দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে চারটি। এগুলোর মোট উৎপাদনক্ষমতা ৪ হাজার ৩১০ মেগাওয়াট। নিজস্ব ব্যবহার বাদে কেন্দ্রগুলো জাতীয় গ্রিডে ৪ হাজার ৭২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে। তবে বিকল্প সঞ্চালন লাইনের অপূর্ণতায় প্রয়োজনের সময় রাজধানীতে বিদ্যুৎ আনা সম্ভব হচ্ছে না।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজ করেন এমন কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকায় বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য পদ্মা সেতুর পাশ দিয়ে একটি ৪০০ কেভির সঞ্চালন লাইন রয়েছে। এটি দিয়ে রাজধানীর আমিনবাজার সাবস্টেশনে বিদ্যুৎ আনা হয়। এরপর সেই বিদ্যুৎ বিতরণ করা হয়। এ সঞ্চালন লাইন দিয়ে চাইলে ৪ হাজার ৭২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আনা সম্ভব। তবে কোনো কারণে লাইনটি ট্রিপ করলে দেশে ব্ল্যাকআউট হবে। অর্থাৎ পুরো দেশের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাবে। ব্ল্যাকআউট হলে পুরো বিদ্যুৎব্যবস্থা সচল করতে আবার ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা সময়ের প্রয়োজন হবে। এ আশঙ্কা থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো রেশনিং করে চালানো হচ্ছে। অর্থাৎ কোনো একটি কেন্দ্র পূর্ণমাত্রায় চালানো হলে অন্য কেন্দ্রে কম উৎপাদন করা হয়।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, এ সমস্যা কাটাতে চীনা বিনিয়োগে পদ্মা নদীর ওপর দিয়ে আরও একটি ৪০০ কেভি সঞ্চালনক্ষমতার লাইন নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। দরপত্র, ঋণচুক্তিসহ অন্য সব প্রক্রিয়া শেষ হলেও প্রকল্পটি এখন থমকে রয়েছে।
কেন ব্ল্যাকআউট হতে পারে : দেশে পিক বা সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদার সময় সাধারণত ১৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। কোনো কারণে যদি ১০ ভাগ বিদ্যুৎ সঞ্চালনের একটি লাইন আকস্মিক ট্রিপ করে, অর্থাৎ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে দেশে ব্ল্যাকআউট হতে পারে। অর্থাৎ ১৬ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের সময় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের সরবরাহ বন্ধ হলেই ব্ল্যাকআউট হতে পারে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৪ হাজার ৭২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ১৬ হাজার মেগাওয়াট হলে তা হবে ২৫ ভাগ। তাই কোনো কারণে পদ্মা সেতুর পাশের সঞ্চালন লাইনটি ট্রিপ করলে সারা দেশ অন্ধকারে তলিয়ে যাবে।
কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র না চালালে ক্ষতি কী : কয়লাচালিত বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ইউনিটপ্রতি ১০ থেকে ১৩ টাকার মধ্যে। অন্যদিকে ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতি কিলোওয়াট-আওয়ার বা ইউনিটের উৎপাদন ব্যয় ৩০ টাকার ওপরে। এ ছাড়া ফার্নেস অয়েলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন খরচ ২৫ টাকার ওপরে। সে হিসাবে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ ডিজেলের তুলনায় ১৭ টাকা কম এবং ফার্নেস অয়েলের তুলনায় ১২ টাকা কম। কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের বদলে তরল জ্বালানির কেন্দ্র চালালে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়। সম্প্রতি বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পিডিবি তাদের খুলনার ৩৩০ মেগাওয়াট ডিজেলচালিত কেন্দ্র চালাতে বাধ্য হচ্ছে। ঢাকায় যখন চাহিদা বেড়ে যায়, তখনো ঢাকার আশপাশের তরল জ্বালানির কেন্দ্রগুলো চালিয়ে বাড়তি খরচে উৎপাদন করে গ্রাহকের চাহিদা মেটানো হয়। একটি ১০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র পূর্ণক্ষমতায় চালালে দৈনিক ২ দশমিক ৪ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। কম দামের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন করলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় সম্ভব।
ভর্তুকি কমাতে কম দামের বিদ্যুতের বিকল্প নেই: গত বছর বিদ্যুৎখাতে প্রায় ৬৩ হাজার কোটি টাকার মতো ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছর বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি ৪৩ হাজার কোটি টাকার মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে ভর্তুকির সঠিক পরিমাণ পাওয়া কঠিন। পিডিবির ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পথ হচ্ছে কম খরচে উৎপাদনের ব্যবস্থা করা।
দেশে ২৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের মধ্যে গ্যাস থেকে ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট উৎপাদন করা হয়, যা মোট বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৪২ দশমিক ১৫ ভাগ। এর পরেই রয়েছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। সেখান থেকে ৮ হাজার ৪২৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়, যা মোট কেন্দ্রের ২৮ দশমিক ৪৬ ভাগ। এর মধ্যে আদানির একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ভারতে। কেন্দ্রটি বিশেষভাবে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে।
ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র রয়েছে ৫ হাজার ৬১৯ মেগাওয়াট, যা মোট কেন্দ্রের ১৯ ভাগ। এর বাইরে ৭৬৮ মেগাওয়াট রয়েছে ডিজেলচালিত কেন্দ্র, যা মোট উৎপাদনের ২ দশমিক ৬০ ভাগ। এ ছাড়া পানি, সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, আলাদাভাবে যার পরিমাণ মোট কেন্দ্রের ১ ভাগের কম। এর মধ্যে সবচেয়ে কম দরে গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। প্রতি ইউনিট ৪ থেকে ৬ টাকার মধ্যে গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। তবে এলএনজি আমদানির অবকাঠামোর অপ্রতুলতায় গ্যাস পাওয়া কঠিন। সেই সংকট সামাল দিতে কম খরচের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয় কয়লাকে। কয়লা আমদানির অবকাঠামোগত কোনো সংকট এ মুহূর্তে নেই।
কয়লার বড় কেন্দ্র কেন উপকূলীয় অঞ্চলে : বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কয়লা পরিবহনের তেমন কোনো অবকাঠামো নেই। প্রতিবেশী দেশ ভারত সারা দেশে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছে। তারা কয়লা পরিবহনের জন্য আলাদা রেলযোগাযোগের ব্যবস্থা করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা পায়রা ও মহেশখালীর সঙ্গে সরাসরি কোনো রেলযোগাযোগ নেই। এ কারণে চাইলেই উপকূলীয় এলাকার বাইরে কয়লা পরিবহন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে মহেশখালীই একমাত্র উপকূলীয় এলাকা, যেখানে ১৩ থেকে ১৪ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের কারণে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টন ধারণক্ষমতার কয়লাবাহী জাহাজ ভিড়তে পারে। পায়রা সমুদ্রবন্দর এলাকায় ড্রেজিং করে গভীরতা বাড়ানো হলেও সেখানে ৮০ হাজার টনের কয়লাবাহী জাহাজ নোঙর করতে পারে না। বড় জাহাজে কয়লা আনা হলে আন্দামান বন্দর থেকে সেগুলো আবার ছোট জাহাজে করে দেশে আনা হয়। একইভাবে মোংলাতেও গভীরতা কম থাকায় বেশি ড্রাফটের জাহাজ বা মাদার ভেসেল ভিড়তে পারে না। এতে করে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লাও লাইটারেজ করতে হয়। অন্যদিকে দেশের নদ-নদীর নাব্যতা না থাকায় জলপথে বড় জাহাজে কয়লা পরিবহন সম্ভব নয়। সাধারণত ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র চালাতে দৈনিক ১০ হাজার টনের বেশি কয়লা প্রয়োজন হয়।
পায়রা-ঢাকা বিকল্প সঞ্চালন লাইনটির কী অবস্থা : বিদ্যুৎ সঞ্চালনসংকট কাটাতে পায়রা-গোপালগঞ্জ-আমিনবাজার ৪০০ কেভি ডাবল সার্কিট ট্রান্সমিশন লাইন (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় ২৫৬ কিলোমিটারের এ লাইনটি দিয়ে ২ হাজার ৪৮৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এ সঞ্চালন লাইনটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিসিপিসিএল)। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির বাইরে গিয়ে লাইনটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। চীনের সিইসিসি-ফেডি-সিনোহাইড্রো কনসোর্টিয়াম প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়ে নির্মাণের কাজ পায়। ৪০০ কেভি ক্ষমতার ডাবল সার্কিট সঞ্চালন লাইনটি ২০২৭ সালের জুন মাসে বাণিজ্যিকভাবে চালু করার সময়ও নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকল্পের গতি থমকে যায়।
লাইনটির জন্য চীনা বিনিয়োগ নিশ্চিত ছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন কেবল বাংলাদেশ ও চীন সরকার চাইলেই এ প্রকল্প হতে পারে। একই সে ঙ্গ পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও একটি ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। সেটির জন্যও চীন সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা হওয়া জরুরি বলে কর্মকর্তারা মনে করছেন। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটিরও অন্তত ৩০ ভাগ কাজ শেষ হয়ে আছে।
কখন সংকট প্রকট হয় : গ্রীষ্মকালে খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও শীতে কমে যায়। ফলে গ্রীষ্মে ওই অঞ্চলের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র চললেও শীতে বসেই থাকে। পিডিবির হিসাবে দেখা যায়, গত বছর ১৫ ডিসেম্বর শীতের সময়ও তরল জ্বালানি ফার্নেস অয়েল থেকে ৭ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন কিলোওয়াট-আওয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়লাচালিত কেন্দ্র চললে তরল জ্বালানির এ কেন্দ্রগুলো চালানোর প্রয়োজন হতো না।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা : জানতে চাইলে পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের সুষম উন্নয়নের চিন্তা করতে হবে। তাহলেই সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব।’
তবে সেই জায়গায় ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যখন বিদ্যুৎ খাতে উন্নয়নের চিন্তা করা হয়, তখন ৪০ ভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে, ৪০ ভাগ সঞ্চালন লাইন নির্মাণে এবং ২০ ভাগ বিতরণব্যবস্থার উন্নয়নে ব্যয় করার নির্দেশনা থাকলেও তা করা হয় না। এককভাবে উৎপাদন বাড়ালেও সঞ্চালন ও বিতরণে কোনো নজর থাকে না। এ পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে প্রকৃত উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি করতে হবে।’
বুয়েটের অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, ‘কীভাবে বিদ্যুতের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় সে বিষয়ে আমাদের চিন্তা করতে হবে। নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, এখনই তাদের সমালোচনা করার সময় আসেনি। কিন্তু আমরা বলতে চাই কোনো অসঙ্গতি থাকলে তা দূর করতে হবে। যেভাবে দেশ লাভবান হবে, সেভাবে পরিকল্পনা সাজাতে হবে।’