শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হানকে ধরতে আরেক সন্ত্রাসী দলের সঙ্গে গ্রামবাসী!

চট্টগ্রামের রাউজানে আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মো. রায়হান ও তার বাহিনীর সঙ্গে জানে আলম বাহিনীর মধ্যে অন্তত ২০০ রাউন্ড গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে। তবে এতে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। 

গত ১২ আগস্ট ভোরে রায়হানের নিজ গ্রাম উপজেলার কদলপুর গুচ্ছ গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। রাউজান থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘দুই পক্ষের মধ্যে রাবার বুলেট বিনিময় হয়েছে। হতাহতের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ঘটনার তদন্ত চলছে।’ স্থানীয় সুত্র জানিয়েছে, কদলপুর গুচ্ছ গ্রামে সন্ত্রাসী রায়হান দলবল নিয়ে অবস্থান করছেন এমন খবর পেয়ে সন্ত্রাসী জানে আলম বাহিনীর ৩০ থেকে ৩৫জন সদস্য ঘটনাস্থলে যায়। তবে তাদের (জানে আলম) সঙ্গে স্থানীয় কিছু লোকজনও যোগ দিয়েছিল। বিষয়টি টের পেয়ে গুলিবর্ষণ শুরু করে রায়হান বাহিনী। এ সময় পাল্টা গুলি চালায় জানে আলম বাহিনী। 

স্থানীয় সুত্রের দাবি, রায়হান পুলিশের মোস্ট ওয়ান্টেড একজন সন্ত্রাসী। তিনি একের পর এক খুন-খারাবি করে চট্টগ্রামকে অশান্ত করে রেখেছেন। মূলত তাকে ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করতে জানে আলম বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দারাও যোগ দিয়েছিলেন। ঘটনার দিন তার (রায়হান) দলে ৭ থেকে ৮জন অস্ত্রধারী ছিল। দুই পক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময়ের এক পর্যায়ে পিছু হটতে বাধ্য হয় রায়হান বাহিনী। এক পর্যায়ে দলবল নিয়ে রাউজান সীমানা ঘেঁষা গহিন পাহাড়ের দিকে পালিয়ে  যান রায়হান ও তার বাহিনী।     

গত ২৯ জুলাই রাতে নোয়াখালীতে অল্পের জন্য পুলিশের জালে আসেনি আলোচিত এ শীর্ষ সন্ত্রাসী। অভিযানের সময় একটি বাসার ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন রায়হান। এ ঘটনার দুই দিন পর চট্টগ্রাম  জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলমের উদ্দেশে  ফেসবুকে পোস্ট দেন রায়হান।  পোস্টে রায়হান তাকে পালিয়ে  যেতে সহায়তা করার জন্য  নোয়াখালীর বাসিন্দাদের ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের এসপি মাসুদ আলমের উদ্দেশে তিনি লেখেন, ‘দোজখ আর জাহান্নামে তফাত কী মাসুদ স্যার?’

এদিকে একই রাতে (২৯ জুলাই)  ভোরে যশোরের কোতোয়ালি থানার ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে তিন সহযোগীসহ ধরা পড়েন চট্টগ্রামের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী    ডেভিড ইমন। আগের দিন (২৮ জুলাই) সন্ত্রাসী মিঠু ওরফে ধামা ইলিয়াছকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। দুই দিনের ব্যবধানে দুর্ধর্ষ দুই সন্ত্রাসী পুলিশের জালে আসায় আন্ডারওয়ার্ল্ডে ধস নামে বলে অভিমত পুলিশ কর্মকর্তাদের। ডেভিড ইমন গ্রেপ্তারের পর সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেছেন, ‘চট্টগ্রামকে অশান্ত করে রাখা কয়েকজন সন্ত্রাসীর মধ্যে রায়হান অন্যতম। আমরা তাকে ধরেই ফেলেছিলাম।  সে  কোনোভাবে ছাদ থেকে লাফিয়ে পালিয়ে গেছে। তবে সে জাহান্নাম না দেখলেও দোজখ  দেখে ফেলেছে। তাকে ধরতে পারলে স্বস্তি নেমে আসবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে।’ 

