কৈশোরের নায়কের সঙ্গে টক্কর

ম্যাকাই টেস্টের প্রথম দিনের খেলা শেষে দলের প্রতিনিধি হয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন অস্ট্রেলিয়ার পেসার মিচেল স্টার্ক। একটু পর সেখানে হাজির শরীফুল ইসলাম। গতকাল বাইরের মতো মাঠের পারফরম্যান্সেও স্টার্কের অর্জনে ভাগ বসান তিনি। সকালে অজিদের পেস আক্রমণের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করেন নাজমুল হোসেন শান্তরা। স্টার্কের ৬ উইকেটের তোপে মাত্র ৬৪ রানে অলআউট হয় তারা। কিন্তু বিকেলে সব আলো কেড়ে নেন শরীফুল। আগের ১৩ টেস্টের ক্যারিয়ারে যিনি কখনো এক ইনিংসে তিন উইকেটের বেশি পাননি, তিনি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে তুলে নিলেন ৬ উইকেট। আজ নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও আছে তার সামনে।

এই সফরের জন্য দেশ ছাড়ার আগে নিজেদের আবেগ আর রোমাঞ্চ লুকাননি অধিনায়ক শান্ত। প্রতিপক্ষ দলে স্টার্ক, প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজলউড, নাথান লায়নের মতো তারকারা খেলবেন। যাদের বিপক্ষে খুব বেশি খেলার সুযোগ হয়নি বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের। শান্ত বলেছিলেন, ‘সাধারণত এ ধরনের বোলিং আমরা খুব বেশি একটা খেলার সুযোগ পাই না, বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে। সব সময় টেলিভিশনে দেখারই সুযোগ হয়। এবার খেলতে পারব। একজন খেলোয়াড় হিসেবে এটা ব্যক্তিগতভাবে আমার ভেতরে অনেক রোমাঞ্চ কাজ করছে।’

অথচ শান্তর টেস্ট অভিষেক হয়েছে ৯ বছর আগে, ২০১৭ সালে। সে তুলনায় শরীফুলের অভিজ্ঞতা অনেক কম। মাত্র ৫ বছর দেশের জার্সিতে টেস্ট খেলছেন তিনি। নিজেও বাঁহাতি পেসার হওয়ায় কৈশোর থেকে স্টার্ককে আদর্শ মানেন শরীফুল। গতকাল প্রথমবার তার বিপক্ষে নেমে তারই সাজানো মঞ্চে ভাগ বসান বাংলাদেশি পেসার। পরে সংবাদ সম্মেলনে স্টার্কের ছেড়ে যাওয়া চেয়ারে বসে নিজের আদর্শের নাম উচ্চারণ করতে কণ্ঠে ফুটে উঠল শ্রদ্ধা আর রোমাঞ্চ। এ নিয়ে শরীফুল বলেন, ‘দেশের মধ্যে মোস্তাফিজুর রহমান ভাই আমার আদর্শ। তবে সুইংয়ের দিক থেকে স্টার্ককেই আমি অনেক পছন্দ করি। পেস ও সুইং, দুই দিক থেকেই তাকে অনুসরণ করা হয়। এই ম্যাচে তার বিপক্ষে খেলছি, সেও ছয় উইকেট পেয়েছে, আমিও ছয় উইকেট পেয়েছি, এটা খুব ভালো লাগছে।’ এরপরই যোগ করেন, ‘আমি যখন বয়সভিত্তিক ক্রিকেট খেলতাম, তখন তাকে দেখতাম এবং তার বোলিং আমার ভালো লাগত। বিশেষ করে তার ইনসুইং বোলিং। এখন তার সঙ্গে খেলছি, তাই রোমাঞ্চিত লাগছে।’

গতকাল সকালে ড্রেসিংরুমে বসে স্টার্কের বোলিং দেখার সময় শরীফুলের দৃষ্টি স্থির ছিল লেংথের দিকে। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা যখন একই ধরনের বলে বারবার পরাস্ত হচ্ছিলেন, তখন তিনি বোঝার চেষ্টা করেন, এই উইকেটে সাফল্যের চাবিকাঠি ঠিক কোথায়। এই পথ অনুসরণ করে সফল শরীফুল, ‘অস্ট্রেলিয়ান কন্ডিশনে সব সময় পেসাররা ভালো করে। স্টার্ক অনেক দিন ধরে খেলছেন এবং ভালো করছেন। আমি দেখছিলাম কোন লেংথে বল করলে বোলারদের জন্য সুবিধা পাওয়া যায়।’

সেই পর্যবেক্ষণ কাজে লাগিয়ে নিজের স্পেলে ভেতরে-বাইরে সুইং আর হঠাৎ ওঠা বাউন্সারের মিশেলে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানদের প্রতিটি বলকেই নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেন শরীফুল। তবে কাজটা সহজ ছিল না তার জন্য। চোটের কারণে গোটা সফর থেকে ছিটকে যাওয়ার শঙ্কায় পড়েন তিনি। এই কারণে ডারউইন টেস্টে খেলা হয়নি তার। পরে দলে সঙ্গে যোগ দিয়ে ম্যাকাই টেস্টে ফেরেন। এরপর অজি ব্যাটসম্যানদের দুর্বলতা খুঁজে বের করতে ভিডিও ফুটেজের সাহায্য নেন শরীফুল, ‘যখন আমি আমাদের দেশে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে খেলেছি, তখন আলাদা সংস্করণ ছিল। তাই এখানে টেস্টের অনেক ভিডিও ফুটেজ দেখেছি এবং প্রতিটি ব্যাটসম্যানকে কীভাবে বল করতে হবে, সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়েছি। সেখান থেকেই আমি সাফল্য পেয়েছি।’ তবে ম্যাকাইয়ের বাতাসও সাহায্য করে বলে দাবি তার, ‘আমরা যে পাশ থেকে বোলিং করেছি, ওই সময় বাতাসটা আমাদের বিপরীত দিক থেকে আসছিল, যার কারণে বলটা একটু বেশি সুইং করছিল।’

এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে কৈশোরের নায়কের সামনেই নিজেই উজ্জ্বল শরীফুল। কিন্তু এই অর্জনেও তৃপ্ত নন তিনি। গত জুনে ঘরের মাঠে ওয়ানডে সিরিজের এক ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ছয় উইকেট নিয়েও দলকে জেতাতে পারেননি এই বাঁহাতি পেসার। এবার একই তিক্ত স্বাদ আর পেতে চান না, ‘এই মুহূর্তে অনুভূতি খুব ভালো। প্রথমবার পাঁচ উইকেট পাওয়া, সবারই ভালো লাগে। আগেরবার যখন পেয়েছিলাম, সেটাও ভালো লেগেছিল। তবে সবচেয়ে ভালো লাগবে যদি ম্যাচটা জিততে পারি। কারণ আগেরবার পাঁচ উইকেট পাওয়ার পরও আমরা ম্যাচটা হেরে গিয়েছিলাম। তাই এখনো শুধু পাঁচ উইকেট পাওয়া নিয়ে খুব বেশি খুশি হচ্ছি না। ম্যাচটা জিততে পারলে অনেক বেশি খুশি হব।’