সুন্দরবন যাত্রায় কয়রায় কর্মযজ্ঞ

সুন্দরবনে ৩ মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষ হতে আর বেশি সময় বাকি নেই। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে বনজীবী, জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল ও পর্যটকদের জন্য আবারও সুন্দরবনে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে। জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদের প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে সব ধরনের প্রবেশ বন্ধ রেখেছে বন বিভাগ।

নিষেধাজ্ঞার শেষ সময়ে সুন্দরবনসংলগ্ন খুলনার কয়রা উপজেলায় দেখা গেছে ভিন্ন ধরনের ব্যস্ততা। কয়রা সদর এলাকায় সেন্ট্রাল হাসপাতালের সামনে পাশাপাশি দুটি নৌকা তৈরির কারখানায় দিনভর কাজ করছেন কাঠমিস্ত্রিরা। কেউ কাঠ কাটছেন, কেউ নৌকার কাঠামো তৈরি করছেন, আবার কেউ তক্তা বসিয়ে নৌকাকে দিচ্ছেন শেষ রূপ। সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে যাওয়া জেলেদের জন্যই তৈরি হচ্ছে এসব নৌকা।

সরেজমিনে দেখা যায়, দুটি কারখানায় প্রায় ২২ জন শ্রমিক কাজ করছেন। তাঁদের বেশিরভাগই নৌকা নির্মাণের বিভিন্ন কাজে দক্ষ। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে নৌকা তৈরির এই কাজ স্থানীয়ভাবে ছোট একটি শিল্পখাত গড়ে তুলেছে। এর মাধ্যমে কাঠমিস্ত্রি ও শ্রমিকদের সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

নৌকা তৈরির কারিগর আবদুল গফুর গাজী বলেন, সুন্দরবনগামী জেলেদের জন্য তাঁরা নৌকা তৈরি করেন। নৌকার আকার, ব্যবহৃত কাঠ এবং কাজের মানের ওপর এর দাম নির্ভর করে। সাধারণত ২০ হাজার থেকে ৪০, ৫০ ও ৬০ হাজার টাকা বা তারও বেশি দামের নৌকা তৈরি করা হয়।

তিনি বলেন, এসব নৌকা নিয়ে জেলেরা সুন্দরবনে মাছ ধরতে যান। সুন্দরবনকেন্দ্রিক মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নৌকা তৈরির কাজও এখন নিয়মিত পেশায় পরিণত হয়েছে।

কারখানার মালিক আমিনুল ইসলাম জানান, প্রায় ২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে তিনি নৌকা তৈরির কাজ শুরু করেন। শুরুতে ঝুঁকি থাকলেও বর্তমানে জেলেদের কাছ থেকে নিয়মিত নৌকার অর্ডার পাচ্ছেন। তাঁর ভাষ্য, জেলেরা নৌকার মান দেখে অর্ডার দেন। ভালো কাঠ ব্যবহার করলে নৌকার স্থায়িত্বও বেশি হয়। ফলে কাঠের মানের ওপর নৌকার দাম ও গুণগত মান অনেকটাই নির্ভর করে।

কারখানাগুলোতে বিভিন্ন ধরনের দেশীয় কাঠ দিয়ে নৌকা তৈরি করা হয়। প্রথমে কাঠ কেটে প্রয়োজনীয় মাপ অনুযায়ী নৌকার পাটাতন, পাটাতনের নিচের কাঠামো ও পাশের অংশ তৈরি করা হয়। পরে ধাপে ধাপে এসব অংশ জোড়া লাগিয়ে নৌকাকে ব্যবহার উপযোগী করা হয়। সুন্দরবনের নৌকা তৈরিতে বন থেকে সংগ্রহ করা কাঠের পরিবর্তে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির কাঠ ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে।

প্রতি বছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে প্রবেশ বন্ধ থাকায় এই সময়টিকে অনেক বনজীবী নৌকা মেরামত ও নতুন নৌকা তৈরির প্রস্তুতির জন্য কাজে লাগান। চলতি বছরও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

বন বিভাগ জানিয়েছে, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়টি সুন্দরবনের মাছ, বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদের প্রজননের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে বনে মানুষের চলাচল ও নৌযানের শব্দ কমিয়ে প্রাকৃতিক প্রজননের পরিবেশ নিশ্চিত করতেই ৩ মাসের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে আবার সুন্দরবনে প্রবেশের সুযোগ মিলবে।

সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলের জলবায়ু, পরিবেশ ও বন রক্ষায় কাজ করা সুন্দরবন ইকো-রিজিলিয়েন্স ইনিশিয়েটিভের সমন্বয়ক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, উপকূলীয় এলাকায় স্থানীয় মানুষের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে এ ধরনের ছোট শিল্প গড়ে ওঠা ইতিবাচক। এতে একদিকে জেলেরা প্রয়োজন অনুযায়ী নৌকা সহজে পাচ্ছেন, অন্যদিকে স্থানীয় শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

তিনি বলেন, আগে একজন জেলেকে নৌকা তৈরির জন্য আলাদা আলাদা কারিগর খুঁজতে হতো। এখন একই জায়গায় কাঠ কাটা, কাঠামো তৈরি ও নৌকা নির্মাণের কাজ হওয়ায় সময় ও শ্রম দুটোই কমছে।

কয়রা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. লুৎফর রহমান বলেন, কয়রা সদর এলাকায় কয়েকটি নৌকা তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানায় সুন্দরবনগামী জেলেদের জন্য নিয়মিত নৌকা তৈরি হচ্ছে। আগের তুলনায় কারিগরদের দক্ষতা ও কাজের মানও বেড়েছে।

কয়রার এসব নৌকা তৈরির কারখানা শুধু নৌকা বিক্রির জায়গা নয়। সুন্দরবননির্ভর বড় একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থারও অংশ এগুলো। জেলেরা বনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলে নৌকার পাশাপাশি জাল, বরফ, খাবারসহ বিভিন্ন উপকরণের প্রয়োজন হয়। সেই চাহিদাকে কেন্দ্র করেই উপকূলের বাজারে তৈরি হয় নানা ধরনের কর্মসংস্থান।

নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে আবার নদী পেরিয়ে সুন্দরবনের দিকে ছুটবে জেলেদের নৌকা। সেই নৌকা তৈরির পেছনে থাকবে কয়রার কারিগরদের শ্রম ও দক্ষতা। সুন্দরবনের প্রবেশদ্বারের এসব ছোট নৌকা কারখানা তাই শুধু একটি পেশার চিত্র নয়, উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও সুন্দরবননির্ভর অর্থনীতিরও দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি।