেন। সেই সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধানের কাজ আমরা হাতে নিয়েছি, এটা অব্যাহত আছে। এরপরেও যারা রাজস্ব পরিহারের সংস্কৃতিতে থাকতে চাইবে, তাদের জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। যেন সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত না হয় এবং লেভেল প্লেয়িং ফিলড বিনষ্ট না হয়।

রাজস্ব খাত সংস্কার প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের রাজস্ব প্রশাসনের সমগ্র স্থাপত্যে যুগান্তকারী সংস্কার হাতে নিয়েছি। আমরা পুরাতন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দুটি স্বতন্ত্র ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ সৃজনের মাধ্যমে আমরা আরও দক্ষ ও গতিশীল রাজস্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হব। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস নয়। এটি আমাদের দর্শনের একটি মৌলিক পরিবর্তন। রাজস্বনীতি বিভাগ হবে আমাদের থিংক ট্যাংক, এটি বিশেষজ্ঞ সংস্থা যা একটি সুষম প্রতিযোগিতামূলক উন্নয়নবান্ধব কর কাঠামো ডিজাইন করবে।

রাজস্বনীতি বিভাগ গঠনের ক্ষেত্রে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শনগত অবস্থান নিয়েছি। করনীতি প্রণয়নের দায়িত্ব শুধু আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আয়কর ভ্যাট কাস্টমস, অর্থনীতি ব্যবসায়ী প্রশাসন, গবেষণা পরিসংখ্যান, নিরীক্ষা হিসাববিজ্ঞান এবং আইন বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি দেশের প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, গবেষক, শিল্প বাণিজ্য সংগঠন বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পরামর্শকে আমরা নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে চাই।

ভ্যাট আইন সংস্কার প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ বছরের বাজেটে কাস্টমস ও ভ্যাট আইনের বেশ কিছু সংস্কার করেছি যাতে করদাতাদের হয়রানি বন্ধ হয় এবং একটি আস্থাভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। কর প্রদানকে আরও সহজ করতে হবে।

রাজস্বসংক্রান্ত বিরোধ বছরের পর বছর ঝুলে থাকা কারও জন্য মঙ্গলজনক নয়, না সরকারের জন্য, না ব্যবসার জন্য। তাই অল্টারনেটিভ ডিসপিউট রেজল্যুশন এডিআরকে আরও কার্যকর করতে হবে। যেখানে সম্ভব দীর্ঘ লিটিগেশনের পরিবর্তে দ্রুত ন্যায়সঙ্গত স্বচ্ছ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

‘সরকারের লক্ষ্য মামলা বাড়ানো নয়, সঠিক রাজস্ব দ্রুত এবং ন্যায়সঙ্গতভাবে আদায় করা। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে কার্যকর গ্রহণ করা হয়েছে। আমাদের একটি সুস্পষ্ট ট্যাক্সপেয়ার সার্ভিস চার্টার থাকা প্রয়োজন। কোন কোন সেবা কত দিনের মধ্যে পাওয়া যাবে? কোন কর্মকর্তার কি দায়িত্ব? অভিযোগ কোথায় করা যাবে এবং কত দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি হবে এসব বিষয়ে করদাতার স্পষ্ট অধিকার থাকতে হবে। রাজস্ব প্রশাসনের পারফরমেন্স শুধু কত টাকা আদায় হলো তা দিয়ে নয়। ট্যাক্সপেয়ার স্যাটিসফেকশন এবং সার্ভিস ডেলিভারি দিয়েও মূল্যায়ন করতে হবে। রাজস্ব আহরণের যেসব দর্শন রয়েছে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো করদাতার সেবা নিশ্চিত করা।’