৩ বছর পর নড়েচড়ে বসেছে দুদক, ১৬ কর্মকর্তাকে তলব

নিয়ম ভেঙে ব্যাংকিং সময়ের বাইরে ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর রাতের অন্ধকারে ন্যাশনাল ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ২২ কোটি ৬০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। ঋণ অনুমোদনের মাত্র দেড় ঘণ্টার মধ্যেই ওই অর্থ ছাড় করা হয়েছিল। যে প্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণ নবায়ন করা হয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে ছিল সীমা অতিরিক্ত ঋণগ্রহণ এবং অন্য ব্যাংকে খেলাপি হওয়ার অভিযোগ। আলোচিত ওই লেনদেনের বিষয়ে অনুসন্ধান জোরদার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সম্প্রতি ন্যাশনাল ব্যাংকের ১৬ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে সংস্থাটি। দুদকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, নিয়ম ভেঙে রাতে লেনদেন, ঋণ অনুমোদন এবং অর্থ ছাড়ের পুরো প্রক্রিয়ার বিষয়ে তদন্তে ১৬ কর্মকর্তার বক্তব্য বড় ভূমিকা রাখবে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, মেসার্স ইমপ্যাক্ট কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে রাতের আঁধারে অবৈধভাবে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ অনুসন্ধান করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর গত ২৭ জুলাই দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ১৬ কর্মকর্তাকে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করতে নোটিস করে। নোটিসে ৪ আগস্ট হাজির হতে বলা হয়।

জানা গেছে, দুদকের চিঠি পাওয়ার পর ১৪ কর্মকর্তা দুদকে হাজির হয়ে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ব্যাংকটির দিলকুশা শাখার এসভিপি আশরাফ উদ্দিন আহমেদ, প্রধান কার্যালয়ের কোম্পানি সেক্রেটারি মো. কায়সার রশীদ, গুলশান শাখার ইভিপি ও ব্যবস্থাপক অলোক কুমার বিশ্বাস, বনানী শাখার এসএভিপি ও ম্যানেজার খান মুহাম্মদ মোর্শেদ আজিজ, প্রধান কার্যালয়ের এসএভিপি ও হেড অব আইটি কাজী কামাল উদ্দিন আহমেদ, এসএভিপি হোসাইন আক্তার চৌধুরী, এসএভিপি ও হেড অব আইসিসি মো. মনিরুজ্জামান, এসএভিপি ও হেড অব এইচআরডি শেখ আখতার উদ্দিন আহমেদ, ইভিপি অরুন কুমার হালদার, এসভিপি আশীষ কুমার লস্কর, ভিপি সেলিমা আক্তার, রফিকুর আলম, মুরশেদ কামাল, ইভিপি মুন্সি আবু জাকারিয়া, ভিপি মুনিরুন নেছা। আর অপর দুই কর্মকর্তা এসএভিপি হোসাইন আক্তার চৌধুরী  ও ইভিপি জহিরুল ইসলাম বিদেশে অবস্থান করায় দুদকে হাজির হতে পারেননি। তারা পরবর্তী সময়ে দুদকে হাজির হয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করবেন।

কী ঘটেছিল সেই রাতে : ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৪৭৫তম সভায় ইনফ্রাটেক কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের ঋণ নবায়নের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। প্রস্তাবে উল্লেখ ছিল, প্রতিষ্ঠানটির নামে সীমাতিরিক্ত ৪৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকার ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে। একই সঙ্গে অন্য একটি ব্যাংকে প্রতিষ্ঠানটির ঋণখেলাপি অবস্থায় থাকার তথ্যও উপস্থাপিত হয়েছিল। ঋণ নবায়নের সিদ্ধান্ত হওয়ার পর ওই দিন সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে অনুমোদনের বার্তা গুলশান করপোরেট শাখায় পৌঁছে। এরপর রাত ৮টা ২৩ মিনিট থেকে ৯টা ৪ মিনিটের মধ্যে ইনফ্রাটেক কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের কর্ণধার আলী হায়দার রতনকে ২২ কোটি ৬০ লাখ টাকা নগদ প্রদান করা হয়। বিষয়টি জানতে পেরে ২০২৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠিতে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। চিঠিতে বলা হয়, রাত ৮টার পর নগদ লেনদেন সম্পন্ন করে ব্যাংক কর্মকর্তারা গুরুতর অনিয়ম করেছেন, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

অভিযোগ উঠে, ব্যাংকিং লেনদেনের সময়সূচি হলো সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত। ব্যাংকিং খাতের এত বড় অঙ্কের নগদ অর্থ কর্মঘণ্টার পরে বিতরণের ঘটনা স্বাভাবিক নয়। এ ধরনের লেনদেনে সাধারণত অনুমোদন, নিরাপত্তা, নগদ সংরক্ষণ এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘটনাটি কিছু দিন পর উচ্চ আদালতের নজরে আসে। এরপর ২০২৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট ন্যাশনাল ব্যাংকের গুলশান করপোরেট শাখায় কর্মঘণ্টার বাইরে রাত ৮টার পর ২২ কোটি ৬০ লাখ টাকা লেনদেনের ব্যাখ্যা জানতে শাখা ব্যবস্থাপককে তলব করেন। একই সঙ্গে ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আদালতের ওই নির্দেশনার পরই ঘটনা অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন।

অভিযোগ উঠেছে, ব্যাংকিং খাতে বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন ও অর্থ ছাড় একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ার কথা। বিশেষ করে কোনো গ্রাহকের আর্থিক অবস্থা, পূর্বের ঋণ পরিশোধের ইতিহাস, অন্য ব্যাংকে দায় এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন বিবেচনায় নেওয়া হয়। কিন্তু এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে সীমাতিরিক্ত ঋণ এবং খেলাপির তথ্য থাকার পরও কী বিবেচনায় ঋণ নবায়নের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। অনুমোদনের মাত্র কিছু সময়ের মধ্যেই কীভাবে এত বড় অঙ্কের নগদ অর্থ ছাড় করা হলো। কর্মঘণ্টা শেষ হওয়ার পর ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হয়েছিল। সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোন কোন কর্মকর্তা কী ভূমিকা পালন করেছেন। এসব বিষয় তদন্ত করে দেখবে দুদক।

দুদকের তথ্যমতে, অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ঋণ নবায়নের সিদ্ধান্ত, অনুমোদন প্রক্রিয়া, নগদ অর্থ ছাড়ের নির্দেশ এবং বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে। যদি অনুসন্ধানে কোনো ধরনের অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার বা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে গত এক দশকে অনিয়মিত ঋণ, খেলাপি ঋণ এবং করপোরেট ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় কেবল অর্থ ছাড়ের বৈধতা নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ধাপের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি। রাতের বেলায় বড় অঙ্কের নগদ অর্থ বিতরণের মতো ঘটনা অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং করপোরেট সুশাসন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করে। তাই এ অনুসন্ধানের ফল শুধু একটি নির্দিষ্ট ঘটনার দায় নির্ধারণেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দেশের ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হতে পারে।