দুদক পুনর্গঠন

দুর্নীতি দমনে জনপ্রত্যাশার প্রতিফলন চাই

১৯ আগস্ট ‘প্রাণ ফিরেছে দুদকে’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরের শীর্ষ প্রতিবেদনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পুনর্গঠিত হওয়ার খবরে নতুনভাবে জনপ্রত্যাশা জেগেছে। গত ৩ মার্চ দুদকের শীর্ষ পদগুলোতে পদত্যাগের পর থেকে দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাস দুদক নেতৃত্বহীন ও প্রায় অকার্যকর ছিল। দীর্ঘ ১৬৮ দিন নেতৃত্বের শূন্যতা ও স্থবিরতা কাটিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান চেয়ারম্যান এবং দুই কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া। ১৯ আগস্ট থেকে তারা দুদকে কাজ শুরু করেছেন। নতুন চেয়ারম্যান এবং কমিশনারদের আমরা স্বাগত জানাই এবং একই সঙ্গে প্রত্যাশা রাখি, দুদক কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে জন-আকাক্সক্ষা পূরণে সক্ষম হবে। আমরা জানি, সরকারের নেতৃত্বাধীন দল বিএনপির অন্যতম মূল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল দুর্নীতি দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। দলটি নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির সঙ্গে আপস না করার ঘোষণা দিয়ে দুর্নীতি দমন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা আনার পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিতের অঙ্গীকার করেছিল। দুদককে শক্তিশালী ও কার্যকর করার কথাও বলেছিল।

আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতিত রাজনৈতিক সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে দুদক  অনেক ক্ষেত্রে আশানুরূপ ভূমিকা পালন তো করতে পারেইনি, উপরন্তু কখনো কখনো বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আমাদের এও স্মরণে আছে, প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান ২০১৩ সালে বিদায়কালে বলেছিলেন, ‘দুদক একটি নখদন্তহীন বাঘ’। তার ওই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে  প্রতীয়মান হয়েছিল, দুর্নীতি দমনের লক্ষ্যে গঠিত দুদক কার্যত সাইনবোর্ডসর্বস্ব একটি প্রতিষ্ঠান। এ যেন সেই বহুল প্রচলিত প্রবাদ ‘ঢাল নাই তলোয়ার নাই নিধিরাম সর্দার’-এর মতো। দুদক কাগজে-কলমে স্বাধীন হলেও বাস্তবে অনেক সময় সরকারের প্রভাব বা রাজনৈতিক চাপের কারণে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। বিভিন্ন মামলার শুনানিতে উচ্চ আদালত মন্তব্য করেছে, ‘দুর্নীতি রোধে দুদককে শুধু নামেমাত্র বাঘ বা ঢোঁড়া সাপ হলে চলবে না, সত্যিকারের জাতসাপ বা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।’ দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছিল দুর্নীতি দমন ব্যুরো। পরবর্তী সময় একে আরও স্বাধীন, শক্তিশালী ও কার্যকর করতে দুর্নীতি দমন ব্যুরো বিলুপ্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গঠন করা হলেও কার্যত কাক্সিক্ষত মাত্রায় সুফল মেলেনি।

আরও স্মরণযোগ্য, ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্বরাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) এমএ মতিন দুর্নীতিবাজদের গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে চুনোপুঁটি, রুই-কাতলা ও রাঘববোয়ালের প্রসঙ্গ টানেন। এরপর থেকে দুদককে ঘিরে এ শব্দগুলোর ব্যবহার আরও বেড়েছে। যদি নির্মোহ অবস্থান নিয়ে সব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে দুদুক দুর্নীতিবাজদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে না পারে তাহলে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। আমরা মনে করি, দুদককে সত্যিকার অর্থেই স্বাধীনভাবে কাজের পথ প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতাহীন করার পাশাপাশি মামলা নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া গতিশীল করার বিকল্প নেই। এজন্য পৃথক আদালতের যে তাগিদ রয়েছে তাও গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেওয়া জরুরি। মামলা নিষ্পত্তির হার বাড়াতে তা দরকার। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পাঁচ মাসের মাথায় প্রতিশ্রুতি পূরণ করে দুদকের নেতৃত্ব সংকট কাটালেও দুদক নিয়ে তারা যেন অঙ্গীকারের পূর্ণ বাস্তবায়নে আর কালক্ষেপণ না করে প্রতিষ্ঠানটিকে জনপ্রত্যাশার নাভিকেন্দ্র করতে না পারে তাহলে সব আশাই দুরাশায় পর্যবসিত হবে।

দুদকের নখ, দাঁত আর কবে গজাবে  এমন প্রশ্ন যাতে আর না ওঠে, আমরা তাও চাই। বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে এমন প্রশ্নেরও যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে। উচ্চ আদালত দুদকের প্রতি ইতিপূর্বে অনেকবার সতর্কবার্তা দিয়েছে। আমরা আশা করব, রক্ত বিসর্জন আর প্রাণক্ষয়ের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকার দুদকে জনগণের প্রত্যাশা ও তাদের অঙ্গীকার অনুসারে কাক্সিক্ষত স্তরে নিয়ে যেতে কোনো ঔদাসীন্য দেখাবে না। দুদকের অনেক গর্জন আমরা শুনেছি, কিন্তু সেই অনুপাতে বর্ষণ দেখিনি। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, দুর্নীতি তখনই বন্ধ হবে যখন দায়িত্বশীল সবার দেশপ্রেম বড় হবে। আরও মনে রাখা দরকার, দুর্নীতি অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়, আর ন্যায়কে হত্যা করে।