এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হারে ধস নামলেও উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনে জোয়ার দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এর আগে সর্বোচ্চ ৭০ হাজার খাতা পুনর্নিরীক্ষণের রেকর্ড থাকলেও এবার তা বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৬০১টি। শুধু চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে নয়, দেশের ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের পাশাপাশি মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে এবার ৪ লাখ ২ হাজার ৫১ পরীক্ষার্থীর ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬ খাতা পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
এবারের পরীক্ষার ফলাফলে সারা দেশে গড় পাসের হার ছিল ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। এর মধ্যে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশ। জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হারও কম। ফলাফলের নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনেও। গত ১০ আগস্ট এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরপরই ১১ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত ৪ লাখ ২ হাজার ৫১ পরীক্ষার্থী পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করে।
আবেদন বেশি হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের প্রফেসর মো. বোরহান উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবার আসলে পুনর্নিরীক্ষণ হচ্ছে না। এবার হবে পুনর্মূল্যায়ন। অর্থাৎ পরীক্ষকরা পুরো খাতাটি নতুন করে আবারও দেখবেন। এতে যদি কোনো উত্তরের বিপরীতে নম্বর কম দেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন তাহলে তিনি নম্বর বাড়িয়ে দিতে পারবেন। আর এ কারণে এবার বেশি শিক্ষার্থী আবেদন করেছে।’
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর শরীফ মোর্শেদ রেজা বলেন, ‘এবার ব্যবহারিকের নম্বরও আমরা বিবেচনা করব। আগে যেখানে শুধু সৃজনশীল উত্তরপত্র নিরীক্ষণ করা হতো, এবার ব্যবহারিকও যুক্ত করা হয়েছে। এতে বেড়ে গেছে খাতার সংখ্যা।’
এবার নিরীক্ষণ নয়, পুনর্মূল্যায়ন হচ্ছে : শিক্ষা বোর্ডের বিজ্ঞপ্তিতে পুনর্নিরীক্ষণের কথা বলা হলেও বাস্তবে এবার পুনর্মূল্যায়ন হচ্ছে বলে জানান আন্তঃশিক্ষা বোর্ড ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর জেসমিন তাসলিমা বানূ। তিনি বলেন, ‘এবার আমরা সব উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন করব। এর আগে পুনর্নিরীক্ষণ হলেও এবার তা পুনরায় মূল্যায়ন করা হবে। এতে কোনো শিক্ষার্থী যদি উত্তরপত্রে সঠিক উত্তর দেওয়ার পরও পরীক্ষক কম নম্বর দিয়ে থাকেন তাহলে তাকে প্রাপ্য নম্বর দেওয়া হবে। এতে তার নম্বর বাড়বে।’
কিন্তু যদি কোনো পরীক্ষক বেশি নম্বর দিয়ে থাকেন তাহলে তার নম্বর কি কমবে? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, নম্বর যেটা দেওয়া হয়েছে সেটা আর কমানো হবে না।’
কম পেলে বাড়ানো হবে, কিন্তু বেশি পেলে কেন কমানো হবে না? এই প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর জেসমিন তাসলিমা বানূ বলেন, ‘যেহেতু আমাদের বিজ্ঞপ্তিতে নম্বর কমানোর কথা উল্লেখ ছিল না, তাই এবার আমরা কমাচ্ছি না। তবে আগামী বছর কমানো হবে। অর্থাৎ পরীক্ষক কম দিলে পুনর্মূল্যায়নে সঠিক নম্বর দেওয়া হবে এবং বেশি নম্বর দিলে তা কমিয়ে প্রাপ্য নম্বর নিশ্চিত করা হবে।’
পুনর্মূল্যায়নে ব্যবহারিক কেন? : অতীতের কোনো পাবলিক পরীক্ষায় ব্যবহারিকে নম্বর পুনর্নিরীক্ষণ করা হয়নি। পরীক্ষার্থীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শুধু সৃজনশীল উত্তরপত্রের নম্বর নিরীক্ষণ করা হতো। এবার ব্যবহারিকের খাতাও পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, ‘ব্যবহারিক পরীক্ষার খাতাও পুনর্মূল্যায়নের আওতায় এনেছি। অনেক সময় অনেক শিক্ষার্থী এক নম্বরের জন্য ফেল বা গ্রেড থেকে বঞ্চিত হয়। তা যাতে না ঘটে সেজন্য ব্যবহারিকের নম্বরও পর্যালোচনা করা হবে।’
নৈর্ব্যত্তিক উত্তরপত্র কেন পুনর্মূল্যায়ন করা হবে না? এই প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, ‘নৈর্ব্যত্তিক মূল্যায়নের কাজটি যেহেতু মেশিনের সাহায্যে হয়ে থাকে তাই সেখানে ভুল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ জন্য তা পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ নেই।’
পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নের মধ্যে পার্থক্য কী? : পাবলিক পরীক্ষা অ্যাক্ট ১৯৮০-এ বলা হয়েছে উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণ বলতে উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন বুঝাবে না। এতে উত্তরপত্রের অভ্যন্তরে কোনো প্রশ্নোত্তর পরীক্ষক বা প্রধান পরীক্ষক কর্তৃক নম্বর না দিয়ে থাকলে তাতে নম্বর দেওয়া যাবে, উত্তরপত্রের অভ্যন্তরের কোনো নম্বর কভার পৃষ্ঠায় ওঠাতে ভুল হলে তা সংশোধন করা যাবে, কভার পৃষ্ঠায় ওঠানোর নম্বরের যোগফল ভুল হলে তা সংশোধন করা যাবে, পরীক্ষক বা প্রধান পরীক্ষক কর্তৃক নম্বর কোনো অবস্থাতেই সংশোধন করা যাবে না বলে উল্লেখ রয়েছে। এই পদ্ধতিতে শিক্ষা বোর্ডগুলো পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের সাত দিনের মধ্যে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফিসহ পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন গ্রহণ করে। পরবর্তীতে যেসব বিষয় পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করা হয়, সেসব বিষয়ের উত্তরপত্র নিরীক্ষণ করে ফল প্রকাশ করে থাকে শিক্ষা বোর্ডগুলো। তবে এবার ভিন্ন।
পাবলিক পরীক্ষা শুরুর আগেই শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন পাবলিক পরীক্ষা অ্যাক্ট ১৯৮০ সংশোধনের কথা বলেছিলেন। সেই আলোকে এবার পুনর্মূল্যায়ন হচ্ছে।
সাধারণ অর্থে পুনর্মূল্যায়ন বলতে আমরা বুঝি তা নতুন করে মূল্যায়ন করা। এতে নম্বর কমতেও পারে, একই থাকতে পারে, আবার বাড়তেও পারে। অর্থাৎ তিনটি সুযোগই রয়েছে। এ বিষয়ে প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, পুনর্মূল্যায়নে নম্বর বাড়লে যেমন মেনে নিতে হবে তেমনিভাবে নম্বর কমে গেলেও মেনে নিতে হবে। এখানে উভয় ঘটনাই ঘটতে পারে। তবে এবার শুধু কম নম্বর দিয়ে থাকলে বাড়ানো হবে, কমানো হবে না। আগামীতে বাড়ানো, কমানো কিংবা একই রাখা সবই চালু হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এবারের পুনর্মূল্যায়নে কোনো উত্তরপত্র অমূল্যায়িত থাকলে তা যেমন মূল্যায়ন করা হবে তেমনিভাবে প্রাপ্ত নম্বরের যোগে ভুল হলেও তা সংশোধন করা হবে।
সবচেয়ে বেশি আবেদন গণিত ও ইংরেজিতে : চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এবার গণিত ও ইংরেজিতে বেশি ফেল করেছে। যথারীতি পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনও এই দুই বিষয়ে বেশি জমা পড়েছে। উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, গণিতে ১৩ হাজার ৮২৮ খাতা পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে এবং ইংরেজিতে করতে হবে ২০ হাজার ৪০০। এই চিত্র অন্য সব বোর্ডেও একই। সিলেট বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর বিলকিস ইয়াসমিন বলেন, ‘এবার বেশিরভাগই গণিত ও ইংরেজি বিষয়ের জন্য আবেদন করেছে।’
উল্লেখ্য, গত ১০ আগস্ট এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। পরীক্ষার পর সন্তোষজনক ফল না পাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করে। এ কারণে ৪ লাখ ২ হাজার ৫১ শিক্ষার্থী আবেদন করলেও খাতা দেখতে হবে ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬টি। এর মধ্যে সৃজনশীল খাতা রয়েছে ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫৫ ও ব্যবহারিক ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৭১টি। আগামী ১০ সেপ্টেম্বর পুনর্নিরীক্ষণের ফল প্রকাশিত হতে পারে।