ডারউইনের উত্তাপ পেছনে ফেলে বাংলাদেশ দল এখন ম্যাকাইয়ে। ৯ উইকেটের সেই বড় জয়ের স্মৃতি একপাশে রেখে নতুন চ্যালেঞ্জ শুরু লাল-সবুজের প্রতিনিধিদের। গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায় সিরিজ জয়ের হাতছানি সফরকারীদের। নাজমুল হোসেন শান্তরা এই শহরে পা রাখতেই বাতাসে শীতের তীব্রতা টের পেয়েছেন। সঙ্গে রহস্যের চাদর বিছিয়ে রেখেছে দুই ম্যাচ সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টের উইকেট। কারণ অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ এই ম্যাচ দিয়েই প্রথমবার টেস্ট ক্রিকেট আয়োজনের কীর্তি গড়বে মাঠটি। যেটা আবার সফরকারীদের প্রমাণের মঞ্চ, ডারউইনের সাফল্য নিছক কাকতালীয় ছিল না। কিন্তু অধিনায়ক শান্ত এখনই সিরিজ জয়ের প্রত্যাশার ভারী বোঝা কাঁধে চাপাতে রাজি নন। বরাবরের মতো ‘ভালো ক্রিকেট খেলতে’ চাওয়ার পুরনো মন্ত্র জপে গেলেন তিনি।
সফরের শেষ ম্যাচ খেলতে নামার আগে গতকাল ম্যাকাইয়ে শেষবারের মতো অনুশীলন করে বাংলাদেশ দল। এই অনুশীলন পর্ব শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে শান্ত বলেন, ‘এত দূরে চিন্তা করতে চাই না। আমরা প্রথম থেকে যে কথাটা বলে এসেছি যে, ভালো ক্রিকেট খেলতে চাই। এখানেও পাঁচ দিন ভালো ক্রিকেট খেলতে চাই। ফলে জরুরি হচ্ছে প্রতিটি সেশনে কত ভালো ক্রিকেট খেলছি। এটাই লক্ষ্য থাকবে। যদি প্রক্রিয়া ঠিক থাকে, আমরা যদি সেশন ধরে ধরে ভালো খেলতে পারি, ফল সেভাবেই আসবে।’
জয় সবসময় আত্মবিশ্বাসী করে। সেটা যদি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে হয়, তবে এর মাহাত্ম্য বেড়ে যায় কয়েকগুণ। কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাস অনেক সময় আত্মতৃপ্তিতে রূপ নেয়। এমন বৃত্তে বন্দি হয়ে যেতে চান না বাংলাদেশ টেস্ট দলের অধিনায়ক, ‘এ রকম জয় তো অবশ্যই আত্মবিশ্বাস দেবে। পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে সেখান থেকে (আত্মতৃপ্তি) ফেরত আসা খুব জরুরি। দুই দিনের অনুশীলনে খেলোয়াড়রা ভালোভাবেই ফিরে এসেছে, মানিয়ে নিয়েছে। ওটা (ডারউইনের জয়) এখন অতীত হয়ে গেছে। এই কন্ডিশনে কীভাবে মানিয়ে নিতে পারি, এগুলো আলাপ হয়েছে। আশা করি সবাই সেখান থেকে বের হয়ে এখানে আবার নতুন করে শুরু করবে।’
ম্যাকাইয়ের আবহাওয়া ডারউইনের থেকে অনেক আলাদা। আগের ভেন্যু শহরে দিনের বেলা তাপমাত্রা থাকত ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে। ম্যাকাইয়ে সেটা ২০ ডিগ্রিতে নেমে এসেছে। ফলে ঠা-া বেশি, বাতাসও প্রবল। দুই দিনের অনুশীলনে সেই নতুন পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশ। তবে আসল ধাঁধা লুকিয়ে আছে বাইশ গজের পিচে। সেখানকার কিউরেটর পিটার কাজাকফ বলেন, ‘আমি মনে করি যেকোনো টেস্ট উইকেটেই ব্যাট ও বলের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ লড়াই থাকা উচিত। আর অবশ্যই ম্যাচ যত এগোবে, স্পিনাররাও যেন খেলায় প্রভাব ফেলতে পারে, সেটাও চাই। উইকেট প্রস্তুতের কাজটা সত্যিই ভালো হয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়েছে। আবহাওয়াও ভালো ছিল, যা প্রস্তুতির ক্ষেত্রে অর্ধেক কাজ এগিয়ে দেয়।’
তবে অনুশীলনের উইকেটে ধরা পড়েছে বাড়তি বাউন্স। অর্থাৎ কন্ডিশন পেসারদের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে। বাংলাদেশের হাতে অস্ত্রের অভাব নেই। তাসকিন আহমেদ, ইবাদত হোসেন, হাসান মাহমুদ, শরিফুল ইসলাম, খালেদ আহমেদ প্রস্তুত হয়ে আছেন। সঙ্গে তাইজুল ইসলাম আর মেহেদী হাসান মিরাজের মতো অভিজ্ঞ দুই স্পিনার। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে তাড়াহুড়ো করলেন না অধিনায়ক শান্ত, ‘উইকেট দেখে ভালো মনে হয়েছে। আমরা এখানে যে উইকেটে অনুশীলন করেছি, সেখানে বাউন্স একটু বেশি ছিল। পাঁচ পেসার দলে আছে, সবাই প্রস্তুত আছে (ম্যাচ খেলতে)। ইতিবাচক দিক হচ্ছে দুজন স্পিনার আছে। যেকোনো কন্ডিশনে ভালো বল করে। ফলে আরেকবার উইকেট দেখে দলের জন্য যে সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হয়, তা নেব।’
এই দোলাচলের মধ্যেই অনুশীলনে বোলিংয়ের পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ব্যাট করেন শরিফুল। যা চার পেসারের সম্ভাবনাকে আলোচনায় টেনে এনেছে। লোয়ার অর্ডারের ব্যাটারদের যোগ করা রানও যে ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারে, ডারউইনে তার প্রমাণ মিলেছে। চার পেসার খেললে বাদ পড়বেন এক স্পিনার। বোলিংয়ের এই জটিলতার মধ্যে ব্যাটিং লাইনআপ নিয়েও দুশ্চিন্তা আছে। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টেস্টেই সেঞ্চুরি করা তানজিদ হাসান তামিম ঘাড়ের সমস্যায় আগের দিন মাঠে নামতে পারেননি। গতকাল স্ক্যান করানোর পর ব্যাটিং অনুশীলন করেন। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে দল আরেকবার পরিস্থিতি যাচাই করে নিতে চাইছে। গতকাল রাতে টিম ম্যানেজমেন্টের একটি সূত্র জানিয়েছে, দ্বিতীয় টেস্টের একাদশে দেখা যাবে তামিমকে। বিকল্প হিসেবে অপেক্ষায় আছেন সৌম্য সরকার। ম্যাকাইয়ে টানা দুদিন নেটে দীর্ঘ সময় অনুশীলন করেন এই বাঁহাতি ব্যাটার।
বাংলাদেশের আসল লড়াইটা অবশ্য অন্যখানে। ডারউইনের জয় এখন শুধুই স্মৃতি। অস্ট্রেলিয়াও নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এজন্য শুধু আগামী পাঁচটা দিন, প্রতিটা সেশনকে নিজেদের মুঠোয় পুরে নেওয়ার পরিকল্পনা সফরকারীদের।