হলদে বউয়ের গল্প

ষোলো বছরেরও বেশি আগের ঘটনা। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য ক্যামেরা হাতে চেম্বার থেকে বের হয়েছি। ফুল-প্রজাপতি-পাখি-প্রাণীর ছবি তুলতে তুলতে একসময় কালো মাথা ও ডানার হলুদ রঙের একটি পাখির পিছু নিলাম। পাখিটি আমার আগে আগে উড়ে এসে একটি আমগাছের ডালে নামল। এরপর ধীরে ধীরে ও সাবধানে হেঁটে হেঁটে আমের একটি সরু দো-ডালার মাঝখানে শুকনো পাতা ও শিকড়-বাকড় দিয়ে বানানো বাসায় বসল। এটি দেখে আমি দ্রুত একটি গাছের আড়ালে চলে গেলাম এবং ওখান থেকে ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারের ভেতর দিয়ে ওর কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করতে থাকলাম।

কিছুক্ষণ পর পাখিটি উড়ে গেলে দূর গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে বাসাটির কাছাকাছি এলাম এবং নিরাপদ দূরত্ব থেকে বাসাটি পর্যবেক্ষণ করলাম। বাসায় একটি ছানা দেখতে পেলাম। দ্রুত দুটি ক্লিক করে সেই স্থান ত্যাগ করলাম। কারণ, অন্য কেউ দেখে ফেললে বাসা ও ছানার ক্ষতি করতে পারে। এমনকি পোষার জন্য ছানাটি নিয়েও যেতে পারে, যদিও এ দেশে এই পাখি পোষা হয় না। বেশ কয়েকদিন আমি ছানাটিকে গাছের আড়াল থেকে পর্যবেক্ষণ করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য, একদিন খবর পেলাম কেউ একজন পোষার জন্য ছানাটিকে নিয়ে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও ছেলেটির খোঁজ পেলাম না। আমার আশঙ্কাই সত্যি হলো। আমি জানি যে ছানাটিকে নিয়ে যাক না কেন, সে ওকে বাঁচাতে পারবে না। শুধু শুধু প্রকৃতির এক সন্তানকে ধ্বংস করল সে।

যাই হোক পরে ২০১৭ সালের ৭ এপ্রিল সকাল ১০টায় মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে একই প্রজাতির একটি পাখিকে ঝাউগাছের দো-ডালায় বানানো বানায় ডিমে তা দিতে দেখলাম। গত ১ মে ২০২৫-এ জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে আরেকটি পাখিকে বাসায় ছানাকে খাওয়াতে দেখলাম। আমার বর্তমান চাকরিস্থল গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হরহামেশাই পাখিটির দেখা পাই।

বাংলাদেশ উন্মুক্ত ও গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মিরপুর জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে দেখা কালো মাথার হলুদ পাখিটি এ দেশের বহুল দৃশ্যমান আবাসিক পাখি হলদে বউ। হলদে পাখি, ইষ্টিকুটুম, কালো মাথা বেনেবৌ, আম পাখি, খোকা হোক ইত্যাদি নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম ইষধপশ-যড়ড়ফবফ বা ইষধপশ-যবধফবফ ঙৎরড়ষব। ওরিওলিডি (ঙৎরড়ষরফধব) গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম ঙৎরড়ষঁং ীধহঃযড়ৎহঁং (ওরিওলাস য্যান্থরনাস)। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাখিটির দেখা মেলে।

এ দেশের পক্ষীপুরাণেও (ইরৎফষড়ৎব) বা লোকগাথায় হলদে বউ পাখি স্থান পেয়েছে। একটি পক্ষীপুরাণ অনুযায়ী, একে নিয়ে একটি বণিক বা ব্যবসায়ী পরিবারের হতভাগী মেয়েকে তার শাশুড়ি নানাভাবে নির্যাতন ও নিপীড়ন করত। মেয়েটি শাশুড়ির অত্যাচার সইতে না পেরে গায়ে হলুদ-বাটা মেয়ে ও মাথায় কালিমাখা মাটির হাঁড়ি দিয়ে ঢেকে আত্মহত্যা করেন। এক দেবী তাকে কালো মাথা হলদে পাখি হিসেবে পুনর্জীবন দান করেন। সে থেকে পাখিটি বাংলা ভাষায় হলদে পাখি বা কালো মাথা বেনেবৌ (বণিকের স্ত্রী) নামে পরিচিতি লাভ করে।

হলদে পাখি লম্বায় ২৩-২৬ সেন্টিমিটার ও ওজনে ৪৬-৮০ গ্রাম হয়ে থাকে। মাথা, গলা, ঘাড় ও চিবুক চকচকে কালো। ডানার প্রান্ত ও লেজের আগার পালকের রঙও একই। দেহের বাদবাকি অংশের পালক উজ্জ্বল সোনালি-হলুদ। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম হলেও স্ত্রীর বর্ণ কিছুটা ফ্যাকাশে। তা ছাড়া পিঠে কিছুটা জলপাই ভাব আছে। স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষ চোখের মনি লাল ও ঠোঁট গোলাপি। পা, পায়ের পাতা ও নখ কালো। অপরিণত পাখির ঠোঁট কালো, চোখের মনি বাদামি ও কপাল হলদেটে। চাঁদি থেকে মাথার দু-পাশে কালচে-বাদামি ওপর হালকা হলদেটে ছিটযুক্ত। গলায় কালোর ওপর হলুদ ডোরা ডোরা দাগ। দেহের বাদবাকি অংশ ফ্যাকাশে হলুদ। 

পুরো দেশের সব ধরনের বন-জঙ্গল, উদ্যান, রাস্তার ধারের গাছপালা, গ্রাম্য ঝোপঝাড়, ফলের বাগান, এমনকি মানুষ কর্তৃক সৃজিত বনেও এদের দেখা যায়। সচরাচর একাকী বা জোড়ায় থাকে। গাছপালা ও ফুলে ফুলে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন রকমের কীটপতঙ্গ, শূককীট, ফল ও ফুলের নির্যাস খুঁজে খায়। অনেক সময় ছোট আকারের সরীসৃপও খেয়ে থাকে। ‘ইষ্টিকুটুম্ব’ বা ‘কিউ-কিউ-কিউ ---’ মধুর স্বরে অথবা ‘ক্যয়াক্’ বা ‘চ্যারর’ কর্কশ স্বরেও ডাকতে পারে।  

মার্চ থেকে আগস্ট প্রজননকাল। গাছের সরু শাখা-প্রশাখার দো-ডালায় শুকনো পাতা, ঘাস, শিকড় ও আঁশ দিয়ে বাটির মতো বাসা বানায়, যা বাতাসে দোল খায়। ডিম পাড়ে তিন থেকে চারটি। গোলাপি-বাদামি, লালচে-বাদামি বা বেগুনি-ধূসর ছিট-ছোপসহ ডিমের রঙ সাদা, গোলাপি সাদা বা ঘিয়ে। ডিম ফোটে ১৩-১৭ দিনে। বাবা-মা মিলেমিশে ডিমে তা দেয় ও ছানাদের খাওয়ায়। প্রায় তিন সপ্তাহ বয়সে ছানারা উড়তে শেখে ও বাসা ছাড়ে। আয়ুষ্কাল ৭-১২ বছর।  

 লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ

আলোকচিত্রের ক্যাপশান :

আলোকচিত্র-১ : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ উদ্যানে একটি পুরুষ কালো মাথা গুধুকা। ছবি- লেখক। 

আলোকচিত্র-২ : ঢাকার পূর্বচলে একটি স্ত্রী কালো মাথা গুধুকা। ছবি- লেখক।