প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লি সফরে নিতে ভারতের চেষ্টা অব্যাহত

ভারতে আগামী সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি অথবা সম্ভব হলে তার আগেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের জন্য দেশটির পক্ষ থেকে চেষ্টা ও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের কয়েকটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে এ কথা জানিয়েছে।

সূত্রগুলো জানায়, ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ঢাকায় সরকারের মন্ত্রীসহ বিভিন্ন পর্যায়ে সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রসঙ্গ তুলছেন। এর বাইরে ভারতীয় বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ আগামী সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ব্রিকস সম্মেলনের সময় অথবা সম্ভব হলে আরও আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরটি নিশ্চিত করার জন্য যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে।

তবে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ এ এম সালেহ শিবলী বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে গতকাল শুক্রবার বলেছেন, ‘সফরের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।’

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস গতকাল কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে করা এক প্রতিবেদনে বলেছে, তারেক রহমানের গুরুত্বপূর্ণ সফরের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামী সপ্তাহের শুরুতে তার নয়াদিল্লিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নয়াদিল্লি সফর ঘিরে গতকাল একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের এক ঘণ্টার মধ্যে তা তড়িঘড়ি প্রত্যাহার করে নিয়েছে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন।

গতকাল দুপুর ২টার দিকে ভারতের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশ করা হয়। তাতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানোর কর্মসূচির পূর্ণ মহড়ার জন্য (আজ) শনিবার (২২ আগস্ট ২০২৬) রাষ্ট্রপতি ভবনের ফোরকোর্টে গার্ড পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিকতা হবে না।’

বাাংলাদেশ ও ভারতের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সরকারি সফরের সাধারণত ২/৩ দিন আগে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে সফরের বিষয়টি জানায়। এমন ঘোষণা আসার আগেই ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশ করায় কূটনৈতিক মহলে বেশ আলোচনা তৈরি হয়। পরে বিকেল ৩টার দিকে ভারতের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে একটি বিশেষ বার্তা পাঠিয়ে মহড়ার ঘোষণা দেওয়া বিজ্ঞপ্তিটি সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়।

বিদেশি রাষ্ট্র অথবা সরকারপ্রধানের ভারত সফরের সময় রাষ্ট্রপতি ভবনে ‘ফোরকোর্ট’ হিসেবে পরিচিত সামনের খোলা চত্বরে জাঁকজমকপূর্ণ আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান আয়োজন করা দীর্ঘদিনের একটি কূটনৈতিক ও সামরিক ঐতিহ্য। এই অনুষ্ঠানে বিদেশি ভিভিআইপিকে ভারতের সশস্ত্রবাহিনীর তিন শাখার (সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী) সমন্বয়ে একটি বিশেষ গার্ড-অব-অনার দেওয়া হয়। তখন দুই দেশের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। উভয়পক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ভিভিআইপিরা পরিচিত হন।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান গত ফেব্রুয়ারিতে শপথ গ্রহণের পর দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য ভারত সফরের জন্য দেশটির সরকার আমন্ত্রণ জানায়। তবে সেই আমন্ত্রণে কোনো তারিখ প্রস্তাব করা হয়নি। এর বাইরে আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ কর্মসূচিতে বিমসটেক-এর চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দিতে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী চলতি আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে ঢাকায় তারেক রহমান এবং নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাতের পর এ মাসেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরে নিতে জোর তৎপরতা চলতে থাকে। তবে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ১৬ আগস্ট এক ব্রিফিংয়ে জানায়, সরকার মনে করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ নেই।

মন্ত্রণালয়ের দাবি, সফরটির প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার নয়াদিল্লিতে গত ৫ আগস্ট গণমাধ্যমে যেভাবে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে সফরের প্রস্তুতির প্রক্রিয়া কলুষিত করা হয়েছে।

সরকার ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদীর খুনে অভিযুক্তসহ ভারতে পলাতক থাকা ব্যক্তিদের দ্রুত বাংলাদেশের কাছে প্রত্যর্পণের জন্য দাবি জানিয়ে আসছে।

বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী প্রতিবেশী দেশে সফরে যাবে না, এমন নয়। তিনি যাবেন। তবে সফরটি ঠিক কখন হবে, এটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের ভারতে যাওয়া বহুপক্ষীয়-মঞ্চের পার্শ¦-বৈঠকের পরিবর্তে একটি পূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সফর হওয়া উচিত।

বাংলাদেশ ও ভারতকে পরস্পরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে উল্লেখ করে গত বৃহস্পতিবার তিনি নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রথম সফরটি দ্বিপক্ষীয় হওয়া উচিত। আমাদের একে অন্যকে নিজ নিজ বাড়িতে আমন্ত্রণ জানানো উচিত।’

পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে যেকোনো সফরের একটি সুস্পষ্ট ফল থাকা উচিত, এমনটি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনেক বিষয় রয়েছে এবং এগুলোতে তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই। যখন আমরা দেখব যে সময়টা সঠিক, তখন আমরা সফর করতে ইচ্ছুক।’

দুই দেশের মধ্যে ঐকমত্যে পৌঁছানোর আগে বিভিন্ন বিষয়ে প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করা প্রয়োজন বলে উপদেষ্টা জানান। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার এবং অন্য পলাতক অপরাধীদের হস্তান্তরের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।

দীনেশ ত্রিবেদী অবশ্য দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সমস্যা আছে, তা স্বীকার করে দুই দেশের মতপার্থক্য কাটিয়ে পারস্পরিক ও নিঃশর্ত আস্থার ভিত্তিতে একটি সম্পর্ক গড়ে তুলতে একসঙ্গে কাজ করার ওপর জোর দেন।