‘সম্পত্তির লোভে পাগল বানিয়েছে’ ভাইদের বিরুদ্ধে অভিযোগ

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার রাজিবপুর ইউনিয়নের রামকৃষ্ণপুর গ্রামে প্রায় দুই বছর ধরে শিকলে বন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন ৪৫ বছর বয়সী ইলিয়াস উদ্দিন ওরফে সবুজ মিয়া। ঘরের তিনটি খুঁটির সঙ্গে একাধিক তালা দিয়ে শিকল আটকানো হয়েছে। দুই পায়েও রয়েছে তালা। বাঁধা অবস্থাতেই তাঁকে খাবার খেতে, ঘুমাতে এবং মলমূত্র ত্যাগ করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন এভাবে থাকার কারণে ঘরের ভেতর তৈরি হয়েছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও দুর্গন্ধ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সম্পত্তির লোভে সবুজকে তাঁর দুই ভাই শিকলে বেঁধে রেখেছেন। তাঁকে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ হিসেবে দেখিয়ে সম্পত্তি ও বাবার ভাতার টাকা ভোগ করার অভিযোগও করেছেন তাঁরা।

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সবুজের মা জহুরা খাতুন ও ভাই খোরশেদ আলম। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন সবুজ। মানুষের বাড়িতে ঢুকে পড়া ও মানুষকে বিরক্ত করার কারণে বাধ্য হয়েই তাঁকে শিকলে বেঁধে রাখা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, রামকৃষ্ণপুর গ্রামের একটি ঘরের ভেতর শিকলে বাঁধা অবস্থায় বসে আছেন সবুজ। ঘরের তিনটি খুঁটির সঙ্গে একাধিক তালা দিয়ে শিকল আটকানো। তাঁর দুই পায়েও তালা লাগানো। দীর্ঘ সময় একই জায়গায় বাঁধা থাকার কারণে ঘরটির ভেতরের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠেছে।

সাংবাদিকদের দেখে সবুজ নিজেকে সুস্থ দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘আমি সুস্থ ছিলাম। আমাকে বেঁধে রেখে সম্পত্তির লোভে পাগল বানিয়েছে আমার দুই ভাই। আমার বাঁধন খুলে দেন। আপনাদের দাদা-ভাই ডাকব।’

কথার মাঝে ইংরেজিতেও কয়েকটি কথা বলেন তিনি—‘সামথিং এনি টাইম’, ‘হাউ আর ইউ?’, ‘আই লাভ ইউ’।

সবুজের একমাত্র ছেলে আনন্দ চৌধুরী নিরবের বয়স ১২ বছর। সে উচাখিলা ইউনিয়নের রেডিয়াম মডেল স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবাকে শিকলে বাঁধা অবস্থায় দেখে তার চোখে পানি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিরব বলে, ‘সবার বাবা তাদের সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যায়, ঘুরতে নিয়ে যায়। যা বলে, তা কিনে দেয়। কিন্তু আমার বাবা শিকলে বাঁধা। আমার বাবা খুব ভালো মানুষ। আপনারা আমার বাবার বাঁধন খুলে দেন।’

নিরবের একমাত্র ছোট বোন বন্যা চৌধুরী তমা বর্তমানে কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলায় তার ফুফু আছমা বেগমের বাড়িতে থাকে।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৯৫ সালে উচাখিলা উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন সবুজ। পরে ঈশ্বরগঞ্জ সরকারি কলেজে ভর্তি হলেও এইচএসসি পরীক্ষা দেননি। এরপর ময়মনসিংহ শহরে কসমেটিকসের ব্যবসা করতেন তিনি। স্ত্রী পপি আক্তার ও দুই সন্তানকে নিয়ে সংসার ছিল তাঁর।

স্থানীয় আব্দুল মোতালেব, নূরুল ইসলাম (৬৫), সুজন ফকির (৪২)সহ অন্তত ১৫ জন বাসিন্দার দাবি, সবুজ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতেন। তাঁদের ভাষ্য, তিনি সৎ ও মিশুক প্রকৃতির মানুষ ছিলেন।

তাঁদের অভিযোগ, প্রায় আড়াই বছর আগে সম্পত্তি লিখে নেওয়া এবং বাবার ভাতার টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে সবুজকে তাঁর দুই ভাই আব্দুল মতিন (৪২) ও খোরশেদ আলম (৩৮) শিকলে বেঁধে রাখেন।

পার্শ্ববর্তী দেবস্থান গ্রামের বাসিন্দা হাসিম উদ্দিন বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে প্রায় প্রতিদিনই সবুজের বাড়ির সামনে দিয়ে বাজারে যাই। সবুজের মতো মানুষ হয় না। সে কোনো দিন পাগল ছিল না। তার ভাইয়েরা সম্পত্তির জন্য তাকে পাগল বানিয়েছে।’

এলাকাবাসীর দাবি, সবুজকে এখন পর্যন্ত যথাযথ চিকিৎসা করানো হয়নি। বরং তাঁকে ঘরে আটকে রেখে দীর্ঘদিন শিকলে বেঁধে রাখা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন সবুজের মা জহুরা খাতুন। তিনি বলেন, ‘বিষয়টা তেমন কিছু নয়। ৩২ বছর ধরে আমার ছেলের মানসিক সমস্যা। আগে ওষুধ খেলে নিয়ন্ত্রণে থাকত। এভাবেই সে পড়ালেখা করেছে, বিয়েও করেছে, সন্তানও হয়েছে।’

জহুরা খাতুনের দাবি, প্রায় তিন বছর আগে বাড়ির একটি গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে সবুজের ওপর ‘জিনে ভর’ করে। এরপর তাঁর আচরণ আরও অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, ‘অনেক চিকিৎসা করিয়েছি। কিন্তু সুস্থ হয়নি। মানুষের বাড়িঘরে ঢুকে যেত, মানুষকে অত্যাচার-নির্যাতন করত। তাই তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে।’

তবে এলাকাবাসীর দাবি, সবুজ কারও ওপর হামলা বা নির্যাতন করতেন—এমন কোনো ঘটনা তাঁরা দেখেননি।

সম্পত্তির জন্য ভাইকে শিকলে বেঁধে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সবুজের ভাই খোরশেদ আলম। তিনি বলেন, ‘আমাদের ওপর আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। আমার ভাইকে অনেক চিকিৎসা করিয়েছি, এখনো চিকিৎসা চলছে। কিন্তু সুস্থ হয়নি। আমরা তিন ভাই এখনো একসঙ্গেই আছি, সংসার আলাদা হয়নি। তাই সম্পত্তি ভোগ করার প্রশ্নই ওঠে না।’

খোরশেদের দাবি, সবুজ মানুষকে বিরক্ত করেন বলেই তাঁকে বেঁধে রাখা হয়েছে।

পরিবার ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সবুজ অসুস্থ হওয়ার প্রায় এক বছর পর তাঁর স্ত্রী পপি আক্তার দুই সন্তানকে রেখে বাবার বাড়িতে চলে যান। বর্তমানে তিনি ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন।

একসময় ব্যবসা, সংসার ও সন্তান নিয়ে স্বাভাবিক জীবন কাটানো সবুজের জীবন এখন আটকে আছে কয়েকটি শিকল আর তালার মধ্যে।

সবুজের প্রকৃত মানসিক অবস্থার বিষয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মূল্যায়ন কী, তা স্পষ্ট নয়। চিকিৎসার কাগজ দেখতে চাইলে তাঁর মা জহুরা খাতুন বলেন, কাগজপত্র এখন কোথায় আছে তা খুঁজে পাওয়া কঠিন। সম্ভবত সেগুলো খোরশেদের কাছে রয়েছে।

খোরশেদকে চিকিৎসাপত্র দেখাতে বলা হলে তিনি ‘দেব’ ও ‘দিচ্ছি’ বলে তিন দিন পার হলেও তা দেখাননি।

পরিবারের দাবি, সবুজ দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন এবং তাঁর চিকিৎসাও চলছে। অন্যদিকে এলাকাবাসীর দাবি, তিনি সুস্থ ছিলেন এবং সম্পত্তির বিরোধের জেরে তাঁকে শিকলে বন্দী করা হয়েছে।

দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী দাবির মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, একজন মানুষকে প্রায় দুই বছর ধরে শিকলে বেঁধে রাখার আইনগত ও চিকিৎসাগত ভিত্তি কী।

সবুজের ক্ষেত্রে সত্যিই মানসিক অসুস্থতা থাকলে তাঁর প্রয়োজন চিকিৎসা ও নিরাপদ পরিচর্যা। আর যদি সম্পত্তির বিরোধের কারণে তাঁকে আটকে রাখা হয়ে থাকে, তাহলে সেটিও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ। বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্য উদ্‌ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

শিকলে বাঁধা সবুজের আকুতিও যেন সেই প্রশ্ন আরও জোরালো করে তোলে—‘আমার বাঁধন খুলে দেন।’

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা হাসান কিবরিয়া বলেন, বিষয়টি জানতে পেরেছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, কাউকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার কোনো আইনগত বৈধতা নেই। মানসিকভাবে অসুস্থ হলে তাঁকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠাতে হবে। অথবা চিকিৎসার প্রয়োজন হলে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। খোঁজ নিয়ে সবুজের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা রহমান বলেন, সবুজের বর্তমান অবস্থা, পারিপার্শ্বিক বিষয় ও প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।