মায়ের মায়া বা পারিবারিক বন্ধন—সবকিছুকেই যেন আড়াল করে দিয়েছিল সম্পত্তির লোভ। জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে জীবিত শাশুড়িকে কাগজপত্রে ‘মৃত’ বানিয়ে জমি লিখে নেওয়ার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু সাবরেজিস্ট্রারের তীক্ষ্ণ নজর ও তাৎক্ষণিক জিজ্ঞাসাবাদে ভেস্তে গেল সেই অপচেষ্টা।
ফেনী সদর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে ঘটেছে এই জালিয়াতির ঘটনা। মৃত মো. জহিরুল হকের স্ত্রী সাজেদা আক্তার তাঁর শাশুড়ি হাজেরা খাতুনকে মৃত দেখিয়ে ভুয়া ওয়ারিশ সনদ ও জমাখারিজ তৈরি করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল ফেনী পৌর এলাকার রামপুর মৌজার সাড়ে ৪ শতক জমি বিক্রি করা।
বুধবার সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়ে দলিল রেজিস্ট্রেশনের জন্য কাগজপত্র জমা দেওয়া হলে ফেনী সদর সাবরেজিস্ট্রার আবদুর রহমান মোহাম্মদ তামিমের সন্দেহ হয়। তথ্যে গরমিল দেখে তিনি সাজেদা আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে সাজেদা স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, তাঁর শাশুড়ি প্রকৃতপক্ষে জীবিত আছেন। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই সাবরেজিস্ট্রার রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম স্থগিত করেন এবং ভুয়া কাগজপত্রগুলো জব্দ করেন।
ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ার পর মঙ্গলবার দুপুরে স্বশরীরে সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়ে হাজির হন প্রতারণার শিকার বৃদ্ধা হাজেরা খাতুন। নিজেকে ‘জীবিত’ দাবি করে তিনি সাবরেজিস্ট্রারের কাছে গিয়ে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন এবং সঠিক সময়ে জালিয়াতি ধরে ফেলায় তাঁকে অশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। বুধবার বিষয়টি ফেনী শহরে জানাজানি হলে তা ‘টক অব দ্য টাউনে’ পরিণত হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১৯ আগস্ট জহিরুল হক মারা যান। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে এবং বৃদ্ধা মাকে রেখে গেলেও ওই বছরের জুলাই মাসে সোনাগাজী উপজেলার বগাদানা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নেওয়া এক ওয়ারিশ সনদে কৌশলে মায়ের নাম বাদ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ওই জালিয়াতি করা সনদ দিয়েই জমির জমাখারিজ সম্পন্ন করা হয়েছিল।
ফেনী ট্রাংক রোডের ব্যবসায়ী আবদুর রহিম জানান, ঘটনাটি শুনে বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। নিজের স্বার্থের জন্য মানুষ কতটা নিচে নামতে পারে, এটি তার একটি চরম উদাহরণ। জীবিত শাশুড়িকে কাগজে-কলমে মৃত বানিয়ে জমি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা কোনো স্বাভাবিক মানসিকতার কাজ হতে পারে না। তবে সাবরেজিস্ট্রার যেভাবে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে বিষয়টি ধরে ফেলেছেন, সেজন্য তিনি অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। এ ধরনের কঠোর নজরদারি না থাকলে সাধারণ মানুষ বা অসহায় প্রবীণরা কোনো দিন শান্তিতে থাকতে পারবেন না। প্রতারকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়।
গৃহিণী সালমা আক্তার বলেন, খবরটি শোনার পর থেকে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে আছে। যেখানে আমাদের সমাজে বয়োজ্যেষ্ঠ বা শাশুড়িকে সম্মান ও যত্নে রাখার কথা, সেখানে জমিলোভী স্বজনরাই তাঁকে জালিয়াতি করে মৃত বানিয়ে দিচ্ছেন! এটি শুধু কোনো জমি বিক্রির চেষ্টা নয়, এটি পারিবারিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়। আমরা ফেনীবাসী হিসেবে এই ঘটনায় খুবই লজ্জিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আমাদের একটাই দাবি—শুধু জমি বিক্রি আটকানোই যথেষ্ট নয়, এই প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নিয়ে তাদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট দলিল লেখক আবু ছালেহ টিপু জানান, তাঁকে যে ওয়ারিশ সনদ ও জমাখারিজ এনে দেওয়া হয়েছিল, তিনি সে অনুযায়ী দলিল প্রস্তুত করেছিলেন। পরবর্তীতে কাগজপত্র ভুয়া প্রমাণিত হওয়ায় রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়।
ফেনী সদর সাবরেজিস্ট্রার আবদুর রহমান মোহাম্মদ তামিম জানান, জমি ক্রেতা ও বিক্রেতাদের জালিয়াতি থেকে রক্ষা করতে এবং শতভাগ সঠিক মালিকানা নিশ্চিত করতে তাঁরা কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন, ভুয়া কাগজপত্র ও তথ্য গোপন করে দলিল হস্তান্তরের চেষ্টা করা হলে তা তাঁদের নজরে আসে। শাশুড়িকে মৃত দেখিয়ে ভুয়া সনদ তৈরির বিষয়টি স্বীকার করায় দলিলটি জব্দ করা হয়েছে। রাজস্ব ফাঁকি বা যেকোনো ধরনের প্রতারণা রোধে তাঁদের এই কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে।