অর্থবছর পরিবর্তন : সংস্কার নাকি নতুন প্রশাসনিক ঝুঁকি?

অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বর্তমানে ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত অর্থবছর পরিচালিত হলেও তা ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চে নেওয়ার উদ্যোগের কথা সামনে এসেছে। তবে এ পরিবর্তনকে শুধু ক্যালেন্ডারের তিন মাস এগিয়ে নেওয়া হিসেবে দেখছেন না বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট শেখ আশ্বাফুজ্জামান এফসিএ। তার মতে, অর্থবছর পরিবর্তনের সঙ্গে বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব আহরণ, সরকারি ব্যয়, উন্নয়ন প্রকল্প, কর ব্যবস্থা, ব্যাংকিং খাত, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, নিরীক্ষা এবং জাতীয় অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের ধারাবাহিকতা সরাসরি জড়িত। ফলে যথাযথ প্রভাব মূল্যায়ন ও অংশীজনের মতামত ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হলে সংস্কারের পরিবর্তে প্রশাসনিক ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। অর্থবছর পরিবর্তনের যৌক্তিকতা, সম্ভাব্য ঝুঁকি ও করণীয় নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

প্রশ্ন : অর্থবছর ১ জুলাই-৩০ জুনের পরিবর্তে ১ এপ্রিল-৩১ মার্চ করার উদ্যোগকে কীভাবে দেখছেন?

শেখ আশ্বাফুজ্জামান : অর্থবছর পরিবর্তন নিছক ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ পরিবর্তনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে রাষ্ট্রের বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব আহরণ, সরকারি ব্যয়, উন্নয়ন প্রকল্প, হিসাবরক্ষণ, নিরীক্ষা, কর নির্ধারণ, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন এবং জাতীয় অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই এমন মৌলিক পরিবর্তনের আগে এর অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও ব্যবসায়িক প্রভাব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। আমার মূল প্রশ্ন হলো বর্তমান ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন অর্থবছরের কোন নির্দিষ্ট সমস্যা ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ অর্থবছর সমাধান করবে? এর সুস্পষ্ট উত্তর না থাকলে পরিবর্তনের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন থাকবে।

প্রশ্ন : অর্থবছর পরিবর্তন হলে জাতীয় বাজেটে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?

শেখ আশ্বাফুজ্জামান : সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে বাজেট ব্যবস্থাপনায়। মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন সময়সূচির সঙ্গে বাজেট প্রাক্কলন, সংশোধিত বাজেট ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা সাজাতে হবে। উন্নয়ন বাজেটের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন হবে। বিদ্যমান কাঠামোতেই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা দুর্বলতা রয়েছে। এর মধ্যে অর্থবছর পরিবর্তন প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।

প্রশ্ন : রাজস্ব খাতে এর প্রভাব কতটা হতে পারে?

শেখ আশ্বাফুজ্জামান : রাজস্ব প্রশাসনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। আয়কর, মূল্য সংযোজন কর, শুল্ক, উৎসে কর, অগ্রিম কর, কর রিটার্ন ও কর নিরীক্ষার সময়সূচি নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কোন সময়ের আয় কোন করবর্ষে দেখাবে, কোম্পানির হিসাব বছর কী হবে এবং পুরনো ও নতুন করবর্ষের মধ্যবর্তী সময় কীভাবে গণনা হবে  এসব বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন।

প্রশ্ন : ব্যবসা ও কোম্পানিগুলোর জন্য কী ধরনের সমস্যা হতে পারে?

শেখ আশ্বাফুজ্জামান : কোম্পানিগুলোর হিসাব বছর ও সরকারের অর্থবছরের মধ্যে সমন্বয়ের নতুন প্রশ্ন তৈরি হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানকে ৩১ মার্চে হিসাব বন্ধ করতে বাধ্য করা হবে কি না, নাকি তারা নিজস্ব হিসাব বছর বজায় রাখবে, তা পরিষ্কার করতে হবে। আর্থিক প্রতিবেদন, কর নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থায় প্রতিবেদন দেওয়ার ক্ষেত্রে সমন্বয় না থাকলে ব্যবসায়ীদের পরিপালন ব্যয় বাড়বে।

প্রশ্ন : ব্যাংকিং খাতে এর প্রভাব কী হতে পারে?

শেখ আশ্বাফুজ্জামান : ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রক প্রতিবেদন, আয় স্বীকৃতি, ঋণের সংস্থান, কর হিসাব, বার্ষিক আর্থিক বিবরণী ও নিরীক্ষার সময়সূচি পুনর্বিন্যাস করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সব নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিবেদন ক্যালেন্ডারের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন হবে। তা না হলে পরিপালন-সংক্রান্ত জটিলতা ও ভুলের ঝুঁকি বাড়বে।

প্রশ্ন : জাতীয় অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে কি?

শেখ আশ্বাফুজ্জামান : অবশ্যই। জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব, বাজেট ঘাটতি, সরকারি ঋণ, জিডিপির অনুপাতে রাজস্ব ও ব্যয়, উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন সূচক অর্থবছরভিত্তিক প্রকাশ করা হয়। হঠাৎ এপ্রিল-মার্চ কাঠামো চালু হলে পুরনো ও নতুন তথ্যের তুলনাযোগ্যতা নিয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে। তখন কোনো পরিবর্তন প্রকৃত অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে হয়েছে, নাকি শুধু হিসাবের সময়কাল পরিবর্তনের কারণে হয়েছে, তা বোঝা কঠিন হবে।

প্রশ্ন : অর্থবছর পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কোথায় দেখছেন?

শেখ আশ্বাফুজ্জামান : সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো রূপান্তরকাল। ধরুন, একটি হিসাব ৩০ জুনে শেষ হয়ে পরবর্তী হিসাব ৩১ মার্চে শেষ হলো। মাঝের ৯ মাসের রাজস্ব, ব্যয়, ঋণ, সুদ, কর, মুনাফা, অবচয়, মজুদ ও নগদ প্রবাহ কীভাবে হিসাব হবে তা আগে নির্ধারণ করতে হবে। না হলে কয়েক বছর পর্যন্ত আর্থিক তথ্যের তুলনাযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

প্রশ্ন : তাহলে অর্থবছর পরিবর্তনের আগে সরকারের কী করা উচিত?

শেখ আশ্বাফুজ্জামান : এটিকে শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা উচিত নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল, আইসিএবি, আইসিএমএবি, ব্যবসায়ী সংগঠন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং অর্থনীতিবিদদের মতামত নেওয়া দরকার। পাশাপাশি স্বাধীন প্রভাব মূল্যায়ন করা উচিত। সেখানে রাজস্ব, সরকারি অর্থব্যবস্থা, ব্যবসা, হিসাব-নিরীক্ষা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান সব দিক বিবেচনা করতে হবে।

প্রশ্ন : আপনার মতে, অর্থবছর পরিবর্তন করা উচিত কি না?

শেখ আশ্বাফুজ্জামান : সংস্কার প্রয়োজন হলে অবশ্যই পরিবর্তন করা যেতে পারে। কিন্তু পরিবর্তনের আগে প্রশ্ন করতে  হবে  আমরা কোন সমস্যার সমাধান করছি, নতুন ব্যবস্থায় কী সুবিধা পাব, এর খরচ কত এবং ঝুঁকি কে বহন করবে। একটি দেশের আর্থিক ক্যালেন্ডার তার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তাই গবেষণা, অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা, সুনির্দিষ্ট রূপান্তর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন রোডম্যাপ ছাড়া হঠাৎ পরিবর্তন করা ঠিক হবে না।

আমার আপত্তি অর্থবছর পরিবর্তনের বিরুদ্ধে নয়; আপত্তি হলো,  কেন পরিবর্তন, কী লাভ, কী খরচ, কী ঝুঁকি এবং কীভাবে রূপান্তর হবে এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট না করে পরিবর্তন করা। তা না হলে এটি কেবল ক্যালেন্ডার সংস্কার হবে, অর্থনৈতিক সংস্কার নাও হতে পারে।