যুদ্ধ-সংঘাত, ক্ষুধা-দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বহুমাত্রিক মানবিক সংকটে বিপন্ন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ। কোথাও যুদ্ধের বোমায় ধ্বংস হচ্ছে ঘরবাড়ি ও হাসপাতাল, কোথাও খাদ্য সংকটে জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে, আবার কোথাও বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিধসে মুহূর্তেই সর্বস্ব হারাচ্ছে মানুষ। সংকট যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে খাদ্য, চিকিৎসা, আশ্রয় ও সুরক্ষার প্রয়োজন। কিন্তু পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তায় অর্থায়নও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
এদিকে মানবসেবা করতে গিয়ে গত এক দশকে বিশে^ ১ হাজার ৯২২ জন নিহত ও ১ হাজার ৫০৪ জন অপহরণসহ ৫ হাজার ৪৪৮ জন মানবতাকর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এমন বাস্তবতায় আজ বুধবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব মানবতা দিবস। সংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানুষ, স্বেচ্ছাসেবক ও মানবিক সহায়তাকর্মীদের অবদান স্মরণ করার পাশাপাশি বিশ্বের বিপন্ন মানুষের দুর্দশা এবং তাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরাই দিবসটির মূল উদ্দেশ্য। দিবসটি উপলক্ষে বিবৃতি দিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।
জাতিসংঘের মানবিকবিষয়ক সমন্বয় দপ্তরের (ওসিএইচএ) ২০২৬ সালের গ্লোবাল হিউম্যানিটারিয়ান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছর বিশ্বে ২৩৯ মিলিয়ন মানুষের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। এর মধ্যে ১৩৫ মিলিয়ন সহায়তার আওতায় আনার লক্ষ্য গ্রহণ করে মানবিক সংস্থাগুলো। সবচেয়ে জরুরি জীবনরক্ষাকারী সহায়তার জন্য অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে ৮৭ মিলিয়ন মানুষকে। এই সহায়তা দিতে ২০২৬ সালে মানবিক সংস্থাগুলো প্রায় ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আবেদন জানিয়েছে। অর্থাৎ, বিশ্বের বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন রক্ষায় প্রয়োজনীয় খাদ্য, পানি, চিকিৎসা, আশ্রয় ও সুরক্ষা নিশ্চিতে এই বিপুল অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু মানবিক সহায়তার প্রয়োজন বাড়লেও তার জন্য অর্থায়ন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ওসিএইচএর তথ্য বলছে, অর্থের ঘাটতি হলে সবচেয়ে আগে আঘাত আসে জীবনরক্ষাকারী কর্মসূচিতে। খাদ্য সহায়তা কমে যায়, চিকিৎসা কার্যক্রম সংকুচিত হয়, পানি ও স্যানিটেশন প্রকল্প বন্ধের ঝুঁকি তৈরি হয়। শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য আশ্রয় এবং সুরক্ষা কর্মসূচিও বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে বিশ্ব এখন এক ধরনের দ্বৈত সংকটের মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। মানবিক প্রয়োজন বাড়ছে, অথচ সেই প্রয়োজন মেটানোর অর্থ ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ দুটিই চাপের মুখে পড়েছে।
ওসিএইচএ-এর হিসাব বলছে, মানবিক প্রয়োজন এখন আর শুধু কোনো একটি যুদ্ধ বা দুর্যোগকবলিত অঞ্চলের সমস্যা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একসঙ্গে একাধিক সংকট তৈরি হওয়ায় মানবিক সহায়তার চাহিদাও ক্রমেই বাড়ছে। মানবিক সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ মানুষ। যুদ্ধের বোমা শুধু সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করে না; ধ্বংস করে মানুষের ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, স্কুল, পানি সরবরাহব্যবস্থা ও জীবিকা। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে খাদ্য ও চিকিৎসার সংকট তৈরি হয়, বাড়ে বাস্তুচ্যুতি।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যুক্ত হলে সেই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, তাপপ্রবাহ ও ভূমিধস মানুষের জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে ফেলছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী এসব সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার। ফলে মানবিক সংকট শুধু ত্রাণের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত মানুষের জীবন, খাদ্য, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, শিক্ষা, বাসস্থান, জীবিকা ও মর্যাদা।
এইড ওয়ার্কার সিকিউরিটি ডেটাবেজের (এডব্লিউএসডি) ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, মানবিক সংকটে বিপন্ন মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও সুরক্ষা পৌঁছে দেওয়া সহায়তাকর্মীরাই এখন ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। ২০১৬ থেকে ২০২৫ এক দশকে ৫ হাজার ৪৪৮ জন মানবতাকর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৯২২ জন সহায়তাকর্মী নিহত, ২ হাজার ২২ জন আহত ও ১ হাজার ৫০৪ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া শত শত মানবতাকর্মী আটক ও গ্রেপ্তারের শিকার হয়েছেন।
সংস্থাটির তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। মানবসেবা করতে গিয়ে গত ৩ বছরে ২ হাজার ৩৫৮ মানবতকর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৪ জন নিহত, ৮৪৩ জন আহত ও ৪৮১ জন অপহৃত হয়েছেন। এ ছাড়া অনেক মানবতাকর্মী আটক কিংবা গ্রেপ্তার হয়েছেন।
সংস্থাটি জানিয়েছে, বিশে^র সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি হচ্ছে গাজা ও সুদানে। ২০২৫ সালে মানবিক সহায়তাকর্মীদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী পরিস্থিতি ছিল গাজায়। সেখানে বিপুলসংখ্যক মানবিককর্মী নিহত হয়েছেন। সুদানেও সংঘাতের কারণে মানবিক সহায়তাকর্মীদের নিরাপত্তা ভয়াবহভাবে বিঘিœত হয়েছে। এ ছাড়া ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, দক্ষিণ সুদান ও ইউক্রেনসহ বিভিন্ন সংঘাতপ্রবণ এলাকায় মানবিক কর্মীদের ওপর হামলা, অপহরণ, আটক ও অন্যান্য সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। এই পরিসংখ্যান শুধু কর্মীদের মৃত্যুর হিসাব নয়। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে সংকটে থাকা মানুষের জীবন। একজন মানবিককর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হলে কোনো এলাকায় সহায়তা পৌঁছানোর কার্যক্রমও ব্যাহত হতে পারে।
মানবিক সংকটের আরেকটি বড় দিক ক্ষুধা। যুদ্ধ ও দুর্যোগে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্য সরবরাহ কমে যায়। বাজারব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, মানুষের আয় কমে এবং খাদ্যের দাম বেড়ে যায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশু, নারী, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী মানুষ। যুদ্ধ ও সহিংসতার কারণে মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হলে সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়। শরণার্থী শিবিরে খাবার, পানি, স্বাস্থ্যসেবা, পয়োনিষ্কাশন ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘদিন বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগও সংকুচিত হয়। ফলে মানবিক সংকট প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিশ্ব মানবতা দিবসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হচ্ছে শুধু খাবারের প্যাকেট বা ত্রাণের বস্তা পৌঁছে দেওয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িত মানুষের জীবন রক্ষা, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুর স্কুলে ফিরে যাওয়ার সুযোগ, একটি বাস্তুচ্যুত পরিবারের নিরাপদ আশ্রয়, একজন অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা পাওয়া, বন্যাকবলিত মানুষের বিশুদ্ধ পানি পাওয়া কিংবা একটি শরণার্থী পরিবারের খাদ্য ও সুরক্ষা নিশ্চিত হওয়া সবই মানবিক সহায়তার অংশ। তাই মানবিক সংকট মোকাবিলায় শুধু আরও ত্রাণ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। যুদ্ধ বন্ধ করা, বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া, শরণার্থীদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি করা, জলবায়ু ঝুঁকি কমানো এবং দুর্যোগপ্রবণ জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বাড়ানো।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যায়, মানবিক সহায়তা শুধু আন্তর্জাতিক সংস্থার বিষয় নয়। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিধস বা অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্যোগে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক, ফায়ার সার্ভিস, রেড ক্রিসেন্ট, এনজিওকর্মী এবং স্থানীয় মানুষই প্রথমে এগিয়ে আসেন। তাই দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এসব সংস্থা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ- সবাই মানবিক কার্যক্রমের অংশ। বাংলাদেশে যুদ্ধের কারণে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় না ঘটলেও নানা রকম মানবিক সংকটের মুখোমুখি হয়ে থাকে। বিশেষ করে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন ও জীবিকাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা, আশ্রয় ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়ে।
বিশ্ব মানবতা দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক বার্তায় মানবিক সংকটের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেছেন, মানুষের সেবা করা এখন আগের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। মানবিক কর্মীরা গুলি-গোলাবর্ষণ, বোমা হামলা, অপহরণ ও অন্যান্য সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। যুদ্ধের নতুন প্রযুক্তি, বিশেষ করে সশস্ত্র ড্রোন, মানবিক কর্মীদের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। একই সঙ্গে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ বাধাগ্রস্ত করা, কর্মীদের হুমকি দেওয়া, আটক ও গ্রেপ্তার করার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। তিনি বলেন, যুদ্ধের আইন মানতে হবে, বেসামরিক মানুষ ও মানবিক কর্মীদের সুরক্ষা দিতে হবে, নিরাপদ মানবিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাসহ হামলার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথা জানান।