আন্তর্জাতিক আকাশপথে যাত্রী সেবার আড়ালে একশ্রেণির কেবিন ক্রু ও বিমানকর্মীদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী অপরাধী সিন্ডিকেট। সিভিল এভিয়েশন, আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে পাচার করা হচ্ছে বিদেশি মুদ্রা ও সোনা। বিমানের ফ্লাইট ডেক, ক্রু, প্রসাধন কক্ষ ও ক্রুদের জন্য নির্ধারিত আন্তর্জাতিক প্রটোকল ব্যবহার করে পরিচালিত চোরাচালান চক্রের লাগাম টানতে সম্প্রতি জোরদার করা হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি ও অভ্যন্তরীণ তদন্ত। তদন্তের জালে অনেক কেবিন ক্রু আটকে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে অনেকের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।
ইতিমধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কেবিন ক্রুদের একাংশের বিরুদ্ধে বিদেশি ভাতা হুন্ডির মাধ্যমে দেশে আনার অভিযোগ উঠেছে। এতে দেশ হারাচ্ছে বড় অঙ্কের বিদেশি মুদ্রা। বিষয়টি তদন্ত করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ বিভাগ ও পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট। এরই মধ্যে এই ঘটনায় এয়ারলাইন্সটির শীর্ষ এক কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছে। এদিকে, নানা অভিযোগের কারণে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পদোন্নতি বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, বিগত কয়েক বছরে শাহজালালসহ দেশের সবকটি বিমানবন্দরে বেশির ভাগ এয়ারলাইনসের কেবিন ক্রুদের সোনা ও মুদ্রা পাচারের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। ক্রুদের বিশেষ ড্রেস কোডের সুযোগ নিয়ে কোট ও প্যান্টের ভেতরের স্তরে তরল সোনা বা পেস্ট আকারে সোনা বহন করা হলেও আর্চওয়ে বা কম ক্ষমতাসম্পন্ন মেটাল ডিটেক্টরে তা ধরা পড়ছে না। পাচার প্রক্রিয়ার সমন্বয়ের জন্য টেলিগ্রাম, সিগন্যাল বা হোয়াটসঅ্যাপের মতো এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করা হয়। সোনার চালান বা মুদ্রা কোথায় হস্তান্তর হবে, তার জন্য নির্দিষ্ট সাংকেতিক নোটেরও প্রমাণ পেয়েছে পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট।
ট্রানজিট এলাকায় বাধাহীন চলাফেরা : পুলিশের ইউনিটর একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, চোরাচালান সিন্ডিকেটগুলো সাধারণ যাত্রীদের চেয়ে কেবিন ক্রুদের প্রধান ‘ক্যারিয়ার’ হিসেবে বেছে নিচ্ছে। কারণ বিমানকর্মীদের জন্য আলাদা ফাস্ট-ট্র্যাক ডিপার্চার ও এরাইভাল চ্যানেল থাকে, যেখানে অন-ডিউটি থাকার কারণে যাত্রীদের মতো তাদের দীর্ঘ তল্লাশির মুখোমুখি হতে হয় না। বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক ট্রানজিট এলাকায় বাধাহীন কেবিন ক্রুরা চলাফেরা করতে পারেন, যা মুদ্রা বা সোনা হাত-বদলের সবচেয়ে নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একই রুটে বারবার ডিউটি করায় বিমানবন্দরে দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপত্তাকর্মীদের একাংশের সঙ্গে তাদের ‘সখ্য’ও গড়ে ওঠে। ফলে পারাপারে সহায়ক হচ্ছে। সার্বিক বিষয়ে জানতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এমডি ও সিইও কাইজার সোহেলের সঙ্গে কয়েক দফা যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
ক্রুদের দিরহামের চেক নিয়ে তোলপাড় : পুলিশ সূত্র জানায়, গত ১৪ মে জনতা ব্যাংকের দুবাই শাখা থেকে ১৯৬ জন কেবিন ক্রু ওভারসিজ অ্যালাওয়েন্স বিলের বিপরীতে সাড়ে ১৩ লাখ দিরহাম একটি চেকের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়। চেকটি ইস্যু করা হয়েছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট স্টুয়ার্ড আব্দুস শাকুর মুজাহিদের নামে। পরদিন বিমানের (বিজি-২৪৮) ফ্লাইটে দুবাই থেকে ঢাকায় ফেরেন মুজাহিদসহ সংশ্লিষ্ট কেবিন ক্রুরা। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিমানবন্দরে তাদের লাগেজ তল্লাশি চালিয়ে প্রায় ২৬ লাখ টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা উদ্ধার করা হয়। তবে চেকে উত্তোলন করা দিরহামের মধ্যে সাড়ে ১২ লাখ দিরহামের কোনো হিসাব মেলেনি।
পুলিশের অপর একটি সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে কেবিন ক্রুদের বিদেশি ভাতা প্রত্যেকের নামে চেকের মাধ্যমে উত্তোলন করা হতো। কিন্তু গত মে মাসে তার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ১৯টি ওভারসিজ অ্যালাউন্স বিলের বিপরীতে মোট ১৩ লাখ ৪৬ হাজার ৮৪৭ দিরহাম (বাংলাদেশি টাকা সাড়ে ৪ কোটি) একটি চেকের মাধ্যমে উত্তোলনের অনুমোদন দেওয়া হয়। এই নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন অনিয়ম হিসেবে দেখ হয়নি। বরং আর্থিক ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত দুর্বলতার ফল হিসেবে বলা হয়েছে। এই ঘটনায় অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে বিমান। তদন্তের আওতায় এসেছে অর্থ পরিচালক, দুবাই স্টেশনের অর্থ ব্যবস্থাপক, সংশ্লিষ্ট মানি এক্সচেঞ্জ ও সম্ভাব্য হুন্ডি চক্রের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি। এই ঘটনার মধ্যেই গত ১৯ মে মিজানুর রশীদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। অবশ্য বরখাস্তের আদেশে কারণ উল্লেখ করা হয়নি চিঠিতে।
