দিনভর নির্ভার হাস্যোজ্জ্বল

ঠাকুরগাঁওয়ে তৃণমূল থেকে রাজনীতি শুরু করা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় শপথগ্রহণের মাধ্যমে শুরু হবে তার বঙ্গভবন জীবনের অধ্যায়। সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে তিনি বলেছেন, স্বপ্নের সুখী, সমৃদ্ধ ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের জন্য কাজ করে যেতে চান।

নির্বাচনের আগের দিন গত বুধবার সরকারি দলের সংসদীয় কমিটির সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি পদে ভোটগ্রহণের পুরোটা সময় ছিলেন হাস্যোজ্জ্বল।

সংসদ শুরুর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সংসদ কক্ষে প্রবেশ করেন মির্জা ফখরুল। বসেন সংসদে প্রধানমন্ত্রীর পাশের চেয়ারে। তিন ঘণ্টা ভোটগ্রহণের সময় বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। এছাড়া পাশের আসনে বসা অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলতে দেখা গেছে। সংসদ সদস্যরা ভোট দিয়ে এসে মির্জা ফখরুলের সঙ্গে করমর্দন ও কুশল বিনিময় করেন।

নিজের ভোট দেওয়ার পর মির্জা ফখরুল সরাসরি চলে যান বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের আসনের দিকে। একে একে প্রথম সারির সব নেতার সঙ্গে করমর্দন করেন। সর্বশেষ বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে করমর্দন ও কুশল বিনিময় করেন। এরপর ফিরে এসে নির্ধারিত চেয়ারে বসেন। বেলা ৩টার পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংসদ কক্ষ থেকে বের হলেও ৪টার পরে আবার সংসদ কক্ষে আসেন মির্জা ফখরুল। বিকেল ৫টা ২৫ মিনিটে সিইসি ভোটের ফল ঘোষণা করলে সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে নতুন রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানান। তাকে গোলাপ ফুল উপহার দিয়ে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান।

নির্বাচনের আগে দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের দীর্ঘ সংগ্রামে আমি তাদের পাশে ছিলাম, সুখে-দুঃখে তাদের কাছে ছিলাম। গণমাধ্যমসহ সব শ্রেণি পেশার মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই, বিএনপির চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি। আমি মনে করি, তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রত্যাশিত গন্তব্যে পৌঁছাবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘অনেক কিছু মিস করব, যা স্মরণ করে নিজের আবেগকে ধরে রাখতে পারিনি। সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করি সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, নিরাপদে থাকুন, কল্যাণমুখী রাষ্ট্র নির্মাণে সবাই সরকারকে সহযোগিতা করুন।’

তিনি বলেন, ‘আজকের দিনে যাকে আমার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে, যিনি আমর মন কাঁদান তিনি হলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এই মহীয়সী নারীনেত্রী, প্রথম নারী মুক্তিযোদ্ধার আমি সান্নিধ্য পেয়েছি, স্নেহ পেয়েছি।’

সুখী-সমৃদ্ধ নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমি এমন একটি বাংলাদেশের প্রত্যাশা করছি, যা আমি মনে মনে স্বপ্ন দেখছি। তা হলো একটি সুখী, সমৃদ্ধ, কল্যাণমুখী রাষ্ট্র। এমন একটি দেশ যেখানে প্রান্তিক মানুষ, খেটে খাওয়া জনগোষ্ঠী, শ্রমজীবীরা দুই বেলা পেট ভরে খেতে পারবে। তারা সুস্থ পরিবেশে বসবাস করতে পারবে, নিরাপদে-নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করতে পারবে। আমাদের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান হবে। আমাদের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী সমাজের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।’

নির্বাচনের পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমান উল্লাহ আমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সুনাম রয়েছে। অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি সফল হবেন এই প্রত্যাশা আমাদের সবার। সংসদে আমরা তাকে মিস করব।’

বাম ঘরানার ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভাসানী ন্যাপ দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে আসনে। পরে যোগ দেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গঠন করা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিতে। দীর্ঘ পরিক্রমায় তার ওপরই বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব দেন প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন তিনি। সবশেষ তারেক রহমানের মন্ত্রিসভার সদস্যও হন মির্জা ফখরুল।

শুভেচ্ছা-অভিনন্দনে সিক্ত মির্জা ফখরুল : বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় শুভেচ্ছা ও অভিনন্দনে সিক্ত হচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর বিভিন্ন দেশের দূতাবাস, সংসদে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ আরও অনেকে অভিনন্দন জানান।

জামায়াত আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, জনগণের অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধান ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখা, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন। বিশেষ করে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠায় তিনি সচেষ্ট থাকবেন।’

নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘একজন শিক্ষাবিদ, অভিজ্ঞ রাজনীতিক ও সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে তার এই নতুন দায়িত্ব গ্রহণ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটির মর্যাদা আরও সমুন্নত করবে। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আরও সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক পথে এগিয়ে যাবেএই প্রত্যাশা রাখি।’

মির্জা ফখরুলকে অভিনন্দন জানিয়ে পারস্পরিক স্বার্থে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদারে ঢাকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে চীন। গতকাল বিকেলে চীনা দূতাবাস এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় মহামান্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আন্তরিক অভিনন্দন। চীন বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও এগিয়ে নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে প্রস্তুত।’ নতুন যুগে যৌথভাবে বাংলাদেশ-চীন অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্প্রদায় গড়ে তোলার আগ্রহও প্রকাশ করে বেইজিং বলেছে, ‘এ ধরনের সহযোগিতা দুই দেশ ও দুই দেশের জনগণের জন্য আরও বেশি সুফল বয়ে আনবে।’

শুভেচ্ছা জানিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে তার (মির্জা ফখরুল) এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অগ্রযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও দেশপ্রেম রাষ্ট্রপতির মহান দায়িত্ব পালনে তাকে সহায়তা করবে। নতুন রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে দেশের সংবিধান, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার আরও সুদৃঢ় ও সমুন্নত হবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’