ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ের আনন্দকে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার জয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন বাংলাদেশের কোচ ফিল সিমন্স।
ভারতের অনলাইন পোর্টাল রেভস্পোর্টস-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে এই স্মরণীয় জয়ের গুরুত্ব, ড্রেসিংরুমের উদযাপন, মুশফিকুর রহিমসহ গোটা দলের অনুভূতি এবং এই ফলের অর্থ কী—তা নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।
লাল বলের ক্রিকেটে এই বাংলাদেশ দলকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেই তাদের হারানোর কাজটা আপনি কীভাবে সম্ভব করলেন?
সিমন্স: অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত। যেকোনো দলের জন্যই অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে জয় পাওয়া অনেক বড় ব্যাপার, কারণ নিজের মাঠে তারা অত্যন্ত শক্তিশালী। তবে আমার মতে, গত এক-দুই বছর ধরে আমাদের টেস্ট দলটি দিন দিন আরও উন্নত হচ্ছে। জিম্বাবুয়েতে আমরা একটি টেস্ট হেরেছিলাম, তবে তার বাইরে আমরা বেশ ভালো টেস্ট ক্রিকেট খেলছি। ফলে দলের আত্মবিশ্বাসটাও ধীরে ধীরে বাড়ছিল। যদিও প্রস্তুতি ম্যাচটি আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়নি, তবুও এই টেস্ট খেলতে নামার আগে খেলোয়াড়দের মনে সেই আত্মবিশ্বাসটা পুরোপুরি ছিল।
বাংলাদেশ এখন যেকোনো কন্ডিশনে বিদেশের মাটিতেও সমান প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলতে পারছে।
সিমন্স: আমরা এই বিষয়টির ওপরই সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। গতির দিক থেকে আমরা রানা (নাহিদ)-কে মিস করেছি, তবে যে তিনজন পেসার খেলেছে, তারা তাদের নিখুঁত বোলিং ও শৃঙ্খলা দিয়ে সেই অভাব পূরণ করে দিয়েছে।
কোচ ফিল সিমন্সের জন্য ব্যক্তিগতভাবে এই জয়ের অনুভূতি কেমন?
সিমন্স: আমি ড্রেসিংরুমে ছেলেদের বলেছি—আমার টেস্ট কোচিং ক্যারিয়ারের এটি সবচেয়ে বড় জয়। আমি ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়েও এখানে এসেছিলাম, কিন্তু অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে পারিনি। তাই এই জয়টা আমার কাছে অনেক স্পেশাল। যেভাবে আমরা একটা দল হিসেবে কাজ করেছি, ছেলেরা যেভাবে কঠোর পরিশ্রম করেছে—বিশেষ করে প্রস্তুতি ম্যাচে ৫৪ রানে অলআউট হওয়ার পর যেভাবে তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তা সত্যি অসাধারণ। জয়সূচক রানটি হওয়ার মুহূর্তে আমার যে আনন্দ হয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
অনেকে বাংলাদেশ দলকে নিয়ে কটূক্তি করছিলেন। সেটা কি ছেলেদের বাড়তি অনুপ্রাণিত করেছিল যে এটি সাধারণ কোনো ম্যাচের চেয়ে অনেক বেশি কিছু?
সিমন্স: আমার মনে হয় না আমাদের বাড়তি কোনো অনুপ্রেরণার প্রয়োজন ছিল। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলার সুযোগ এবং এই তরুণ দলের টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি টানই তাদের উদবুদ্ধ করার জন্য যথেষ্ট ছিল। তারা সবাইকে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিল যে বাংলাদেশ একটি ভালো টেস্ট দল এবং তারা ভালো টেস্ট ক্রিকেট খেলতে জানে। এখন সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—আমরা দেশের বাইরেও ভালো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে পারি। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো কন্ডিশনে, যেখানে সবাই মনে করে বাউন্স ও গতির সামনে আমরা ভেঙে পড়ব, সেখানে দেশের বাইরে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য ছেলেরা শতভাগ প্রস্তুত ছিল।
আরেকটু বিস্তারিত বলবেন? ছেলেদের আপনি ঠিক কী বার্তা দিয়েছিলেন?
সিমন্স: সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা। অনেক সময় দেখা যায়, সকালে ৪ বা ৫টি উইকেট পাওয়ার পর আমরা সেটাতেই সন্তুষ্ট হয়ে পড়ি। কিন্তু এই ম্যাচে আমরা চেষ্টা করেছি মধ্যাহ্নভোজ বা চা-পানের বিরতির সময়ও যেন আমাদের মনোযোগ একইভাবে ধরে রাখা যায় এবং মাঠে নেমে যেন আবেগ নিয়ন্ত্রণে থাকে। উইকেট না পেলেও যাতে আমরা খুব বেশি হতাশা বা উত্তেজনায় ভেসে না যাই—মানসিকতার এই সাম্যভাব ধরে রাখাই ছিল আমাদের মূল কাজ।
কয়েকদিন আগেই মেহেদী হাসান মিরাজকে নিয়ে অনেক সমালোচনা ও ট্রোল হয়েছিল, বিশেষ করে ৫ উইকেট ও ৫০ রানের সেই পারফরম্যান্সের পর। মিরাজকে নিয়ে কিছু বলবেন?
সিমন্স: অসাধারণ! অলরাউন্ডার হিসেবে ওর অবস্থান ক্রমশ মজবুত হচ্ছে। ওয়ানডেতে সে এখন দুই নম্বর অলরাউন্ডার এবং টেস্টেও নিজের অবস্থান উন্নত করছে। দ্বিতীয় ইনিংসে আমরা তার কাছ থেকে বিশ্বমানের অফস্পিন বোলিং দেখেছি। স্টিভ স্মিথও যেমনটা বলেছিল—তৃতীয় দিনেও উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য যথেষ্ট ভালো ছিল। সেই উইকেটে স্মিথের মতো ব্যাটারকে পরাস্ত করার ক্ষমতা প্রমাণ করে যে ওর অফস্পিন দক্ষতা দিন দিন কতটা উন্নত হচ্ছে।
সিরিজ কিন্তু এখনও শেষ হয়নি, অস্ট্রেলিয়া অবশ্যই দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে। এখন আপনারা এগিয়ে আছেন, সবার চোখ আপনাদের ওপর। এই নিয়ে কী ভাবছেন?
সিমন্স: আমরা যদি সিরিজটা জিততে পারি, তবে তা হবে আরও বড় অর্জন। তাছাড়া অক্টোবরে ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আমাদের দুটি টেস্ট রয়েছে। এই সিরিজ জিততে পারলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টের প্রথম দিনেই মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ থাকবে। এই একটি টেস্ট জয়ই ঐতিহাসিক এবং বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য অনেক বড় বিষয়। তবে আমাদের আরও একটি ম্যাচ বাকি এবং আমরা এই টেস্টের ফর্ম ও পারফরম্যান্সের মানটাই ধরে রাখতে চাই।
মাঠের ভেতরের উদযাপন কেমন ছিল?
সিমন্স: আমরা এই আনন্দের তুলনা করছিলাম ফুটবল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ম্যাচ জয়ের সাথে! কারণ বিশ্বকাপে ঢাকার রাজপথের দৃশ্যগুলো ছিল অবিশ্বাস্য। গতকাল আমরা বলছিলাম, পরিবেশটা ঠিক তেমনই রূপ নিয়েছে। মানুষ আনন্দ করছে, বাংলাদেশ থেকে এত এত বার্তা পেয়েছি—সবকিছুই দারুণ। অনেকেই হয়তো বিশ্বাস করতে পারেনি যে এমন কিছু সম্ভব, তাও আবার এই সফরে। বাংলাদেশের মানুষের মনে এখন কী অনুভূতির দোলাচল চলছে তা আমি অনুধাবন করতে পারি, কারণ আমার নিজের অনুভূতিটাও ঠিক তেমনই।
একজন খেলোয়াড় এবং সফল কোচ হিসেবে আপনার কাছে এর গুরুত্ব কতখানি? বাংলাদেশ যদি এভাবে ধারাবাহিক হতে পারে, তবে টেস্ট ক্রিকেট সামগ্রিকভাবে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সিমন্স: হ্যাঁ, এটাই আমাদের দরকার। টেস্ট ক্রিকেটে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশ খুব প্রয়োজন। কয়েক বছর আগে স্টিভ স্মিথ বলেছিল, টেস্ট ক্রিকেটের স্বার্থেই একটি শক্তিশালী ও প্রতিদ্বন্দ্বী ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রয়োজন। তবে আমার মতে, টেস্ট ক্রিকেটকে জমজমাট রাখতে প্রতিটি দলেরই শক্তিশালী হওয়া উচিত। আর আমাদের উন্নতির জন্য এমন সুযোগ বারবার পেতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে যেন আগের টেস্ট—যা হয়তো ২০ বছর আগে খেলেছিলাম—তার চেয়ে যেন আমরা ভালো খেলি। এভাবে পারফর্ম করা ও ম্যাচ জেতা টেস্ট ক্রিকেটকে আরও আকর্ষণীয় করবে এবং আমাদের জন্যও ভালো হবে।
এত বড় সাফল্যের পর পুনরায় মনোযোগ ফেরানো সহজ নয়। কোচ ফিল সিমন্সের জন্য এটি কি বড় চ্যালেঞ্জ?
সিমন্স: অবশ্যই। আগামী টেস্টের আগে এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ ছাড়ার আগেই আমরা কথা বলেছিলাম যে নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, কারণ খেলায় আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা অন্যতম বড় বিষয়। আমরা ভালো করা শুরু করলেই বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়ি, তাই দ্বিতীয় টেস্টে নামার আগে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।