‘এ কয়দিন টিকবে?’, ‘ছয় মাস পর বন্ধ হয়ে যাবে’ উদ্যোগের শুরুতে এমন বহু নেতিবাচক মন্তব্য আর নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন অনেকেই। কিন্তু সব সংশয় ও আশঙ্কার জবাব আজ মিলেছে আন্তর্জাতিক বাজারে। যেখানে অনেকেই ব্যর্থতার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, সেখানে গ্রামীণ কাঁচামাল ও ফেলে দেওয়া উপাদানকে শৈল্পিক রূপ দিয়ে ৩২টি দেশে পণ্য রপ্তানি করছেন ফরিদপুরের অদম্য নারী উদ্যোক্তা স্মৃতি রায়। তার হাত ধরে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান ‘আরাধ্য ক্র্যাফট অ্যান্ড ক্রিয়েশন’ আজ দেশের সুনাম ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এক গর্বিত নাম।
ঢাকায় চাকরির নিরাপদ জীবন থাকলেও স্মৃতির মন পড়ে থাকত গ্রামের মাটির গন্ধে। গ্রামীণ নারীদের জন্য কিছু করার তীব্র তাগিদ থেকেই চাকরির মায়া ত্যাগ করার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পরিবারের অসম্মতি সত্ত্বেও ঝুঁকি নেওয়ার সাহস নিয়ে ফরিদপুরের বদরপুরের ডোমরাকান্দিতে শুরু করেন নতুন পথচলা। মায়ের কাছে শৈশবে শেখা হাতের কাজ এবং বিভিন্ন ফ্যাক্টরি পরিদর্শনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের সামান্য সঞ্চয় ও বন্ধুদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের টাকায় গড়ে তোলেন হস্তশিল্পের এই উদ্যোগ।
স্মৃতি রায়ের কাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো পরিবেশবান্ধব ও স্থানীয় কাঁচামালের ব্যবহার। পাট, হোগলা পাতা ও কচুরিপানার মতো সচরাচর অবহেলিত উপাদান দিয়ে তৈরি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ রকমের নান্দনিক সামগ্রী। যার মধ্যে রয়েছে পাটের ফ্লোর ম্যাট, ডোর ম্যাট, নার্সারি পট, ইনডোর প্ল্যান্টের পাত্র এবং আকর্ষণীয় টিস্যু বক্স। এসব পণ্য জার্মানি, তুরস্ক, আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সুপারশপের তাকে বিশেষ মর্যাদায় সাজানো থাকছে।
তবে এই সফলতার পথচলা মসৃণ ছিল না। কাঁচামাল কিনতে গিয়ে টাকা নিয়ে সহযোগীর পালিয়ে যাওয়া কিংবা আড়াই লক্ষাধিক টাকার পণ্য নিয়ে ক্রেতার মূল্য পরিশোধ না করার মতো বড় বড় ধাক্কা তাকে সইতে হয়েছে। কিন্তু ভেতরে থাকা ‘পজিটিভ জেদ’ আর স্রোতের বিপরীতে হাঁটার মানসিকতাই তাকে বারবার ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে।
আজ স্মৃতি রায়ের মূল কারখানায় প্রায় ২০ কর্মী নিয়মিত কাজ করছেন। এ ছাড়া গ্রামের প্রায় ৭০ নারী নিজেদের ঘরে বসেই পাটের বেণি ও হোগলা পাতার কাজের মাধ্যমে সরাসরি যুক্ত হয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন। নিজের চেয়েও পেছনের এই কর্মীদেরই তার আসল শক্তি ও পরিবার বলে মনে করেন তিনি। নেতিবাচক মন্তব্য ছুড়ে দেওয়া মানুষদের প্রশ্নের জবাব কাজের মাধ্যমে দিয়ে স্মৃতি রায় প্রমাণ করেছেন দৃঢ় আত্মবিশ্বাস, স্থির লক্ষ্য এবং অদম্য জেদ থাকলে গ্রামের মাটি থেকেও বিশ^জয়ের গল্প লেখা সম্ভব।