নবীজি (সা.)-এর আগমন ছিল সমগ্র মানবতার জন্য মহান আল্লাহর বিশেষ রহমত। মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।’ (সুরা আম্বিয়া ১০৭) তার আগমন ছিল মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে, শিরক থেকে তাওহিদের পথে, জুলুম থেকে ন্যায়ের পথে এবং নৈতিক অবক্ষয় থেকে পবিত্রতার পথে ফিরিয়ে আনার জন্য।
তার মর্যাদার সবচেয়ে উজ্জ্বল সাক্ষ্য তার মহান চরিত্র। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সুরা কলম ৪) হজরত আয়েশা (রা.)-কে তার চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘তার চরিত্র ছিল কোরআন। (সহিহ মুসলিম) নবীজি (সা.)-এর কথা, কাজ, আচরণ ও সিদ্ধান্ত ছিল কোরআন অনুযায়ী।
নবুয়তের আগেই মক্কার মানুষ তাকে আল-আমিন তথা বিশ্বস্ত নামে চিনত। তার সত্যবাদিতা এমন উজ্জ্বল ছিল যে, বিরোধীরাও তার আমানতদারিতা অস্বীকার করতে পারেনি। তিনি বলেছেন, ‘যে ধোঁকা দেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম) আজকের এই পৃথিবীতে এই একটি শিক্ষা সত্যিকারভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে ব্যক্তি, পরিবার, ব্যবসা, সমাজ ও রাষ্ট্র সবখানেই আস্থার সংকট অনেকটাই দূর হতে পারে।
তিনি ছিলেন দয়ার নবী। এতিম, দরিদ্র, অসহায়, শিশু ও দুর্বল মানুষের প্রতি তার হৃদয় ছিল গভীর মমতায় পূর্ণ। তিনি বলেছেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) তার দয়া শুধু আপনজনের জন্য ছিল না, তার শিক্ষা মানুষকে সব সৃষ্টির প্রতি মমতা ও দায়িত্বশীলতার পথ দেখিয়েছে।
তার ক্ষমাশীলতার দৃষ্টান্ত আরও বিস্ময়কর। তায়েফে তাকে পাথর মেরে রক্তাক্ত করা হয়েছিল। তবুও তিনি তাদের ধ্বংস কামনা করেননি। বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হেদায়েতের আশা করেছিলেন। মক্কা বিজয়ের দিন পূর্ণ সুযোগ পেয়েও তিনি ক্ষমাকে বেছে নেন। তার ক্ষমা প্রমান করেছে, প্রকৃত শক্তি প্রতিশোধে নয়, সংযমে। ন্যায়ের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অবিচল। ধনী-দরিদ্র, আপন-পর, শক্তিশালী-দুর্বল, কেউ তার ন্যায়ের মানদণ্ডের বাইরে ছিল না। বিদায় হজে তিনি মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের ঘোষণা করেন এবং বংশ, গোত্র ও অহংকারের পরিবর্তে তাকওয়াকে মর্যাদার মানদণ্ড হিসেবে তুলে ধরেন। তার শিক্ষা এমন এক সমাজের ভিত্তি স্থাপন করে, যেখানে মানুষ তার পূর্ণ মর্যাদা পায়।
নবীজি (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা মুমিনের হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতিগুলোর একটি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের চেয়েও অধিক ঘনিষ্ঠ।’ (সুরা আহজাব ৬) তাই তাকে ভালোবাসা শুধু দরুদ পাঠ বা আবেগ প্রকাশে সীমাবদ্ধ নয়, তার সুন্নাহকে ভালোবাসা, তার আদর্শকে জীবনে ধারণ করা এবং তার দেখানো পথে চলাই ভালোবাসার সত্যিকারের প্রমাণ।
আজ পৃথিবী নানাভাবে উন্নতি করলেও মানুষের অন্তরে অস্থিরতা বেড়েছে। তথ্যের প্রাচুর্য এসেছে, কিন্তু সত্য ও নৈতিকতার সংকট রয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় মহানবী (সা.)-এর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সভ্যতার প্রকৃত সৌন্দর্য প্রযুক্তিতে নয়, মানুষের চরিত্রে।
তার শিক্ষা আমাদের প্রতিদিনের জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে। আমার কথায় কতটা সত্য, লেনদেনে কতটা আমানতদারি, আচরণে কতটা কমলতা, বিচারে কতটা ন্যায়, আর হৃদয়ে কতটা আল্লাহভীতি, এসব প্রশ্নের উত্তরেই প্রকাশ পাবে আমরা তার আদর্শকে কতটা ধারণ করেছি।
মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর সর্বশেষ রাসুল। তার মাধ্যমে নবুয়তের ধারার পরিসমাপ্তি ঘটেছে। তার আনীত হেদায়েত কেয়ামত পর্যন্ত মানবতার জন্য আলোর পথ। যুগ বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে, পৃথিবীর রূপ বদলাবে, কিন্তু সত্য, ন্যায়, দয়া, তাকওয়া ও উত্তম চরিত্রের প্রয়োজন কখনো শেষ হবে না। এসব ক্ষেত্রে তাকে অনুসরণ করতে হবে।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে নবীজি (সা.)-এর প্রতিটি সুন্নত যথাযথভাবে পালন করে দুনিয়া ও আখেরাতের জীবন সুন্দর করার তওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক, যশোর ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজ