ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর স্থাপনায়, নিরাপত্তা শুধু তালা-চাবির বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন। অথচ সেই বিমানবন্দরের কাস্টমস গোডাউন থেকে ৫৫ দশমিক ৫১ কেজি স্বর্ণ গায়েব হওয়ার ঘটনায় তদন্তে যে চিত্র উঠে আসছে, তা শুধু চুরির গল্প নয়। বরং এর ভেতরে রয়েছে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক গাফিলতি, দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সম্ভাব্য যোগসাজশ এবং অপরাধ আড়াল করার জন্য সাজানো ‘চুরির নাটক’। মামলার এজাহারে বলা হয়েছিল, ২০২৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাতে গোডাউনের স্টিলের আলমারির লকার ভেঙে দুর্বৃত্তরা ৫৫ দশমিক ৫১ কেজি স্বর্ণ নিয়ে যায়। কিন্তু দীর্ঘ তদন্তের পর, সেই বয়ান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এক রাতের অন্ধকারে এত বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ গায়েব হয়নি। বরং ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ধাপে ধাপে গোডাউনে দায়িত্ব পালনকারী একাধিক কর্মকর্তা ও সিপাহির মাধ্যমে, স্বর্ণ সরিয়ে নেওয়া হতে পারে। এখানেই ঘটনাটি সাধারণ চুরির অভিযোগটি গুরুতর হয়ে ওঠে। কারণ, বাইরে থেকে কেউ তালা ভেঙে স্বর্ণ নিলে, সেটি নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে জব্দ করা স্বর্ণ সরান, পরে ঘটনাকে চুরি হিসেবে উপস্থাপন করেন তাহলে তা প্রতিষ্ঠানের ভেতরের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ৫৫.৫১ কেজি স্বর্ণের হিসাব এতদিন কারও নজরে এলো না কেন? জানা যাচ্ছে, কাস্টমস গোডাউনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সাধারণত ছয় মাস পরপর বদলি করা হয়। ২০২৩ সালের জুনে, দুজন কর্মকর্তা দায়িত্ব নেওয়ার পর, নথিপত্র ও গোডাউনে থাকা পণ্যের মধ্যে অসংগতি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। পরে হিসাব মিলিয়ে দেখা হলে, স্বর্ণে গরমিল ধরা পড়ে। এখানেই প্রশাসনের মৌলিক দুর্বলতা স্পষ্ট। জব্দ মালামাল গোডাউনে বছরের পর বছর পড়ে
থাকবে, অথচ নিয়মিত যাচাই ও নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখার কার্যকর ব্যবস্থা থাকবে না এটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হতে পারে না। বিশেষ করে স্বর্ণের মতো উচ্চমূল্যের সম্পদ। শুধু অর্থমূল্য নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আইন, রাজস্ব, সীমান্তনিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা। স্বর্ণ গায়েবের ঘটনা প্রকাশের পর সন্ধান মিলছে না। তথ্যটি তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তের স্বার্থে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, তদন্তে কোনো ব্যক্তি বা দলের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক কথা নয়। এ ঘটনায় কয়েকজন কর্মকর্তা ও সিপাহিকে গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ডিবি ও পিবিআই তদন্তের পর মামলাটি দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তাধীন হয়েছে। অর্থাৎ ঘটনাটি এখন শুধু ‘স্বর্ণ চুরি’ হিসেবে দেখলে চলবে না এর সঙ্গে দুর্নীতি, দায়িত্বে অবহেলা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও জড়িয়ে গেছে। এখানে আরও একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, যদি কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে জব্দ স্বর্ণ বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানোর প্রক্রিয়া বিলম্বিত করে থাকেন, তাহলে সেই বিলম্বের কারণ কী? জব্দ করা স্বর্ণ আইনগত প্রক্রিয়া শেষে যথাযথ কর্র্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর কথা। কিন্তু সেটি যদি দীর্ঘদিন গোডাউনে পড়ে থাকে, তাহলে সেখানে একটি ‘সুযোগের জানালা’ তৈরি হয়। যত বেশি সময় মূল্যবান সম্পদ অরক্ষিত বা দুর্বল তদারকির মধ্যে থাকে, ততই অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ে। তাই এই ঘটনার তদন্ত শুধু ‘কে স্বর্ণ নিয়েছে’ প্রশ্নে সীমাবদ্ধ
থাকলে চলবে না। জানতে হবে কেন স্বর্ণগুলো দীর্ঘদিন গোডাউনে পড়ে ছিল, কার দায়িত্বে ছিল, নিয়মিত হিসাব কে নিতেন, কতবার শারীরিক যাচাই করা হয়েছে, নথি কে সংরক্ষণ করতেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষ কীভাবে তদারকি করতেন। কারণ একটি চুরির ঘটনায় চোর যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি চুরির সুযোগ তৈরি করে দেওয়া ব্যবস্থাটিও গুরুত্বপূর্ণ। ৫৫ দশমিক ৫১ কেজি স্বর্ণ কোনো ছোটখাটো সম্পদ নয়। একজন কর্মকর্তা কিংবা দুজন কর্মচারীকে দায়ী করে তদন্ত শেষ করে দিলে প্রকৃত দায়ের একটি বড় অংশ আড়ালে থেকে যেতে পারে। আর এখানেই তদন্তকারী সংস্থার সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। তদন্তে যদি প্রমাণিত হয়, একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ধাপে ধাপে স্বর্ণ সরিয়েছেন, তাহলে প্রত্যেকের ভূমিকা আলাদা করে নির্ধারণ করতে হবে। সেখানে যদি দেখা যায় বছরের পর বছর কোটি টাকার সম্পদ শুধু অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে, হিসাব মিলিয়ে দেখা হয় না, বহিরাগত ভুয়া পরিচয়ে কেউ ঢুকে পড়ে আর গরমিল ধরা পড়ার পর ‘চুরির গল্প’ তৈরি হয় তাহলে সমস্যাটি কেবল কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, মূলত সমস্যা কাঠামোগত।
বিমানবন্দরে রক্ষিত স্বর্ণ কোথায় গেল এ প্রশ্নের উত্তর, সঠিক তদন্তের মাধ্যমে বের করতে হবে। অপরাধীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা দরকার। তবে এর চেয়েও বড় প্রশ্ন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ এত দিন অদৃশ্য থাকল কার ইশারায়? এ প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত, ৫৫.৫১ কেজি স্বর্ণ গায়েব রহস্যের সমাধান হবে না। স্বর্ণ উদ্ধার জরুরি। কিন্তু অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা আরও জরুরি। তালা ভাঙার শব্দ এক রাতে শোনা যায়; কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অনিয়মের দরজা খুলে গেলে, তার শব্দ অনেক দিন নীরব থাকে। ৫৫ কেজি স্বর্ণের ঘটনা সেই নীরব শব্দটি আমাদের শুনতে বাধ্য করছে।
লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক
drharun.press@gmail.com