পুলিশ সুপার মাসুদ আলমের এমন বক্তব্যের পরই রায়হান তার ফেসবুক  পোস্ট দিয়ে   লেখেন, ‘ধন্যবাদ নোয়াখালী রংমালার মানুষদের। 

তারা এমন নিকটভাবে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে। বিপদের সময় ভালো-মন্দ সব শ্রেণির মানুষের কাছ থেকে সহযোগিতা পাওয়ার আশা থাকে এবং তিনি  নোয়াখালী থেকে তা পেয়েছেন। একই সঙ্গে ‘সুযোগ পেলেই ভালো হয়ে যাব’। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এসপি মাসুদ আলম বলেন, ‘পুরো  নোয়াখালীবাসী তো আর তাকে সাহায্য করেনি। হতে পারে গুটিকয়েক লোক তাকে জেনে বা না জেনে সাহায্য করেছে। রায়হানকে  গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গতকাল বুধবার(১৯ আগস্ট) বিকেলে রায়হানকে গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে একই কথা বলেন রাউজান থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম।

পুলিশ জানায়, রায়হান বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তার  বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, খুনসহ নানা অভিযোগে অন্তত ১৪টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে সাতটিই হত্যা মামলা। রায়হান সম্পর্কে চান্দগাঁও থানার সাবেক ওসি বর্তমানে বন্দর থানায় কর্মরত আফতাব উদ্দিন বলেন, ‘দুর্ধর্ষ  সন্ত্রাসী’ রায়হান ঠান্ডা মাথার খুনি। খুন করে দলবল নিয়ে উল্লাস করে পালিয়ে যান রাউজানের পার্শ্ববর্তী রাঙ্গামাটির পাহাড়ি আস্তানায়। কথায় কথায় গুলি ছোড়েন রায়হান। একসময় ছিল চোলাই মদ বিক্রেতা।’ 

রায়হানের বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজানের কদলপুরে। তার বাবার নাম বদিউল আলম। হত্যাচেষ্টার মামলায় কারাগারে গিয়ে তার সঙ্গে পরিচয় হয় আরেক দুর্ধর্ষ ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ  হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে। ২০২৫ সালের আগস্টে দুজনই চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে বের হন। জামিনে  বের হয়ে ঘটাতে থাকেন একের পর এক হত্যাকান্ড। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাউজানে সংঘটিত অধিকাংশ খুনের ঘটনায় উঠে এসেছে রায়হানের নাম। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামের অপরাধজগতে আলোচিত নাম হয়ে ওঠে ছোট সাজ্জাদ, রায়হান, ডেভিড ইমন, ধামা ইলিয়াছসহ আরও কয়েকজন। এর মধ্যে ছোট সাজ্জাদ, ডেভিড ইমন ও ধামা ইলিয়াছ গ্রেপ্তার হয়েছেন। ফটিকছড়ি থানার একটি অস্ত্র মামলায় পাঁচদিনের রিমান্ডে আছেন ডেভিড ইমন। বাকি রউল শুধু রায়হান। 

এর আগে গত আড়াই দুই বছরে চট্টগ্রামে তারা কমপক্ষে এক ডজন টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা ঘটান। আন্ডারওয়ার্ল্ডের বিরোধ, আধিপত্যের দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি, বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্ববিরোধের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে পুরো চট্টগ্রামকে অস্থির করে রাখে বড় সাজ্জাদ বাহিনী। পুলিশ জানায়, আওয়ামী লীগ আমলের শেষ দিকে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের বাহিনীর সদস্যরা। তথ্যসূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নিজের আধিপত্য বিস্তারে বড় সাজ্জাদ তার বাহিনীকে তিনটি  জোনে ভাগ করে তিনজনকে নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেন। এর মধ্যে রাউজান   থেকে   বোয়ালখালী পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর বালুমহাল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পায় রায়হান ও তার ২০ জনের টিমের।