পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ

রাজনীতিতে নারীর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পরিবর্তন জরুরি

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, নারীদের এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মনস্তাত্ত্বিক ও পলিসিগত পরিবর্তন আনা জরুরি। পরিবর্তন ছাড়া নেতৃত্বের স্থানে নারীর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

শনিবার (২২ আগস্ট) রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরীতে ‘তরুণ নারী রাজনৈতিক নেতৃত্ব শক্তিশালী ও গণতান্ত্রিক পরিসর পুনরুদ্ধার’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, বিএনপির নারী ক্ষমতায়ানের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। তৃণমূল কমিটিতে নারীর অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নতুন বাজেটও নারী বান্ধব করা হয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশে দীর্ঘসময় নারী প্রধানমন্ত্রী থাকলেও নারীর ক্ষমতায়ন হয়নি। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে নারীদের নেতৃত্ব একেবারেই শূন্যের কোঠায়। যদি এসব জায়গায় নারীদের মনোনয়ন দেওয়া হতো, তাহলে তারা পার্লামেন্টে আসতে পারতেন।

তিনি আরও বলেন, একটি আসনে তিনজনের মধ্যে একজন নারী প্রার্থী থাকলে তাকে কখনোই প্রমোট করা হয় না। পদে পদে বাধা আসলেও বাধা উপেক্ষা করে নারীদের এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী তরুণ নারী রাজনীতিকদের মধ্যে সনদ বিতরণ করা হয়

সংলাপে অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন এফইএসের বাংলাদেশ রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. ফেলিক্স গ্রেডেস, জহরত আদিব চৌধুরী এমপি, সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার, এবি পার্টির আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন এবং সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান।

অনুষ্ঠানের শুরুতে জিল্লুর রহমান বলেন, বিভিন্ন দল ও মতের নারীরা একসঙ্গে কাজ করেছেন-এটাই এ আয়োজনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে শুধু অংশগ্রহণ নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সম্পদ ব্যবহারে নারীদের কার্যকর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে। নারীরা যেন সমাজের সব ক্ষেত্রে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে পারেন, সে জন্য সামাজিক মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন।

জহরত আদিব চৌধুরী বলেন, নারীর অধিকার প্রশ্নে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে এক হতে হবে। তিনি নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন, মূল্যবোধভিত্তিক নৈতিক নেতৃত্ব এবং পেশাগত পরিচয় গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, কীভাবে কেউ এগিয়ে এসেছে তার চেয়ে সমাজে কতটা ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে পেরেছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নারীর অধিকার মানবাধিকারেরই অংশ। তাই মেধা, আত্মবিশ্বাস ও সম্পৃক্ততার মাধ্যমে নারীদের নিজেদের পথ তৈরি করতে হবে।

জলি তালুকদার বলেন, সংরক্ষিত আসনে সরাসরি ভোটের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। অর্থ ও পেশিশক্তিনির্ভর রাজনীতি নারীদের এগিয়ে আসার পথে বড় বাধা। রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনীহা, দলীয় কাঠামো এবং পরিবারে সম্পত্তিসহ সামাজিক বৈষম্য দূর না হলে এর প্রভাব রাজনীতিতেও থেকে যাবে।

ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি বলেন, নারী নেতৃত্ব হলো সমাজ হিসেবে আমরা কতদূর এগিয়েছি, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। রাজনৈতিক দলগুলোকে নারীদের জন্য কার্যকর সুযোগ তৈরি করতে হবে। নেতৃত্ব শুধু সংখ্যায় বাড়লেই হবে না, তা গুণগত ও অর্থবহ হতে হবে। রাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সুযোগ ও অধিকার নিশ্চিত করা নারীদের ন্যায্য দাবি।

মনিরা শারমিন বলেন, ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বড় রাজনৈতিক দলগুলো এখনো পরিবারতন্ত্রে আবদ্ধ এবং নতুন নারী নেতৃত্ব তুলে আনতে অনীহা দেখায়। সাইবার বুলিং প্রতিরোধে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিকতা ও সক্রিয় ভূমিকা জরুরি।

ফেলিক্স গ্রেডেস বলেন, এফইএস স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের মূল্যবোধে বিশ্বাস করে। নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ন্যায়বিচারেরই অংশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাঁদের যুক্ত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। তিনি বলেন, নারীদের আরও বেশি সুযোগ, স্বীকৃতি ও সহায়তা প্রয়োজন। নারীর অংশগ্রহণ শুধু অধিকারের বিষয় নয়; সমাজ ও রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে তাঁদের অর্থবহ সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা জরুরি।

পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, আদর্শগত পার্থক্য নির্বিশেষে নারীদের শক্তিশালী করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল। তিনি বলেন, নারীর অধিকার কোনো দয়া নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের অংশ। পরিবর্তিত ভূরাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সংলাপ শেষে বিগত কর্মশালাগুলোতে অংশগ্রহণকারী তরুণ নারী রাজনীতিকদের মধ্যে সনদ বিতরণ করা হয়।