সবুজ-হলুদের স্বপ্ন

খালের বুকজুড়ে সারি সারি নৌকা, আর তাতে সাজানো তাজা সবুজ-হলুদ পেয়ারা। সূর্যের আলোয় দূর থেকে মনে হয় যেন এক বিশাল রঙিন ক্যানভাস। পেয়ারার মৌসুমে পিরোজপুরের নেছারাবাদের আটঘর-কুড়িয়ানার ভাসমান হাটে দেখা মেলে এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের। সন্ধ্যা নদীর শাখা খাল ঘিরে গড়ে ওঠা এ হাটে ভোর থেকেই শুরু হয় চাষি ও পাইকারদের কর্মচাঞ্চল্য। আটঘর-কুড়িয়ানা, আদমকাঠি, জিন্দাকাঠিসহ আশপাশের গ্রামের চাষিরা ছোট ডিঙি নৌকায় বাগান থেকে পেয়ারা নিয়ে আসেন, আর পাইকাররা তা কিনে ট্রলারে করে পাঠিয়ে দেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এই ভাসমান হাট এখন শুধু কৃষিপণ্য কেনাবেচার কেন্দ্রই নয়, পর্যটকদের জন্যও এক দারুণ আকর্ষণ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে কেনাবেচা, সেই সঙ্গে মুখরিত হয়ে ওঠে স্থানীয় অর্থনীতি ও পর্যটন।

পেয়ারার আকার, স্বাদ ও মান ভালো হওয়ায় নেছারাবাদের পেয়ারার চাহিদা রয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। পদ্মা সেতু চালুর পর যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হওয়ায় এ অঞ্চলের পেয়ারার বাজার আরও বিস্তৃত হয়েছে। কৃষক দ্রুত পণ্য বাজারজাত করতে পারছেন, আর ব্যবসায়ীরাও কম সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পেয়ারা পাঠাতে পারছেন। পেয়ারা চাষি ও ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে হাটে প্রতিদিন শত শত মণ পেয়ারা কেনাবেচা হচ্ছে। প্রতি মণ পেয়ারা ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। তবে উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে দাম কমবেশি হয়।

বাগেরহাটের সাইনবোর্ড বাজার থেকে পেয়ারা কিনতে আসা ৭৫ বছর বয়সী ব্যবসায়ী ইব্রাহিম মোল্লা বলেন, ‘স্বাধীনের আগ থেকে আমি এই এলাকার পেয়ারা কিনে বাজারে বিক্রি করছি। এ এলাকার পেয়ারার স্বাদ ও মান খুব ভালো। বাংলাদেশে এমন পেয়ারা আর কোথাও হয় না।’ সুযোগ তৈরি হয়েছে তাই পেয়ারা আহরণ, পরিবহন, নৌকা চালানো, বাগান পরিচর্যা, প্যাকেজিং ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন অনেক মানুষ। বিশেষ করে মৌসুমে স্থানীয় যুবকদের একটি অংশ পেয়ারা পরিবহন ও বেচাকেনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আয় করছেন। পেয়ারার হাটকে ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনাও বাড়ছে। স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন পার্ক ও বিনোদনকেন্দ্র। পর্যটকদের আনাগোনায় জমজমাট হয়ে উঠেছে হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো। স্থানীয় খাবারের মধ্যে সরষে ইলিশ, ইলিশভর্তা, চিংড়ি ভুনা ও হাঁসের মাংস পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে পেয়ারা বাণিজ্যের পাশাপাশি পর্যটননির্ভর অর্থনীতিও গড়ে উঠছে।

নেছারাবাদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমিত দত্ত বলেন, উপজেলার পর্যটনব্যবস্থাকে আরও আকর্ষণীয় করতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের থাকা, খাওয়া ও সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার বিষয়েও কাজ করা হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, পিরোজপুর জেলার মধ্যে নেছারাবাদেই সবচেয়ে বেশি পেয়ারা চাষ হয়। জেলায় প্রায় ৭১০ হেক্টর জমিতে পেয়ারা আবাদ হচ্ছে। উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৭ হাজার ২১০ মেট্রিক টন। প্রতি মৌসুমে এই পেয়ারা হাটে ২০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের পেয়ারা কেনাবেচা হয়। তবে সংরক্ষণব্যবস্থার অভাব এখানকার বড় সমস্যা। পচনশীল ফল হওয়ায় পেয়ারা দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় না। ফলে মৌসুমে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পেয়ারা বাজারে ওঠায় অনেক সময় কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করেন।

চাষিদের দাবি, আটঘর-কুড়িয়ানায় একটি মিনি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ করা হলে মৌসুমে অতিরিক্ত উৎপাদিত পেয়ারা সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এতে কৃষককে কম দামে পেয়ারা বিক্রি করতে হবে না, বাজারে সরবরাহও নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। পাশাপাশি পেয়ারা চাষে কৃষকদের আগ্রহ আরও বাড়বে।