যেভাবে পৌঁছানো হয় অর্থ : নাম প্রকাশ না করে পুুলিশের একটি সংস্থার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, উত্তোলনের বাকি অংশ একটি হুন্ডি চক্রের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে দেশে থাকা ওই চক্রের একজন এজেন্ট সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কেবিন ক্রুর কাছে সমপরিমাণ অর্থ পৌঁছে দেন। পুরো চক্রের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাদের নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও অভিযোগ আছে ওই চক্রটির বিরুদ্ধে। গত ২২ এগ্রিল ১৬০ জন কেবিন ক্রু ওভারসিজ অ্যালায়েন্সের বিল ফ্লাইট স্টুয়ার্ড ইফতেখার আলমের নামে ইস্যু করা হয়েছিল। ৯ লাখ ৭৫ হাজার দিরহামের ওই বিলশিট প্রস্তুত করা হয় বাংলাদেশ বিমান কেবিন ক্রু ইউনিয়নের নামে। অভিযোগ আছে, ইউনিয়নের কয়েকজন নেতার ইন্ধনে ক্রুদের ভাতা একটি চেকের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়। পরে হুন্ডির মাধ্যমে সেই অর্থ দেশে এনে ইউনিয়নের কার্যালয় থেকে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
অপরাধ করেও দায়মুক্তি : অভিযোগ রয়েছে, কেবিন ক্রুরা চোরাচালানসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ায় এয়ারলাইনসের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। তারা বেশি আয়ের লোভে গুরুতর এ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। কিন্তু আটকের পর তাদের বিরুদ্ধে থানায় কোনো মামলা হয় না। কাস্টমস কর্মকর্তারা সোনা জব্দ করে শুধু বিমানে একটি চিঠি দিয়ে বিষয়টি অবগত করেন। পরে বিমান প্রাথমিক তদন্ত করে সত্যতা মিললে বিভাগীয় মামলা করে। এ ছাড়া অভিযুক্তদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে নামমাত্র শাস্তি দিয়ে অভিযুক্তদের দায়মুক্তি দিয়ে পুনরায় কাজে যোগদানের অনুমতি দিচ্ছে সংস্থাগুলো। এ ছাড়া অনেকের বিরুদ্ধে চোরাচালানেরও অভিযোগ আছে।
বছর পাঁচেক আগে শাহজালালে ১১ কেজি স্বর্ণসহ বিমানের ফ্লাইট এটেন্ডেন্ট রোকেয়া খাতুন আটক হয়েছিলেন। ২০২৩ সালের জুনে সাতটি সোনার বার নিয়ে ঢাকায় ফেরার সময় সৌদির কিং আব্দুল আজিজ বিমানবন্দরে আটক হন বিমানের কেবিন ক্রু জিয়াউল হাসান। তখন তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এ ঘটনায় বিমানের সহকারী ব্যবস্থাপক (নিরাপত্তা) মাছুদুল হাছান বাদী হয়ে বিমানবন্দর থানায় একটি মামলাও করেন। ২০২৪ সালের ৬ অক্টোবর সোনার বারসহ শাহজালালে ধরা পড়েন কেবির ক্রু সাদিয়া খানম। পরদিন তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিমান।
লেনদেন খতিয়ে দেখার সুপারিশ : পুলিশের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান বিমানবন্দরগুলো (দুবাই ও দোহা) থেকে ক্রুদের বিশেষ নজরদারির আওতায় আনতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে সন্দেহভাজন কেবিন ক্রু ও তাদের পরিবারের অস্বাভাবিক ব্যাংক লেনদেন এবং সম্পদের হিসাব পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে। ক্রুদের ডিউটি শেষে বের হওয়ার সময় বা যেকোনো সময় আকস্মিকভাবে পূর্ণাঙ্গ বডিস্ক্যান ও লাগেজ তল্লাশির আওতায় আনতে হবে।
পদোন্নতি বন্ধ থাকায় অনেকেই বিপাকে : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে পদোন্নতি নিয়ে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় পদোন্নতি হঠাৎ বন্ধ রাখা হয়েছে। এই নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই বলেছেন, পদোন্নতি বন্ধ রাখা হঠকারিতা। গত ৩ আগস্ট জারি করা মন্ত্রণালয়ের এ সংক্রান্ত চিঠিতে বলা হয়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রকৌশল শাখার গ্রুপ-৫ ও গ্রুপ-৬ পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়ম, বিধি লঙ্ঘন ও প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যোগ্যতার পরিবর্তে পছন্দের কর্মকর্তাদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থেই উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।
এই প্রসঙ্গে বিমানের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনেক দিন ধরেই পদোন্নতি নিয়ে প্রশ্ন ছিল। যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার চেয়ে কার সঙ্গে কার সম্পর্ক ভালো, সেটিই বড় বিবেচ্য হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে বিভাগটিতে নিয়মবহির্ভূতভাবে পদোন্নতি, প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে একটি চক্র প্রভাব বিস্তার করে আসছে। বর্তমান সিদ্ধান্তে ভালো কর্মকর্তারাও পদোন্নতি পাচ্ছেন না। আশা করব, মন্ত্রণালয় দ্রুত বিষয়টি সমাধান করবে।