একটি দ্বীপ, যেখানে প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষের বসবাস। তাদের বড় একটি অংশের স্বজন ছড়িয়ে আছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। বিদেশ থেকে নিয়মিত অর্থ আসছে পরিবারগুলোর কাছে। সেই অর্থে বদলে যাচ্ছে জীবনযাত্রা, নির্মিত হচ্ছে নতুন ঘরবাড়ি, বাড়ছে শিক্ষা ও ব্যবসায় বিনিয়োগ।
কিন্তু একই সময়ে পড়ে আছে হাজার হাজার একর কৃষিজমি। জমি আছে, পানি আছে, মাটি আছে-নেই শুধু পর্যাপ্ত চাষাবাদ। কৃষি অফিসের তথ্য বলছে, এখানকার কৃষির সবচেয়ে বড় সমস্যা সেচের পানির সংকট।
চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের কৃষির এটাই এখন সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য।
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, সন্দ্বীপের মোট জনসংখ্যা ৩ লাখ ২৭ হাজার ৫৬৪ জন। তবে বর্তমানে জনসংখ্যা আরও বেড়েছে। ২০২৫ সালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ লাখ সন্দ্বীপবাসী দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। অর্থাৎ দ্বীপটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ মানুষের কোনো না কোনোভাবে প্রবাসজীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেই রয়েছেন ৪০ হাজারের বেশি সন্দ্বীপবাসী। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও রয়েছে বড় প্রবাসী জনগোষ্ঠী।
এই বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠীই সন্দ্বীপের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি। কিন্তু প্রশ্ন হলো-প্রবাস থেকে আসা এই অর্থের কতটা যাচ্ছে উৎপাদনশীল খাতে? আর কতটাই বা যাচ্ছে কৃষিতে?
কারণ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সন্দ্বীপে মোট আবাদি বা ফসলি জমির পরিমাণ ৫৬ হাজার ৫৩০ একর। এর মধ্যে সাময়িক অনাবাদি পড়ে আছে ২২ হাজার ৯১১ একর জমি। পাশাপাশি আবাদি ও ফসলি জমিগুলোতেও হচ্ছে অপরিকল্পিত চাষাবাদ। অর্থাৎ বিপুল পরিমাণ জমি থাকার পরও কৃষির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
প্রবাসী আয় বাড়ছে, কৃষি কেন পিছিয়ে?
সন্দ্বীপের অর্থনীতি গত কয়েক দশকে বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। একসময় বহু পরিবার কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন অনেক পরিবারের একজন বা একাধিক সদস্য বিদেশে থাকেন। তাঁদের পাঠানো অর্থে সংসারের ব্যয় মেটে।
ফলে কৃষি অনেক পরিবারের কাছে আর জীবনধারণের প্রধান অবলম্বন নয়। বরং এটি হয়ে উঠেছে অনেকটা ঐচ্ছিক পেশা।
একজন কৃষককে জমিতে চাষ করতে হলে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের পেছনে অর্থ ব্যয় করতে হয়। ফসল উৎপাদনের পর আবার সেই পণ্য মূল ভূখণ্ডের বাজারে নিতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবহন ব্যয় ও বাজারদরের অনিশ্চয়তা।
অন্যদিকে বিদেশ থেকে টাকা আসে নিয়মিত। মাঠে শ্রম দিতে হয় না, উৎপাদনের ঝুঁকিও নিতে হয় না। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে কৃষির চেয়ে প্রবাস কিংবা অন্য পেশা বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
সন্দ্বীপের কৃষির সবচেয়ে বড় সংকট তাই শুধু জমির নয়। জমির মালিক বা পরিবারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকলেও কৃষিতে বিনিয়োগের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
বিদেশের টাকা যদি নামে জমিতে
সন্দ্বীপের কৃষির ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গা হতে পারে এই প্রবাসী আয়।
প্রবাসীরা নিজেরা মাঠে নেমে কৃষিকাজ করবেন-এমনটা বাস্তবসম্মত নয়। তবে তাঁরা কৃষির উদ্যোক্তা হতে পারেন।
বিদেশে থাকা একজন জমির মালিক স্থানীয় কৃষকের সঙ্গে চুক্তি করে জমি চাষে দিতে পারেন। জমির মালিক দেবেন জমি ও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, স্থানীয় কৃষক করবেন চাষাবাদ। ফসল বিক্রির পর চুক্তি অনুযায়ী লাভ ভাগ হতে পারে।
এতে একসঙ্গে তিনটি সমস্যার সমাধান সম্ভব-জমি অনাবাদি থাকবে না, স্থানীয় কৃষকের কর্মসংস্থান হবে এবং প্রবাসীর অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হবে।
এই মডেল বড় পরিসরে নেওয়া গেলে একটি গ্রামেই কয়েক ডজন একর জমি নিয়ে বাণিজ্যিক কৃষি প্রকল্প গড়ে তোলা সম্ভব।
‘প্রবাসীর জমি, স্থানীয় কৃষকের চাষ’
সন্দ্বীপের বাস্তবতায় এমন একটি বিশেষ কৃষি মডেল চালু করা যেতে পারে।
প্রথমে ইউনিয়নভিত্তিক অনাবাদি জমির তালিকা তৈরি করতে হবে। বিদেশে থাকা জমির মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে স্থানীয় প্রশাসন বা কৃষি বিভাগ। জমির মালিক ও কৃষকের মধ্যে স্বচ্ছ চুক্তি হবে। এরপর ফসল নির্বাচন, উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও হিসাব—সবকিছু একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনা প্রয়োজন।
প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যাংক ঋণ, কৃষি পরামর্শ ও আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এটি হতে পারে সন্দ্বীপের কৃষি পুনরুজ্জীবনের একটি নতুন মডেল।
২৩ হাজার একর অনাবাদি জমিই বড় সুযোগ
অনাবাদি জমিকে শুধু সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না; এটিই হতে পারে সন্দ্বীপের সবচেয়ে বড় কৃষি বিনিয়োগের সুযোগ।
প্রথম কাজ হতে পারে—কেন জমি অনাবাদি, তার ইউনিয়নভিত্তিক তালিকা তৈরি করা।
কোথাও শ্রমিকের অভাব, কোথাও লবণাক্ততা, কোথাও সেচের সমস্যা, কোথাও জমির মালিক বিদেশে, আবার কোথাও বাজারজাতকরণের সংকট। কারণভেদে সমাধানও আলাদা হতে হবে।
যে জমির মালিক বিদেশে, সেখানে চুক্তিভিত্তিক কৃষি হতে পারে। যেখানে শ্রমিকের সংকট, সেখানে কৃষিযন্ত্র ভাড়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যেখানে লবণাক্ততা বেশি, সেখানে লবণসহিষ্ণু জাত ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে।
অর্থাৎ, ২৩ হাজার একর অনাবাদি জমিকে একসঙ্গে চাষের আওতায় আনার পরিবর্তে জমির সমস্যা চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে উৎপাদনে আনতে হবে।
ধানের পাশাপাশি লাভজনক ফসল
সন্দ্বীপের কৃষিকে লাভজনক করতে শুধু ধান উৎপাদনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ফসল নির্বাচন করতে হবে।
মরিচ, টমেটো, বেগুন, শসা, তরমুজ, মিষ্টিকুমড়া, ঢেঁড়স, ডাল, তেলবীজ ও মসলা জাতীয় ফসলের পাশাপাশি নারকেল, সুপারি, কলা ও পেঁপের মতো ফসলের বাণিজ্যিক উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে।
কোন এলাকায় কোন ফসল সবচেয়ে ভালো হবে, তা মাটি ও পানি পরীক্ষা করে নির্ধারণ করা দরকার।
লবণাক্ততা আছে, আছে সম্ভাবনাও
উপকূলীয় এলাকা হওয়ায় সন্দ্বীপের কৃষিতে লবণাক্ততা বড় চ্যালেঞ্জ। শুষ্ক মৌসুমে অনেক জমিতে লবণাক্ততা বেড়ে যায়। ফলে কৃষকের একটি অংশ চাষাবাদ থেকে সরে যান।
তবে লবণাক্ত জমি মানেই অনাবাদি জমি নয়।
লবণসহিষ্ণু জাত, সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা, আগাম বপন, ফসলের ধরন পরিবর্তন, মালচিং ও উঁচু বেডের মতো পদ্ধতি ব্যবহার করে এসব জমিতেও উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে।
অর্থাৎ, সন্দ্বীপে কৃষির সমস্যা শুধু জমির নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনারও সমস্যা।
একই জমিতে দুই-তিন ফসল
সন্দ্বীপের কৃষিকে লাভজনক করার আরেকটি পথ হতে পারে একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল উৎপাদন।
বর্ষায় আমন ধান, এরপর দ্রুত মেয়াদি সবজি বা ডাল। যেখানে সেচের সুযোগ আছে, সেখানে রবি মৌসুমে আরেকটি লাভজনক ফসল আবাদ করা যেতে পারে।
একই জমিতে বছরে দুই বা তিনবার উৎপাদন হলে কৃষকের মোট আয় বাড়বে। একই সঙ্গে বাড়বে জমির ব্যবহারও।
কৃষক উৎপাদন করবেন, বাজার ধরবে সমবায়
কৃষির উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, কৃষককে ন্যায্য দামও নিশ্চিত করতে হবে।
এ জন্য ইউনিয়নভিত্তিক কৃষক সমবায় গড়ে তোলা যেতে পারে। শত শত কৃষক একত্র হয়ে কয়েক টন সবজি বা অন্যান্য কৃষিপণ্য চট্টগ্রামের বাজারে পাঠালে পরিবহন খরচ কমবে, দরদাম করার ক্ষমতা বাড়বে এবং মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমবে।
এর পাশাপাশি ছোট কোল্ড স্টোরেজ, কৃষিপণ্য সংগ্রহকেন্দ্র ও গুদাম তৈরি করা গেলে কৃষককে দ্রুত কম দামে ফসল বিক্রি করতে হবে না।
কৃষির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে ক্ষুদ্র শিল্প
সন্দ্বীপের কৃষিকে শুধু কাঁচা ফসল বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে লাভের বড় অংশ অন্যদের হাতে চলে যাবে।
তাই কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেটজাতকরণের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
নারকেল থেকে তেল ও বিভিন্ন পণ্য, সুপারি প্রক্রিয়াজাতকরণ, মসলা শুকিয়ে প্যাকেটজাতকরণ, সবজি সংরক্ষণ কিংবা নিরাপদ কৃষিপণ্য ‘সন্দ্বীপ’ ব্র্যান্ডে বাজারজাত করা যেতে পারে।
এতে কৃষির পাশাপাশি ক্ষুদ্র শিল্পেরও বিকাশ হবে। তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থান।
প্রবাসীরা হতে পারেন কৃষি উদ্যোক্তা
সন্দ্বীপের প্রবাসীদের শুধু রেমিট্যান্স পাঠানো পরিবারের সদস্য হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী হিসেবে দেখতে হবে।
দশজন প্রবাসী মিলে একটি কৃষি প্রকল্প করতে পারেন। একটি ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম মিলে বাণিজ্যিক সবজি উৎপাদন করতে পারে। প্রবাসীরা অর্থ দেবেন, স্থানীয়রা জমি ও শ্রম দেবেন, কৃষি বিভাগ দেবে প্রযুক্তিগত সহায়তা—এমন সমন্বিত মডেল গড়ে উঠতে পারে।
প্রবাসী আয় যদি কৃষিতে আসে, তাহলে একই অর্থ একবার নয়, বারবার অর্থনৈতিক কার্যক্রম তৈরি করবে।
একটি কৃষি প্রকল্পে বিনিয়োগ হলে সেখানে কৃষক, শ্রমিক, পরিবহন, বাজার, প্যাকেটজাতকরণ, সংরক্ষণ ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ উপকৃত হবেন।
ইতালি প্রবাসী জামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে তাঁদের বেশকিছু জমিতে চাষ করা হয়। তবে সেটি ব্যক্তিগত উদ্যোগে। যেহেতু সন্দ্বীপের মাটি লবণাক্ত এবং কোন সময়ে কোন ফসল ভালো হবে, সে বিষয়ে সচেতনতা ও দিকনির্দেশনা দিয়ে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রবাসীরা আরও বেশি আগ্রহী হবেন।
সন্দ্বীপ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মারুফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রবাসীদের বিষয়টি তিনি নিয়মিত বিভিন্ন সভায় তুলে ধরছেন। অনেক প্রবাসী আছেন, যারা প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফিরে কী করবেন, তা জানেন না। তাঁদের কৃষিকাজে মনোযোগী করতে এবং যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, সন্দ্বীপের সবচেয়ে বড় সমস্যা সেচের পানির অভাব। গত তিন বছরে একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়—এখানকার মানুষ মাছের খামার ও গরু পালনে বেশি আগ্রহী হয়েছেন।
তবে একসময় সন্দ্বীপে প্রচুর ধান ও রবিশস্য উৎপাদন হতো। সন্দ্বীপের মানুষের চাহিদা মিটিয়ে এসব পণ্য দেশের অন্য এলাকাতেও পাঠানো হতো। এখন বাইরে থেকে চাল, ডাল ও শাক-সবজি না এলে সন্দ্বীপের মানুষের রান্নাঘরে হাঁড়ি ওঠে না।
সন্দ্বীপের কৃষক দুলাল বলেন, চাষাবাদে এখন খরচ বেড়েছে। শ্রমিক, সার ও কীটনাশকের খরচ বাদ দিলে ফসল উৎপাদনে লাভ থাকে না। তাই গত কয়েক বছর ধরে অনেকে কৃষিতে বিনিয়োগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
তিনি বলেন, কৃষিনির্ভর অনেক পরিবারের সন্তানদের মধ্যেও প্রবাসে গিয়ে কাজ করার আগ্রহ বেড়েছে। ফলে তারা কৃষি ছেড়ে বিদেশে চলে যাচ্ছে।
কৃষিকে ঘিরে নতুন অর্থনীতি
সন্দ্বীপের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ মানুষের সঙ্গে সরাসরি প্রবাসজীবনের সম্পর্ক রয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক শক্তিকে কৃষির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে কৃষি আর শুধু ‘চাষাবাদ’ থাকবে না; এটি হয়ে উঠতে পারে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক খাত।
প্রবাসী আয় → কৃষি বিনিয়োগ → জমি চাষ → উৎপাদন → সংরক্ষণ → পরিবহন → বাজারজাতকরণ → প্রক্রিয়াজাতকরণ → কর্মসংস্থান।
এই চক্র তৈরি করতে পারলেই সন্দ্বীপের অর্থনীতি আরও বহুমুখী হবে।
কারণ শুধু প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি একসময় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিদেশের শ্রমবাজারে মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা অভিবাসন নীতির পরিবর্তনে রেমিট্যান্স কমে গেলে তার প্রভাব সরাসরি পরিবার ও স্থানীয় অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
তাই প্রবাসী আয় থাকবে, কিন্তু সেই অর্থের একটি অংশ যদি জমি ও উৎপাদনে বিনিয়োগ হয়, তাহলে তৈরি হবে স্থায়ী সম্পদ।
এখন প্রয়োজন ‘কৃষি পুনর্জাগরণ পরিকল্পনা’
সন্দ্বীপের কৃষিকে ফিরিয়ে আনতে আলাদা একটি দীর্ঘমেয়াদি ‘সন্দ্বীপ কৃষি পুনর্জাগরণ পরিকল্পনা’ নেওয়া যেতে পারে।
এর আওতায় থাকতে পারে-ইউনিয়নভিত্তিক অনাবাদি জমির ডিজিটাল তালিকা; প্রবাসী জমির মালিকদের জন্য কৃষি বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম; ‘প্রবাসীর জমি, স্থানীয় কৃষকের চাষ’ প্রকল্প; লবণাক্ততা অনুযায়ী ফসল নির্বাচন; কৃষিযন্ত্র ভাড়া কেন্দ্র; কৃষক সমবায়; চট্টগ্রামমুখী কৃষিপণ্য পরিবহন ব্যবস্থা; ছোট কোল্ড স্টোরেজ ও গুদাম; কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র; প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ ঋণ ও পরামর্শ।
কৃষকের জন্য নিয়মিত মাঠপর্যায়ের কৃষি সেবা নিশ্চিত করতে হবে। অনাবাদি জমির জরিপ, প্রবাসী বিনিয়োগ মডেল, লবণসহিষ্ণু জাত, বহুফসলি চাষ, কৃষিযন্ত্র, সমবায়, কোল্ড স্টোরেজ এবং প্রবাসী বিনিয়োগে সরকারি সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রশ্ন একটাই-বিদেশের টাকা মাটিতে নামবে কবে?
সন্দ্বীপের ঘরে ঘরে যদি বিদেশের টাকা আসে, তাহলে সেই অর্থের একটি অংশ কেন জমিতে বিনিয়োগ হবে না?
যে দ্বীপে ৫৬ হাজার ৫৩০ একর ফসলি জমি রয়েছে, সেখানে প্রায় ২২ হাজার ৯১১ একর জমি অনাবাদি পড়ে থাকা শুধু কৃষির সংকট নয়; এটি একটি বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অপচয়।
প্রবাসীরা যদি কৃষিতে বিনিয়োগ করেন, স্থানীয় কৃষক যদি জমিতে উৎপাদন করেন, কৃষি বিভাগ যদি প্রযুক্তি দেয়, সরকার যদি বাজার ও অবকাঠামো নিশ্চিত করে-তাহলে সন্দ্বীপের কৃষি আবারও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আপ্রু মারমা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিটি মৌসুমে তাঁরা নানা পরিকল্পনা করছেন এবং বাস্তবায়নের জন্য সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিচ্ছেন। সন্দ্বীপের প্রবাসীদের কৃষিতে উদ্বুদ্ধ করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘টেকসই কৃষি উন্নয়ন’ নামে একটি প্রকল্প রয়েছে। সেখানে নতুন উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যারা নতুন উদ্যোক্তা অথবা কৃষিকাজে আগ্রহী, তাঁদের নিজ এলাকার কৃষি অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
সন্দ্বীপের মানুষের সামনে তাই এখন নতুন প্রশ্ন-
‘আমাদের ঘরে বিদেশের টাকা আসে, কিন্তু আমাদের জমিতে ফসল কেন আসে না?’
এই প্রশ্নের উত্তর হতে পারে-প্রবাসী আয়ের একটি অংশ মাটিতে বিনিয়োগ করা।
কারণ বিদেশের শ্রমে অর্জিত টাকা যদি সন্দ্বীপের মাটিতে ফিরে এসে ফসল ফলায়, তাহলে সেই টাকা শুধু একটি পরিবারের জীবন বদলাবে না; বদলে দিতে পারে পুরো দ্বীপের অর্থনীতি।
প্রবাসী আয়ের দ্বীপ সন্দ্বীপ তখন হয়ে উঠতে পারে কৃষি ও উৎপাদনেরও দ্বীপ।