শিকল ভেঙে বিশ্ববাজারে রেজবিন হাফিজ

শিক্ষকতার সম্মানজনক ও নিরাপদ পেশা ছেড়ে চামড়া এবং ডাইস্টিলের মতো পুরোপুরি পুরুষপ্রধান ও ভারী শিল্পে পা রাখা আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় এক অবিশ্বাস্য সিদ্ধান্ত ছিল। পরিবার ও সমাজের নানা রক্তচক্ষু, অবজ্ঞার চোখ কিংবা গভীর রাতে কারখানায় কাজের জন্য প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার মতো শত প্রতিকূলতাকে জয় করে আজ সফলতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন উদ্যোক্তা রেজবিন হাফিজ। ঢাকার ধামরাই বিসিক শিল্প নগরীতে গড়ে তোলা তার প্রতিষ্ঠান ‘পিপলস লেদার ইন্ডাস্ট্রিজ’ আজ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সুনাম ছড়িয়ে দিচ্ছে।

বন্যা ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার সন্তান হওয়ায় রেজবিন হাফিজের মূল স্বপ্ন ছিল নিজ এলাকার অসহায় ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মানুষদের জন্য একটি স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি করা। দীর্ঘ দশ বছর শিক্ষকতা এবং এমবিএ পড়াশোনাকালে তিনি বুঝতে পারেন, প্রান্তিক মানুষকে স্বাবলম্বী করতে হলে বড় পরিসরে উদ্যোগ নিতে হবে। লেদার ইঞ্জিনিয়ার স্বামীর পেশার সূত্র ধরে তিনি চামড়া কাটার বিশেষ ‘ডাইস্টিল কাটিং নাইফ’ তৈরির সম্ভাবনা দেখতে পান। ২০১৪ সালে মাত্র ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা পুঁজি এবং মাত্র তিনজন কর্মী নিয়ে তার কারখানার যাত্রা শুরু হয়।

শুরুর দিনগুলো ছিল সীমাহীন চ্যালেঞ্জে ভরা। একদিকে সকালে শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন, অন্যদিকে বিকেলে কারখানায় এসে ঘাম ঝরানো। ধোলাইখালের মতো পুরোদস্তুর পুরুষপ্রধান এলাকায় গিয়ে নিজে দাঁড়িয়ে ডাইস্টিল লোহা কেনা, ট্রাকে মালবোঝাই করা থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত কারখানায় কাজ করা সবখানেই নারী হিসেবে পদে পদে বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কাঁচামাল নিয়ে প্রতারণা কিংবা পণ্য সরবরাহ করে সময়মতো টাকা না পেয়ে বহুবার মনে হয়েছিল পথচলা বুঝি থেমে গেল; কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। বিসিক ও এসএমই ফাউন্ডেশন থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের দক্ষতাকে শক্ত ভিত দেন।

২০১৮ সালের পর রেজবিন হাফিজের ব্যবসায় এক অভাবনীয় মোড় আসে। জাতীয় পর্যায়ের পুরস্কার ও বিসিক পুরস্কার লাভের মাধ্যমে কাজের প্রচার ও পরিধি দ্রুত বাড়তে থাকে। কাজের প্রচণ্ড চাপ সামলাতে শিক্ষকতা জীবন পুরোপুরি পেছনে ফেলে এবং স্বামীর চাকরি ছেড়ে তারা যৌথভাবে ব্যবসাকে বড় করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।

ধামরাই বিসিক শিল্পনগরীর কারখানাটি আজ পরিণত হয়েছে দেড় শতাধিক কর্মীর জীবিকার ভরসাস্থলে, যার মাধ্যমে তার নিজ এলাকার মানুষকে একত্রিত করে স্বাবলম্বী করার স্বপ্নটি আজ বাস্তব রূপ পেয়েছে। বর্তমানে ডাইস্টিল কাটিং নাইফের পাশাপাশি কারখানায় তৈরি হচ্ছে লেদারের হ্যান্ডমেড সোল ও আধুনিক মানের লেদার পণ্য। পিপলস লেদার ইন্ডাস্ট্রিজের তৈরি পণ্য ও বিশেষ হ্যান্ড গ্লাভস এখন সরাসরি রপ্তানি ও প্রশংসিত হচ্ছে জাপান, মালয়েশিয়া, ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাজ্যের বাজারে। রেজবিন হাফিজ প্রমাণ করেছেন, দৃঢ় ইচ্ছা, সততা আর পরিশ্রম থাকলে সমাজ ও সময়ের সব সামাজিক ট্যাবু ভেঙে বৈশ্বিক অঙ্গনে সফলতার নতুন ইতিহাস লেখা সম্ভব।