দেশীয় চলচ্চিত্রের নায়করাজ বলে খ্যাতি অর্জন করা অভিনেতা-নির্মাতা রাজ্জাক এবং বরেণ্য পরিচালক ও অভিনেতা আবদুল্লাহ আল মামুনের প্রয়াণদিবস আজ। রাজ্জাকের ৯ম আর আবদুল্লাহ আল মামুনের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। তবে বরেণ্য এই দুই শিল্পীর স্মরণে আহামরি কোনো আয়োজন নেই। নায়করাজের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পরিবারের পক্ষ থেকে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। তবে চলচ্চিত্রের সংঠগনগুলো নায়করাজ রাজ্জাকের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ঢালিউডের পাশাপাশি কলকাতা ও উর্দু চলচ্চিত্রেও ছিল নায়করাজ রাজ্জাকের ব্যাপক জনপ্রিয়তা। প্রায় অর্ধশত বছরের ক্যারিয়ারের পুরোটা সময় তিনি কাটিয়েছেন চলচ্চিত্রের মধ্যদিয়ে।
২০১৭ সালের আজকের দিনে (২১ আগস্ট) পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে পরপারে চলে যান নায়করাজ। ১৯৪২ সালে পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার টালিগঞ্জে ২৩ জানুয়ারি জন্ম তার। তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনে ‘ঘরোয়া’ শিরোনামে এক ধারাবাহিক নাটক দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু হয় তার। এরপর সুযোগ পান আব্দুল জব্বার খানের সঙ্গে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার। পরবর্তী সময়ে ‘১৩ নাম্বার ফেকু ওস্তাগার লেন’ সিনেমায় ছোট একটি চরিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় তার পথচলা শুরু। প্রথম সুযোগেই সবার মন জয় করে নেন নায়করাজ।
সুযোগ আসে অভিনয়ের ‘কার বউ’, ‘ডাক বাবু’, ‘আখেরি স্টেশন’-এর মতো কয়েকটি সিনেমায়। জহির রায়হানের হাত ধরে নায়ক হিসেবে যাত্রা শুরু হয় নায়করাজ রাজ্জাকের। সিনেমার নাম ‘বেহুলা’। যেখানে তার বিপরীতে জুটি বেঁধেছিলেন কোহিনূর আক্তার সুচন্দা। এরপর এই জুটিকে আরও কয়েকটি সিনেমায় দেখা যায় পর পর। নায়ক হিসেবে সফলতার পর প্রযোজক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন নায়করাজ। ‘রংবাজ’ শিরোনামে সিনেমাটি পরিচালনা করেন জহিরুল হক। নায়করাজ রাজ্জাকের অভিনীত সিনেমার সংখ্যা প্রায় ৩০০। এ ছাড়া পরিচালনা করেছেন প্রায় ১৬টি সিনেমা। ১৯৭৭ সালে মুক্তি পায় নায়করাজ পরিচালিত প্রথম সিনেমা ‘অনন্ত প্রেম’। পরিচালনার পাশাপাশি সিনেমায় অভিনয়ও করেছিলেন রাজ্জাক। বিপরীতে ছিলেন ববিতা। মৃত্যুর দুই বছর আগে ২০১৫ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন নায়করাজ রাজ্জাক। এ ছাড়া ১৯৭৬, ১৯৭৮, ১৯৮২, ১৯৮৪ ও ১৯৮৮ সালে তিনি মোট পাঁচবার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।
২০১৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাকে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার দেওয়া হয়। নায়করাজ রাজ্জাকের ছোট ছেলে খালিদ হোসেন সম্রাট বলেন,‘ আব্বা ছাড়া দেখতে দেখতে নয়টি বছর চলে গেল। যেহেতু নায়করাজ আমার বাবা, তাই পারিবারিকভাবে আব্বাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। কিন্তু এর বাইরে চলচ্চিত্র পরিবার বা ইন্ডাস্ট্রি আব্বাকে মনে করল কি করল না, সেটা নিয়ে আগে মন খারাপ হতো, এখন আর এসব নিয়ে ভাবি না আসলে। আমরা শুধু আব্বার জন্য সবার কাছে দোয়া চাই। আমি বিশ্বাস করি, আব্বা বেঁচে থাকবেন যুগের পর যুগ তার ভক্ত-দর্শকের হৃদয়ে।
অন্যদিকে অভিনেতা, নাট্যকার, নির্দেশক, চলচ্চিত্র পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন পরপারে পাড়ি জমান ২০০৮ ২১ আগস্ট। আবদুল্লাহ আল মামুন ১৯৪২ সালের ১৩ জুলাই জামালপুরের আমড়াপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। নিজের মৌলিক নাটক নির্দেশনার পাশাপাশি অভিনয় করেছেন তিনি। উইলিয়ম শেক্সপিয়রের নাটক বাংলায় অনূদিত হলে তারও নির্দেশনা দিয়েছেন আবদুল্লাহ আল মামুন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে রচিত নাটকের সার্থক মঞ্চায়নও করেছেন তিনি।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মৌলিক ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ কাব্যনাটকের নির্দেশক ছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন। তার রচিত ও নির্দেশিত নাটকে বাংলাদেশের সমসাময়িক পারিবারিক, সামাজিক এবং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিচিত্র পেশাজীবী মানুষের কথা উঠে এসেছে। তার রচিত ও নির্দেশিত নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘সুবচন নির্বাসনে’, ‘এখনও দুঃসময়’, ‘ক্রস রোডে ক্রসফায়ার’, ‘তৃতীয় পুরুষ’, ‘কোকিলারা (১৯৯০)’, ‘দ্যাশের মানুষ’, ‘মেরাজ ফকিরের মা’ ইত্যাদি।
টিভি প্রযোজক, চলচ্চিত্রকার, নাট্যশিক্ষক, ঔপন্যাসিক ও সংগঠক হিসেবেও তার অসামান্য খ্যাতি রয়েছে। অসংখ্য নাটক রচনা ছাড়াও আবদুল্লাহ আল মামুন সাতটি উপন্যাস রচনা করেছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনে আবদুল্লাহ আল মামুনই প্রথম ধারাবাহিক নাটক পরিচালনা করেন। তার পরিচালিত ধারাবাহিক নাটকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘সংশপ্তক’, ‘আমি তুমি সে’, ‘পাথর সময়’, ‘জোয়ার ভাটা’, ‘শীর্ষবিন্দু’, ‘উত্তরাধিকার’। ‘সারেং বউ’, ‘সখী তুমি কার’, ‘এখনই সময়’, ‘দুই জীবন’, ‘দমকা’সহ বেশকয়েকটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন তিনি। আবদুল্লাহ আল মামুন তার নাট্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৯ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ২০০০ সালে একুশে পদক লাভ করেন। চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দুবার সেরা পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।