এক রণতরী সরাতেই কেন এতটা চিন্তিত এশিয়া?

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ষষ্ঠ মাসে গড়ালেও মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের সামরিক শক্তি বাড়ানোর জেরে এশিয়া মহাদেশে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি দৃশ্যমানভাবে কমে আসছে। অঞ্চলে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীনকে ঠেকাতে আমেরিকার এই নীতিগত পরিবর্তন ও সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ায় এশিয়ার মার্কিন মিত্রদেশগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। খবর আলজাজিরার।

মার্কিন সিদ্ধান্তের সাম্প্রতিক সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রভাব পড়েছে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তাদের মূল শক্তির স্তম্ভের ওপর। সম্প্রতি জাপান থেকে এই অঞ্চলের একমাত্র বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন’কে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। টানা ৯ মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর স্থলাভিষিক্ত করতেই মূলত এটি পাঠানো হয়েছে। খবর পাওয়া গেছে, আব্রাহাম লিংকন রণতরীতে তীব্র খাবার সংকটসহ শৌচাগার ও গোসলখানা অকেজো হয়ে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ব্যাহত হওয়ায় সেখানে কর্মরত নৌসেনাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি চরম আকার ধারণ করে; এমনকি এক সেনাসদস্য জাহাজ থেকে লাফিয়ে পড়ার চেষ্টা করেন বলেও রিপোর্টে উঠে এসেছে।

এর আগে চলতি বছরের শুরুতে ইরান যুদ্ধ চালু রাখতে দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকা অত্যাধুনিক থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বেশ কয়েকটি অংশ সরিয়ে নেওয়া হয়। একইসঙ্গে আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত দ্রুত কমে আসার চিত্রও স্পষ্ট হয়েছে।

আন্তর্জাতিক যুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’-এর উত্তর-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং জানান, এসব পদক্ষেপে যৌথভাবে এশিয়ায় আমেরিকার প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা ধাক্কা খেয়েছে। তাঁর মতে, এশিয়া থেকে রণতরী সরিয়ে নেওয়ায় চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের গড়ে তোলা আঞ্চলিক প্রতিরোধ ক্ষমতার কার্যকারিতায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

আমেরিকার বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজটি অঞ্চল ত্যাগ করার সুযোগে চীন তাদের রণতরী ‘লিয়াওনিং’ ও ‘শানডং’ নিয়ে তথাকথিত 'ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন' বা জাপানের উত্তর দিক থেকে তাইওয়ান, ফিলিপাইন ও বোর্নিও পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা অতিক্রম করে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে সামরিক মহড়া ও উপস্থিতি জোরদার করেছে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় বেইজিংকে ঘেরাও করে রাখার জন্য তৈরিকৃত এ অঞ্চলে চীনের কার্যক্রম ঠেকানো এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।

এছাড়া গত জুন থেকে তাইওয়ানের পূর্ব জলসীমায়—যেটি জাপান ও ফিলিপাইনের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত—চীনা কোস্টগার্ডের তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইয়াং মনে করেন, চীন কেবল তাইপে, ম্যানিলা বা টোকিওকে বার্তা দিচ্ছে না; বরং ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া ও মার্কিন সামরিক প্রতিক্রিয়ার বাস্তব সক্ষমতা কেমন, তাও পরীক্ষা করে দেখছে।

সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক জা ইয়ান চং জানান, মার্কিন সরঞ্জাম পশ্চিমের দিকে সরে যাওয়ায় চীন আরও আগ্রাসী ও দুঃসাহসী হয়ে উঠতে পারে বলে মিত্রদেশগুলো আশঙ্কায় রয়েছে। চংয়ের মতে, রণতরী সরিয়ে নেওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক কৌশলগত নমনীয়তা কিছুটা কমেছে, যদিও অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর সিংহভাগ সদস্য এখনো বহাল রয়েছে।

এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্যাসিফিক কমান্ড’-এর অধীনে প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার সামরিক ও বেসামরিক কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন, যার বড় একটি অংশ দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে অবস্থান করছেন।

তবে চং মনে করেন, এই সামরিক রদবদল আসলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক কৌশলেরই একটি অংশ। নতুন নীতি অনুযায়ী এশিয়ার মিত্রদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রধান ভূমিকা নিতে হবে, তবে এতে মার্কিন সহায়তা বজায় থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের নতুন ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি’-তে চীন, উত্তর কোরিয়া, রাশিয়া ও ইরানের সম্মিলিত হুমকি মোকাবিলায় মিত্রদের সাথে ‘প্রতিরক্ষা ব্যয়ের দায়িত্ব ভাগাভাগি’ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

নতুন এ নীতিতে ২০৩০-এর দশকের মধ্যে ইউরোপ ও এশিয়ার মিত্রদের তাদের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩.৫ শতাংশ সামরিক খাতে এবং ১.৫ শতাংশ নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতে ব্যয়ের আহ্বান জানানো হয়েছে। ট্রাম্পের এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাইওয়ান, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া তাদের সামরিক বাজেট বাড়াতে শুরু করেছে। সম্প্রতি তাইপে ২০২৭ সালের মধ্যে সামরিক বাজেট ১৮ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে চীনকে রুখতে ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী গিলবার্টো তেওদোরো জুনিয়র তাঁদের সামরিক ব্যয় জিডিপির ৪ শতাংশ করার জোর তাগিদ দিয়েছেন এবং গোপনে ও প্রকাশ্যে জাপান ও তাইওয়ানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়িয়ে তুলছেন।

তবে দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি স্থায়ী হবে না বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। সিঙ্গাপুরের নানয়াং টেকনোলজিকাল ইউনিভার্সিটির পূর্ব এশিয়া ও মার্কিন-জাপান জোট বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কেই কোগা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে সাময়িকভাবে সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য উদ্বেগের হলেও একে এশিয়া অঞ্চল থেকে আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদি গুটিয়ে নেওয়া বলা যাবে না।

একই অভিমত ব্যক্ত করেছেন 'ন্যাশনাল ব্যুরো অব এশিয়ান রিসার্চ'-এর গবেষক কে ট্রিস্টান টাং। তিনি উল্লেখ করেন, 'ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন' চলে গেলেও স্টিলথ যুদ্ধবিমান এফ-৩৫বি বহনকারী শক্তিশালী 'মার্কিন উভচর র্যাপিড রেডি গ্রুপ' এখনো এশিয়াতেই বিদ্যমান। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলেও ট্রাম্প অর্থনৈতিক ও সামিরকভাবে তাঁদের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের কথা ভুলে যাবেন না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাবনায় দিনশেষে মার্কিন অর্থনৈতিক স্বার্থ ও চীনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাই সবচেয়ে প্রাধান্য পাবে।