আঠারো মাস কর্মস্থলে অনুপস্থিত বন কর্মকর্তা, কার্যালয় তালাবদ্ধ

খুলনার কয়রা উপজেলা সামাজিক বনায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে মাসের পর মাস ধরে তালা ঝুলছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়মিত কর্মস্থলে থাকেন না এবং উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সভা ও সমন্বয় সভাতেও তাঁকে দেখা যায় না—এমন অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা ও একাধিক সরকারি কর্মকর্তার। এতে সামাজিক বনায়ন বিভাগের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

গত এক মাসে একাধিকবার কার্যালয়টিতে গিয়ে মূল ফটকে তালা ঝুলতে দেখা গেছে। বন বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজে কার্যালয়ে এসে ফিরে যেতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা সামাজিক বনায়ন কর্মকর্তা মো. জহিরুল হক ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি কয়রায় যোগ দেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, যোগদানের পর থেকেই তিনি কোনো দিনই নিয়মিত কর্মস্থলে ছিলেন না। তিনি খুলনায় অবস্থান করেন বলে তাঁদের দাবি।

উপজেলার একজন সরকারি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চাকরিজীবনে কয়রায় ওই কর্মকর্তাকে মাত্র দুই-তিন দিন দেখেছেন। উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সভা ও বৈঠকেও তিনি নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল্লাহ আল বাকি বলেন, বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর কখনো দেখা হয়নি। উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সভা ও মিটিংয়েও তাঁকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায় না। তিনি ঠিকমতো অফিস করেন না—এমন কথাও তিনি শুনেছেন।

তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত ওই কর্মকর্তাকে কোনো শোকজ বা অফিসিয়াল চিঠি দেওয়া হয়নি বলে জানান ইউএনও।

সরেজমিনে উপজেলা পরিষদ চত্বরে অবস্থিত সামাজিক বনায়ন কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, টিনশেডের ছোট দুটি কক্ষের কার্যালয়টিতে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রও নেই। একটি কক্ষে একটি ফ্যান থাকলেও টেবিল-চেয়ারসহ প্রয়োজনীয় অফিস সরঞ্জাম চোখে পড়েনি। সেখানে প্ল্যান্টেশন মালী জামাল হোসেনকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। তিনি কার্যালয়ের ভেতরে খালি গায়ে দুপুরের জন্য রান্না করছিলেন। তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানও সেখানে অবস্থান করছিলেন। কার্যালয়ে যাতায়াতের জন্যও নির্দিষ্ট কোনো চলাচলের পথ নেই।

জামাল হোসেন বলেন, ‘স্যার আমার কলও রিসিভ করেন না। হাজারবার কল দিলেও রিসিভ করেন না। তবে তাঁর প্রয়োজন হলে তিনি আমার সঙ্গে কথা বলেন।’

কার্যালয়ে পরিবার নিয়ে থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন বাড়িতে যেতে পারেন না। তাই স্ত্রী ও দুই সন্তান তাঁকে দেখতে এসেছেন।

অফিস বন্ধ থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, দিনের বেশির ভাগ সময় তিনি পাশের আদালত ভবনে অফিসের কাজে থাকেন। কেউ কার্যালয়ে আসছেন—এমন খবর পেলে তিনি দ্রুত সেখানে চলে আসেন। তবে অনেক সময় তাঁর আসতে দেরি হওয়ায় লোকজন অপেক্ষা না করে চলে যান বলে জানান তিনি।

সম্প্রতি কয়রায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজের সময় নদীতীরবর্তী চর ও বাঁধের ঢালে জন্মানো বিভিন্ন গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, সামাজিক বন বিভাগের কার্যকর তদারকি না থাকায় সামাজিক বনায়নের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অবৈধ করাতকল নিয়েও স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের দাবি, এসব বিষয়ে বন বিভাগের কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

উপজেলা সদরের যুবক আসলাম হোসেন শাহীন বলেন, জরুরি একটি বিষয়ে বন কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে কার্যালয় বন্ধ পান। ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তিনি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে পারেননি।

খুলনা সামাজিক বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক সুপ্রিয়া হুই বলেন, ‘শুনেছি, তিনি অফিস করেন না। বিষয়টি আমি কয়েকবার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানিয়েছি। তাঁকে ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেন না। আমি তাঁকে বারবার কর্মস্থলে থাকার জন্য বলেছি। এরপরও তিনি কথা না শুনলে আমার কী করার আছে?’

অফিসে চেয়ার-টেবিল না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ জন্য বরাদ্দ নেই। বরাদ্দ পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে চেয়ার-টেবিলের ব্যবস্থা করা হবে।’

কর্মস্থলে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকার অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা সামাজিক বনায়ন কর্মকর্তা মো. জহিরুল হকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। গত এক মাসে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

উপকূলীয় অঞ্চলের জলবায়ু, পরিবেশ ও বন রক্ষায় কাজ করা সুন্দরবন ইকো-রিজিলিয়েন্স ইনিশিয়েটিভের সমন্বয়ক হাফিজুর রহমান মিস্ত্রী বলেন, উপকূলীয় কয়রায় সামাজিক বনায়ন ও পরিবেশ রক্ষায় বন বিভাগের কার্যকর উপস্থিতি জরুরি। সরকারি কার্যালয় নিয়মিত খোলা রাখা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

এদিকে, দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগের পরও কেন এখন পর্যন্ত কোনো অফিসিয়াল ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—সে প্রশ্ন উঠেছে। ইউএনওর ভাষ্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে এখনো কোনো শোকজ বা অফিসিয়াল চিঠি দেওয়া হয়নি।