অপরাধের শিকার হওয়ার পর বিচার পাওয়ার প্রথম ধাপ মামলা করা। কিন্তু সে ধাপেই ভোগান্তি, অভিযোগ গ্রহণে গড়িমসিসহ পুলিশের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ নৈমিত্তিক ঘটনা। কখনো ভুক্তভোগীর অভিযোগকে জিডিতে সীমাবদ্ধ রাখা, কখনো মামলা নিতে অনীহা, আবার কখনো অভিযোগকারীকে বারবার ঘোরানোর অভিযোগও রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে। এই পরিস্থিতির উত্তরণে অনলাইনে মামলা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ফলে ভুক্তভোগী দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে অভিযোগ করুক তার ডিজিটাল রেকর্ড থাকবে এবং মামলা গ্রহণের ক্ষেত্রে পুলিশের এককেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ ও নাগরিকের ভোগান্তি কমবে। পুলিশের সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পরীক্ষামূলকভাবে এ ব্যবস্থা চালুর কথা জানিয়েছে সরকার।
অনলাইন জিডি ব্যবস্থা সারা দেশের সব থানায় চালু হলেও অনলাইন এফআইআর বা মামলা ব্যবস্থা এখনো চালু হয়নি। বর্তমানে জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে করা এই জিডি সরাসরি ও অনলাইন সেবা হিসেবে উল্লেখ করলেও ‘মামলা রুজু ও তদন্ত’ এখনো ‘প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে’ থানার মাধ্যমে সশরীরে পরিচালিত হচ্ছে। সেবা সহজ হলেও অনলাইনে মামলার বিষয়টি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু পুলিশে এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মামলা গ্রহণের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের একটি বড় ভোগান্তির অবসান হতে পারে বলেও মনে করছেন তারা।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে এক সভায় অনলাইনে মামলার ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ সময় তিনি পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) অনলাইন এফআইআর দাখিলের জন্য একটি ফোন নম্বর ও সহায়তার জন্য একটি বিশেষ কলসেন্টার স্থাপনেরও নির্দেশ দেন। পরে ওই বছরের ১০ জুন গাজীপুরে পুলিশ সংস্কারের অংশ হিসেবে সারা দেশে অনলাইনে মামলা ও জিডি গ্রহণের একটি পাইলট প্রকল্প নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। এরপর এটা তেমন একটা এগোয়নি। চলতি বছরের ২ জুন পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত চিঠিতে নতুন করে বিষয়টি সামনে এসেছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, অনলাইনের মাধ্যমে যেকোনো ব্যক্তি অভিযোগের বিষয়ে থানায় না গিয়েও জিডি ও মামলা করতে পারবেন। চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, থানায় মামলা ও জিডি করতে গিয়ে মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হয়, সেজন্য সরকারের পদক্ষেপ ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হচ্ছে। বর্তমানে সব থানায় অনলাইন জিডি আবেদন ও সেবা চালু রয়েছে। কোনো অভিযোগ আমলযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হলে অভিযোগকারীকে এসএমএস দিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্যসহ থানায় উপস্থিত হতে বলা হয়; পরে তার ভিত্তিতে নিয়মিত মামলা করা সম্ভব।
কীভাবে কাজ করবে অনলাইন মামলা : বর্তমান অনলাইন জিডি পদ্ধতিতে একজন নাগরিক জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, সচল মোবাইল ফোন ও লাইভ ছবি দিয়ে নিবন্ধন করতে পারেন। অনলাইন মামলার ক্ষেত্রেও একজন অভিযোগকারী অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গিয়ে প্রথমে নিজের পরিচয় ও যোগাযোগের তথ্য দেবেন। এরপর ঘটনার স্থান, সময়, তারিখ ও ঘটনার বিবরণসহ অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র সংযুক্ত করে অভিযোগ জমা দেবেন। অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশকে সেটি যাচাই করতে হবে এবং অভিযোগের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। পুলিশের অনলাইন সেবা কাঠামোতেও অনলাইন অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা রয়েছে।
কমতে পারে ‘মামলা বাণিজ্য’ : অনলাইনে মামলা গ্রহণের সম্ভাব্য বড় সুবিধা হচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভরতা কমানো। বর্তমানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযোগকারীকে মামলা করানোর জন্য বিভিন্ন ব্যক্তির সহায়তা নিতে হয়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সরাসরি অভিযোগ জমা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে এ ধরনের নির্ভরতা কম আসবে এবং ‘মামলা বাণিজ্য’ও কমবে।
ভুয়া মামলা ঠেকানোই বড় চ্যালেঞ্জ : পুলিশ সদর দপ্তরের এক ঊধ্বর্তন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনলাইনে মামলা গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মিথ্যা, হয়রানিমূলক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ ঠেকানো। থানায় গিয়ে অভিযোগ করার ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে অভিযোগকারীর বক্তব্য শুনতে পারেন। অনলাইন ব্যবস্থায় সেটি যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত হতে পারে। এ কারণে অভিযোগ জমা দেওয়ার পর একটি নির্দিষ্ট যাচাই প্রক্রিয়া প্রয়োজন হবে। অভিযোগের সঙ্গে ছবি, ভিডিও, ডকুমেন্ট, মেডিকেল রিপোর্ট, প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য বা অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ যুক্ত করার ব্যবস্থা থাকলে প্রাথমিক যাচাই সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে অভিযোগ দাখিল ঠেকাতে জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর ও অন্যান্য পরিচয়-নির্ভর যাচাই ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, মামলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয় হচ্ছে এজাহার। কোনো অভিযোগ অনলাইনে পাঠানো মানেই সেটি এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছেএমন ধারণা তৈরি হলে নাগরিকের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে স্পষ্ট করে জানাতে হবে, ‘অভিযোগ জমা’, ‘অভিযোগ যাচাই’, ‘মামলা রুজু’ ও ‘তদন্ত শুরু’ এগুলো আলাদা ধাপ। প্রতিটি ধাপে অভিযোগকারীকে এসএমএস বা অ্যাপ নোটিফিকেশনের মাধ্যমে জানানো যেতে পারে।
এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন মামলা ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করবে অভিযোগ গ্রহণের পরবর্তী ধাপের ওপর। অভিযোগ অনলাইনে জমা পড়ল, কিন্তু সেটি থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে পৌঁছাল না কিংবা দীর্ঘদিন পড়ে থাকল এমন হলে ডিজিটাল ব্যবস্থা নাগরিকের ভোগান্তি কমাতে পারবে না।
তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন : সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী বলেন, অনলাইন মামলা চালু হলে অভিযোগের সঙ্গে আরও সংবেদনশীল তথ্য জমা পড়বে- ভুক্তভোগীর পরিচয়, ঠিকানা, ফোন নম্বর, ছবি, ভিডিও, চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি, আর্থিক তথ্য এবং কখনো কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্কের তথ্যও। এসব তথ্য ফাঁস হলে ভুক্তভোগী নতুন ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। বিশেষ করে নারী নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, পারিবারিক সহিংসতা, চাঁদাবাজি কিংবা সংগঠিত অপরাধের অভিযোগে তথ্যের গোপনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই অনলাইন মামলা ব্যবস্থা শুধু পুলিশি সফটওয়্যার প্রকল্প হিসেবে দেখলে হবে না। এর সঙ্গে তথ্য সুরক্ষা, ব্যবহারকারীর পরিচয় যাচাই, অ্যাকসেস কন্ট্রোল, অডিট লগ এবং তথ্য ফাঁস হলে দায় নির্ধারণের কাঠামোও থাকতে হবে।
ডিজিটাল রেকর্ড বদলে দিতে পারে চিত্র : ধরা যাক, একজন ভুক্তভোগী রাত ১০টায় অনলাইনে মামলার আবেদন করলেন। সিস্টেম সঙ্গে সঙ্গে একটি ট্র্যাকিং নম্বর তৈরি করে দিল। অভিযোগটি সংশ্লিষ্ট থানার ওসির ড্যাশবোর্ডে ভেসে উঠল। কত সময়ের মধ্যে সেটি পর্যালোচনা করতে হবে, তা সিস্টেমে নির্ধারিত থাকল। অভিযোগ গ্রহণ করলে সময়সহ রেকর্ড তৈরি হলো। মামলা না করলে কারণ লিখতে হলো। অভিযোগকারী অনলাইনেই সেই সিদ্ধান্ত দেখতে পেলেন। প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারলেন। এই ব্যবস্থা চালু হলে থানার একজন কর্মকর্তা কোনো অভিযোগ ‘নেই’ বলে অস্বীকার করার সুযোগ তুলনামূলকভাবে কমে যাবে। তবে অনলাইন ব্যবস্থা মানেই সব সমস্যার সমাধান নয়। যাচাই ছাড়া অনলাইনে মামলার সুযোগ থাকলে মিথ্যা, হয়রানিমূলক কিংবা প্রতিহিংসামূলক মামলার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
পুলিশের প্রযুক্তিনির্ভরতার প্রতিশ্রুতি : সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির বলেন, ডিএমপি প্রশাসনিক কার্যক্রম, সেবা প্রদান ও আইন প্রয়োগে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতে কাজ করছে। এদিকে জুলাইয়ে পুলিশ একাডেমিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি নতুন প্রযুক্তিতে পুলিশের দক্ষতা বাড়ানো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। একই সঙ্গে ভয়ভীতি, প্রভাব, অনুরাগ-অনুকম্পা ও প্রলোভনের ঊর্ধ্বে থেকে মামলা তদন্ত ও নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। এতে অনলাইন এফআইআর চালু হলে শুধু নাগরিকের সুবিধা নয়, পুলিশের তদন্তব্যবস্থাও ডিজিটাল নথির ওপর আরও নির্ভরশীল হবে।
যা বলছে বিশেষজ্ঞরা : মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনলাইনে মামলা নেওয়ার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এটি পুলিশিং ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। এতে একজন নাগরিককে সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমার পাশাপাশি মামলা গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে। তবে অনলাইন ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে এর সঙ্গে প্রশিক্ষিত জনবল, দ্রুত যাচাই, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যের গোপনীয়তা, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং অভিযোগের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
ড. ওমর ফারুক আরও বলেন, অনলাইনে মামলা গ্রহণ যেন শুধু একটি ডিজিটাল ফরমে সীমাবদ্ধ না থাকে। অভিযোগ থেকে মামলা, মামলা থেকে তদন্ত এবং তদন্ত থেকে বিচার পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনতে পারলেই এর প্রকৃত সুফল মিলবে। সেক্ষেত্রে জিডির মতো অনলাইন মামলা গ্রহণ শুধু পুলিশের সেবা পদ্ধতির পরিবর্তন হবে না; এটি নাগরিক ও পুলিশের সম্পর্কেও একটি বড় ধরনের ডিজিটাল রূপান্তর আনতে পারে।