ব্যাটিং-ধসের পর তান্ডব শরীফুলের

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩১ এএম

বাংলাদেশের ইনিংসের ১৭তম ওভার। ব্যাটসম্যান মেহেদী হাসান মিরাজ যখন অস্ট্রেলিয়ার পেসার বিউ ওয়েবস্টারের করা একটি বলে মিড অফ দিয়ে চার মারেন, তখন গ্যালারিতে লাল-সবুজের সমর্থকদের সে কী উল্লাস! অথচ এই চার রানে বাংলাদেশ দলের সংগ্রহ মোটে ২৭। পরিস্থিতি হিসেবে সেটাই স্বস্তি ও আনন্দের উপলক্ষ হয়ে আসে বাংলাদেশি সমর্থকদের কাছে। গতকাল ম্যাকাইয়ে মিচেল স্টার্কের আগুনঝরা এক স্পেলে যেভাবে দুঃস্বপ্নের মতো ইনিংস শুরু হয় সফরকারীদের, তাতে টেস্ট ইতিহাসের সর্বনিম্ন ২৬ রানের মধ্যে গুটিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় পড়েন নাজমুল হোসেন শান্তরা।

৬ উইকেট হারানোর পর মিরাজের মারা ওই বাউন্ডারির সৌজন্যে নতুন রেকর্ডে নাম তুলতে হয়নি তাদের। পরে শঙ্কা কাটিয়ে নিজেদের টেস্ট ইতিহাসের সর্বনিম্ন (৪৩) রানের গন্ডিও টপকে যায় দলটি। যদিও শেষ পর্যন্ত অলআউট হয় ৬৪ রানে। অবশ্য ব্যাটিং-ধসের পর তান্ডব চালান শরীফুল ইসলাম। এই বাঁহাতি পেসারের ৬ উইকেটের তোপে এখনো লড়াইয়ে টিকে আছে বাংলাদেশ দল। অজিদের সংগ্রহ ৮ উইকেটে ১৬৫ রান। ১০১ রানে লিড নিয়েছে তারা। ১৭ রানের অবিচ্ছেদ্য জুটিতে ক্যামেরুন গ্রিন ৫১ ও ন্যাথান লায়ন ১০ রান নিয়ে দ্বিতীয় দিন ব্যাটিংয়ে নামবেন।

মূলত ম্যাকাই টেস্টের প্রথম দিনের গল্পটা দুই বাঁহাতি পেসারের। সকালে স্টার্ক-তোপে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় বাংলাদেশ দল। দিনের শেষ বিকেলে বল হাতে বদলা নেন শরীফুল। তার আগে দলের বিপর্যয়ে ১১ নম্বর ব্যাটসম্যান হিসেবে নেমে ইনিংস সর্বোচ্চ ১৪ রান করেন তিনি। ১৫০ বছরের টেস্ট ইতিহাসে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এই প্রথম এমন ঘটনা দেখল ক্রিকেট-বিশ্ব। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ব্যাটার হিসেবে ১১ নম্বরে নেমে ইনিংস সর্বোচ্চ রান করেন শরীফুল। গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায় টস হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে বাংলাদেশের শুরুটা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। প্রথম বলেই সাদমান ইসলামকে গালিতে ক্যাচ বানিয়ে ফেরান স্টার্ক। এরপর বাংলাদেশের ব্যাটিং বিভাগকে তছনছ করে দেন তিনি। নিজের করা দ্বিতীয় ও তৃতীয় ওভারে তানজিদ হাসান তামিম, শান্ত ও মুমিনুল হককে ফিরিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে রাখেন এই পেসার। প্রথম ৪ উইকেটের মধ্যে মুমিনুল (৯) ছাড়া কেউই রানের দেখা পাননি। এমন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নেওয়ার পরিবর্তে উল্টো দলকে বিপদে ফেলেন লিটন দাস। তিনিও খালি হাতে ফেরেন। ১২ রানে ৫ উইকেট হারানোর পর অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিমও অভিজ্ঞতার মান রাখতে পারেননি। ৪২ বল খেলে উইকেটে থিতু হয়েও ৫ রান করে থামেন তিনি। পরে মিরাজ (১১) ও হাসান মাহমুদের (১০) সপ্তম উইকেটে ১৫ রানের জুটিতে সর্বনিম্ন রানের আগে অলআউট হওয়ার শঙ্কা থেকে মুক্ত হয় বাংলাদেশ। শেষ উইকেটে তাইজুল ইসলাম (১১) ও শরীফুলের ২৫ রানের জুটিতে দলীয় সংগ্রহ ৫০ পার করে ৬৪ রানে থামেন সফরকারীরা।

এই জুটিও ভাঙেন স্টার্ক। তার প্রথম স্পেলটি ছিল অবিশ্বাস্য। ৬ ওভারে ৪ মেডেনসহ মাত্র ৫ রান দিয়ে ৫ উইকেট নেন। মাত্র ২২ বলেই এই পাঁচ উইকেটের কোটা পূর্ণ করেন তিনি। গত বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১৫ বলে ৫ উইকেট নিয়ে টেস্টে দ্রুততম এই রেকর্ডের মালিক স্টার্কই। শেষ পর্যন্ত ১২ রানে ৬ উইকেট সংগ্রহ তার।

বাংলাদেশের ইনিংস শেষ হওয়ার পরও দিনের নাটক শেষ হয়নি। তাসকিন আহমেদ দ্রুত ম্যাট রেনশকে ফিরিয়ে প্রথম ধাক্কা দেওয়ার পর আক্রমণে এসে দ্বিতীয় বলেই ট্রাভিস হেডকে থামান শরীফুল (২২)। একই ওভারে বোল্ড করেন মার্নাস লাবুশেনকে। তবে স্টিভেন স্মিথ ও গ্রিন ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। চতুর্থ উইকেটে দুজনের ৭৭ রানের জুটি স্বাগতিকদের বড় লিডের পথে রাখে। তখনই আবার আঘাত শরীফুলের। ৪২ রান করা স্মিথকে ফিরিয়ে জুটি ভাঙেন তিনি। সেখান থেকেই অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে শুরু হয় আরেক দফা ধস। গ্রিন এক প্রান্ত আগলে রাখলেও অন্য প্রান্তে সঙ্গী পাচ্ছিলেন না। ৩১তম ওভারে মিরাজকে আক্রমণে আনেন অধিনায়ক শান্ত। প্রথম ওভারেই সাফল্য এনে দেন এই স্পিনার। ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে শট খেলতে গিয়ে মিড অনে ক্যাচ দেন ৫০তম টেস্ট খেলতে নামা অ্যালেক্স ক্যারি।

এরপর আবার শরীফুলের ঝড়। ওয়েবস্টারকে ভেতরে ঢোকা বলে এলবিডব্লিউ করার পর একই ওভারে বাউন্সারে প্যাট কামিন্সকে চমকে দেন তিনি। তাতেই টেস্টে প্রথমবারের মতো পাঁচ উইকেট পূর্ণ হয় তার। আনন্দের রেশ কাটার আগেই স্টার্ককে বোল্ড করে ৬ উইকেট পূর্ণ করেন এই বাঁহাতি পেসার। আগে ১৩ টেস্টে এক ইনিংসে তিনটির বেশি উইকেট পাননি শরীফুল। এবার এক দিনেই তার শিকার ৬টি। সঙ্গে ব্যাট হাতে দলের সর্বোচ্চ রান। ড্রেসিংরুমে পাওয়া বার্তায় মনোযোগ হারাননি বলে দাবি তার, ‘ড্রেসিংরুমে একটাই বার্তা ছিল, এখনো খেলা শেষ হয়নি। আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ আছে। তাই কামব্যাক করার চেষ্টা করতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত